সাক্ষীর অভাবে আদালতগুলোতে বিপুলসংখ্যক অনিষ্পন্ন মামলা

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল, ২০২৬, ০৮:১৯ এএম
সাক্ষীর অভাবে আদালতগুলোতে বিপুলসংখ্যক অনিষ্পন্ন মামলা

সাক্ষীর অভাবে দেশের আদালতগুলোতে বিপুলসংখ্যক মামলা বছরের পর বছর অনিষ্পন্ন অবস্থায় রয়েছে। সাক্ষীর গড়হাজিরা কিংবা অনিয়মিত সাক্ষ্যের কারণে কমপক্ষে ১৪ বছর থেকে ২৮ বছর পর্যন্ত অনেক মামলার বিচার অনিষ্পন্ন রয়েছে। দেশের উচ্চ ও অধস্তন আদালতে ৪৭ লাখ ৪২ হাজার ৭৩১টি দেওয়ানি এবং ফৌজদারি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। তার মধ্যে অধস্তন আদালতে অনিষ্পন্ন ৪০ লাখ ৪১ হাজার ৯২৪ মামলার মধ্যে ২৩ লাখ ৭২ হাজার ফৌজদারি মামলা রয়েছে। কিন্তু দিনের পর দিন সমন পাঠালেও সাক্ষী আদালতে আসে না। এমনকি তাদের অনেককেই নির্ধারিত ঠিকানায় খোঁজ পাওয়া যায় না। ফলে অনেক মামলাই সাক্ষীর অভাবে একটা পর্যায়ে থমকে যায়। তখন আসামিপক্ষ আসামিদের অব্যাহতি চায় এবং অনেক সময় তা পেয়েও যায়। পাশাপাশি আদালতে আসামিরা তদবির করে না, আবার সাক্ষীও আসে না। তাই দীর্ঘদিনেও মামলা নিষ্পত্তি হয় না। আদালত সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, আদালত নিয়ে সাক্ষীদের মধ্যে অস্বস্তি ও ভীতি রয়েছে। তাছাড়া নিরাপত্তাহীনতা, সাক্ষী সুরক্ষা আইন বা ভাতা না থাকা, বিচারে দীর্ঘসূত্রতা, কোনো কোনো সাক্ষীর স্থায়ী ঠিকানা না থাকা, সরকারি সাক্ষীদের (ম্যাজিস্ট্রেট, চিকিৎসক, পুলিশ, বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা) বদলি কিংবা অবসর, সাক্ষীদের মৃত্যু, কোনো কোনো ক্ষেত্রে সমন পাঠাতে উদাসীনতা, আদালত অঙ্গনে সাক্ষীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অবস্থান ও বিশ্রামের ব্যবস্থা না থাকার কারণে সাক্ষীরা আদালতমুখো হন না।

সূত্র জানায়, আদালতে সাক্ষী হাজির করা এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দায়িত্ব ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭১ (২) ধারা এবং পিআরবি’র (পুলিশ রেগুলেশনস অব বেঙ্গল) বিধান অনুযায়ী পুলিশের। সেক্ষেত্রে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও প্রসিকিউশনের বড় ভূমিকা রয়েছে। কারণ মামলায় আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণে কতজন সাক্ষী হবে তা সুনির্দিষ্ট নয়। সাক্ষ্য আইনের সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী সাক্ষ্য হতে হবে মৌখিক ও দালিলিক। আর মৌখিক সাক্ষ্য হতে হবে প্রত্যক্ষ কিংবা জনশ্রুত। মামলায় বাদী, ভুক্তভোগী, ঘটনার শিকার ব্যক্তির পরিবারের সদস্য ও স্বজন, তদন্তকারী কর্মকর্তা, ক্ষেত্রবিশেষে মেডিকেল সনদ দেয়া চিকিৎসক, আসামির জবানবন্দি নেয়া ম্যাজিস্ট্রেট, ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তি, মামলার আলামত জব্দ করেন এমন ব্যক্তি, ঘটনার পর পুলিশের সঙ্গীয় ফোর্স এমন ব্যক্তিরা সাক্ষ্য দেন। যদিও ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় আইন কমিশন ফৌজদারি মামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও সাক্ষীদের সুরক্ষায় ‘সাক্ষী সুরক্ষা আইন’ করতে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠায়। তাতে ওই আইনের প্রয়োজনীয়তা, গুরুত্ব, প্রেক্ষাপট, পরিস্থিতি, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের নজির বিশ্লেষণ করে সাক্ষী সুরক্ষা আইন করতে তাগিদ দেয় কমিশন। তার ভিত্তিতে আইন মন্ত্রণালয় আইনের একটি খসড়া তৈরি করে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ওই উদ্যোগ থমকে যায়। নিরাপত্তাজনিত কারণে দীর্ঘদিন সাক্ষী না আসায় একটি হত্যা মামলা অনিষ্পন্ন থাকায় ২০১৫ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ ফৌজদারি মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি ও সাক্ষীদের হাজিরা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সাক্ষী সুরক্ষা আইন করতে সরকারকে তাগিদ দেয়। তবে আইন কমিশনের সুপারিশ ও হাইকোর্টের তাগিদেও ওই আইন হয়নি। 

সূত্র আরো জানায়, ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪৪ ধারায় সাক্ষীদের খরচ দেয়ার বিধান রয়েছে। একসময় জেলা ও দায়রা আদালত, চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের অর্থনৈতিক কোডে (খাত) সাক্ষীকে খরচ বাবদ সরকার প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দিতো। কিন্তু দুই দশক ধরে তা বন্ধ রয়েছে। পাশাপাশি সাক্ষীদের খরচ নিয়ে আইন মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে চিঠি দেয়। কিন্তু পরে এ নিয়ে আর কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। গত বছরের আগস্টে সংশোধিত ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪৪ ধারায় সাক্ষীদের খরচের বিধানে সরকারকে বিধি প্রণয়নের বাধ্যবাধকতা রহিত করে সরকারি আদেশের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় বিধানের বিষয়টি যুক্ত করা হয়। মূলত সাক্ষীদের সুরক্ষায় আইন নেই। তাদের ভাতাও দেয়া হয় না। আর আদালতগুলোর যে পরিবেশ এবং অবকাঠামো সংকট তাতে সাক্ষী নিরুৎসাহিত হওয়াই স্বাভাবিক। 

এদিকে এ প্রসঙ্গে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) প্রসিকিউশন বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মিয়া মোহাম্মদ আশিস বিন হাছান জানান, সাক্ষীদের উদ্দেশ্যে সমন পাঠানো এবং মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। তাদের হাজিরা ও আদালতে তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে পুলিশ নিয়মিত তদারকি ও আদালতের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে সমন্বয় করে। যেসব মামলার নথিতে মুঠোফোনের নম্বর থাকে সেসব সাক্ষীদের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হলেও পুরনো মামলার সাক্ষীদের ঠিকানায় তাদের খোঁজ পাওয়া যায় না। ফলে ওই মামলাগুলোতে জটিলতা বেশি হয়।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে