বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮.৭১ শতাংশে। খাদ্য খাতের দাম বৃদ্ধিই মূল চাপ তৈরি করছে। চাল, ডাল, তেল, সবজিসহ সবকিছুর দাম বেড়ে যাওয়ায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে। তবে খাদ্যবহির্ভূত খাতেও পরিস্থিতি ভালো নয়। বাসা ভাড়া, পরিবহণ, চিকিৎসা, শিক্ষা ও জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি মানুষের দুর্ভোগকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। মূল্যস্ফীতির পেছনে কয়েকটি বড় কারণ রয়েছে। প্রথমত, সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা। দেশে নিত্যপণ্যের সংকট না থাকলেও বাজারে অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়, যার পেছনে সিন্ডিকেটের ভূমিকা দীর্ঘদিনের অভিযোগ। দ্বিতীয়ত, টাকার অবমূল্যায়ন। আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে টাকার মান কমে গেলে সরাসরি পণ্যের দাম বাড়ে। তৃতীয়ত, বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি জ্বালানির বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলছে, যা বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য অশনিসংকেত। অতীতে আমরা দেখেছি, বাজারে পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও দাম বেড়েছে। এর পেছনে অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি কাজ করেছে। অতি মুনাফার জন্য অনৈতিকভাবে দাম বাড়ানো মানুষের পকেট কাটা অপরাধ। যারা এ অপরাধ করছে, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। বাজার নিয়ন্ত্রণে নানা আইন আছে, লাইসেন্স বাতিলের এখতিয়ারও সরকারের রয়েছে। তাই কালক্ষেপণের সুযোগ নেই। সরকার আসন্ন বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু বাস্তবতায় তা অর্জন করা সহজ হবে না। বাজেট বাস্তবায়নে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াবে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিতে হবে। শুধু স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থা নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও জরুরি। কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো, বিকল্প জ্বালানি উৎসে বিনিয়োগ-এসব উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে বাজার তদারকি জোরদার করতে হবে। অসাধু ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের দৃঢ় অবস্থান দেখতে চায় মানুষ। পাশাপাশি জনগণকেও সচেতন হতে হবে। অপ্রয়োজনীয় মজুদ থেকে বিরত থাকা, সাশ্রয়ী জীবনযাপন-এসব অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। আমরা মনে করি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ, বাজারে সুশাসন এবং জনগণের সহযোগিতা একসঙ্গে কাজ করলে পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। নইলে মূল্যস্ফীতি শুধু সংখ্যার হিসাবেই নয়, মানুষের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে দুর্ভোগ বাড়িয়ে তুলবে।