সম্প্রতী কেরানীগঞ্জে গ্যাস লাইটার তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে শিশুসহ ছয় জনের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এই অগ্নিদুর্ঘটনা আবারও আমাদের বিবেককে নাড়া দিয়ে গেল। আমাদের শ্রমজীবী মানুষদের কতটা অনিরাপদ পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য করা হয়, ঢাকার কেরানীগঞ্জে গ্যাসলাইটার কারখানায় ছয়জনের পুড়ে মরার ঘটনা তা আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। বরাবরের মতো এবারের দুর্ঘটনার পরও জানা গেল, কারখানাটির কোনো অনুমতি ছিল না। এর চেয়েও ভয়াবহ ব্যাপার হচ্ছে, কারখানাটিতে কোনো অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না, অগ্নিকাণ্ডের সময় তালাবদ্ধ ছিল প্রধান ফটক। ফলে এটিকে কোনোভাবেই দুর্ঘটনা বলার উপায় নেই; বরং ধারাবাহিক কাঠামোগত হত্যাকাণ্ডের সর্বশেষ অধ্যায়। মাত্র ঘণ্টা কয়েকের ব্যবধানে অনেকগুলি তাজা প্রাণ ঝরে গেল, বহু মানুষ আহত হলেন, অসংখ্য পরিবার নিঃস্ব হলো। ফি বৎসর এভাবে বিশেষত গ্রীষ্ম মৌসুমে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাগুলির পরিপ্রেক্ষিতে কি প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক নয় যে, এই আগুন কি শুধুই দুর্ঘটনা: নাকি এটা আমাদের দীর্ঘদিনের অবহেলা, দুর্বল তদারকি এবং জনসচেতনতার ঘাটতির নির্মম পরিণতি? বাস্তবতা বলছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অগ্নিকাণ্ডের পেছনে থাকে শর্ট সার্কিট, ত্রুটিপূর্ণ বৈদ্যুতিক লাইন, গ্যাস লিকেজ, দাহ্য পদার্থের অনিরাপদ মজুত এবং জরুরি বহির্গমন পথ না থাকা। কেরানীগঞ্জের সামপ্রতিক ঘটনা যেন সেই পুরাতন ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি বলে প্রতীয়মান হয়েছে। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে এই অগ্নিকাণ্ডের কারণ নিশ্চয়ই বেরিয়ে আসবে। তবে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন, স্থানীয় বাসিন্দা ও বেঁচে যাওয়া শ্রমিকদের ভাষ্যে এটা স্পষ্ট, শ্রমিকেরা যে পুড়ে অঙ্গার হবেন, তার সব ব্যবস্থাই সেখানে করা হয়েছিল। প্রধান ফটকে তালা লাগানো থাকায় দুর্ঘটনার পর শ্রমিকদের প্রাণ বাঁচাতে দেয়াল টপকে বাইরে বের হতে হয়েছে। বিউটেন, প্রপেনের মতো গ্যাস প্রক্রিয়াজাত করার বিপজ্জনক কারখানা একটি জনবহুল এলাকায় কীভাবে চলতে পারে, সেটা কোনোভাবেই বোধগম্য নয়। বৈধ কাগজপত্র না থাকায় গত বছর কারখানাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এরপরও কীভাবে কারখানাটি চালু হলো, সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে গণমাধ্যমে ধারাবাহিক প্রচারণারও বিশেষ প্রয়োজন। সবচাইতে বড় কথা হলো, আইন প্রয়োগে কঠোরতা অত্যাবশ্যক। অননুমোদিত কারখানা, ঝুঁকিপূর্ণ গুদাম এবং অগ্নিনিরাপত্তাহীন ভবনের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নিলে এই মৃত্যুমিছিল থামবে না।