রাজশাহীর তানোর উপজেলার সরনজাই ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আলহাজ্ব মোজাম্মেল হক খাঁনের বিরুদ্ধে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মাসিক ভি.ডাব্লিউ.বি প্রকল্পের মাসিক সঞ্চয়ের টাকা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা না করে নিজ পকেটে রেখে আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এখবর ছড়িয়ে পড়লে ইউপির আপামর জনসাধারণের মাঝে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। সেই সাথে ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে যতগুলো প্রকল্পের কাজ করেছেন সবগুলোর সরেজমিনে তদন্ত করলেই ভয়াবহ অনিয়ম-দুর্নীতি বেরিয়ে পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, গত বছরের জুলাই মাস থেকে তানোর উপজেলার সরনজাই ইউপিতে নতুনভাবে ভি.ডাব্লুউ.বি প্রকল্পের আওতায় দরিদ্র জনগোষ্ঠী জনসাধারণ মাথা পিছু ৩০ কেজি করে চাল পেয়ে থাকেন। প্রতিজনের ৩০ কেজি চালের বিপরীতে ২৪০ টাকা করে মাসিক সঞ্চয়ের টাকা ব্যাংকে জমা দিতে হবে। এজন্য প্রতি উপকারভোগীকে ব্যাংক হিসাব খুলতে হবে। কিন্তু গত জুলাই মাস থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত কোন উপকারভোগীর সঞ্চয়ের টাকা ব্যাংকে জমা দেননি ইউপি চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হক খাঁন।
ইউপি সদস্যরা জানান, গত জুলাই মাস থেকে নতুনভাবে প্রকল্প শুরু হয়েছে। সরনজাই ইউপিতে উপকারভোগীর সংখ্যা রয়েছে ১৭০ জন। গত জুলাই থেকে গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৮ মাসের কোন টাকা ব্যাংকে জমা করেননি চেয়ারম্যান। অথচ আমরা জানতে চাইলে তিনি সাব জানিয়ে দিতেন টাকা জমা দেয়া আছে। তবে, খোঁজ নিয়ে দেখা যায় এসব টাকা নিজের পকেটে রেখেছেন চেয়ারম্যান। তিনি তো নতুন চেয়ারম্যান নন। তিনি আ.লীগ সরকারের সময় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। ওই সময় প্রকল্পের কাজেও নয়-ছয় করতেন তিনি। পরে সাবেক এমপি ফারুক চৌধুরীর হাত থেকে মালা নিয়ে দলে যোগদানের পর থেকে বেপরোয়া হয়ে উঠেন তিনি। বিগত জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আ.লীগ সরকার পতনের পর তিনি উপজেলা বিএনপির এক প্রকার কর্নধর হয়েছেন। ইউনিয়ন পরিষদে ঠিক মত আসেনা। প্রকল্পের কাজ তার অনুগত মেম্বার ছাড়া দেন না। তার কথায় ইউনিয়ন পরিষদে শেষ কথা। ইচ্ছে মত সবকিছু পরিচালনা করে থাকেন তিনি।
নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইউপি সদস্য বলেন, গত কয়েকদিন ধরে ইউনিয়ন পরিষদে টাকা জমা হয়নি মর্মে আলোচনা চলছে। বিভিন্নভাবে জানতে পারি এক টাকাও ব্যাংকে জমা করেননি চেয়ারম্যান। তিনি একজন চেয়ারম্যান আবার হাজী। এছাড়াও এখন ক্ষমতাসীন দল তানোর উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি। তারমত ব্যক্তিকে এসব টাকা কেন পকেটে রেখে আত্নসাৎ করবেন এটা মেনে নেয়া যায় না।
দলীয় নেতারা জানান, আ.লীগ সরকার পতনের পর থেকে চেয়ারম্যান হিসেবে মোজাম্মেল হক খান বেপরোয়া চলাফেরা শুরু করেন। তার নানা অপকর্মের জন্য গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার ইউনিয়নে ধানের শীষের প্রার্থী ভোট কম পায়। দল ক্ষমতায় এ সুযোগে অসহায় দরিদ্রদের টাকা আত্মসাৎ করবেন আর মানুষ ভোট কেন দেবেন। এধরনের নেতাদেরকে দলীয় ভাবে কঠোর শাস্তির প্রয়োজন। তাহলে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে এধরনের অনিয়ম করতে সাহস পাবেন না। প্রশাসনকেও অনুরোধ করব যাতে এসব বিষয়ে কোন ছাড় দেয়া না হয়।
সূত্র জানায়, উপজেলার সরনজাই ইউপিতে ভি.ডাব্লুউ.বি প্রকল্পের আওতায় ১৭০ জন দরিদ্র জনগোষ্ঠী মাসে ৩০ কেজি করে চাল পেয়ে থাকেন। তার বিপরীতে মাসিক ২৪০ টাকা করে ব্যাংকে সঞ্চয় রাখতে হবে। এ প্রকল্প দুই বছর মেয়াদি। গত বছরের জুলাই থেকে গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৮ মাসের চাল বিতরণ করা হয়েছে। মাসে ২৪০ টাকা করে হলে ৮ মাসে জনপ্রতি সঞ্চয় হয় ১ হাজার ৯২০ টাকা। সে হিসেবে ১৭০ জন উপকারভোগীর ৩ লাখ ২৬ হাজার ৪০০ টাকা আত্মসাৎ করেছেন চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হক খান।
এবিষয়ে চেয়ারম্যান বিএনপি নেতা আলহাজ্ব মোজাম্মেল হক খাঁনের ০১৭৭৬-৮৬১৮০০ নম্বর মোবাইলে একাধিকবার ফোন দেয়া হলেও রিসিভ হয়নি। একারণে তার কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি। প্যানেল চেয়ারম্যান সইবুর রহমানের ০১৭৩১-৭৭৬৬৫০ নম্বর মোবাইলে ফোন দেয়া হলে তিনি তখন ফোন রিসিভ করেননি। কিন্তু পরে অবশ্য ফোন ব্যাক করে বলেন তিনি এসব বিষয়ে কিছুই অবগত নন।
অত্র ইউপি সচিব মুর্শেদুর রহমান মুরাদের সাথে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, আমি গত দুই মাস আগে এখানে যোগদান করেছি। এসব বিষয়ে এতটা জানিনা। তবে কিছু সাংবাদিক এসেছিল চেয়ারম্যানের কাছে তাদেরকে ব্যাংকে টাকা জমার কাগজপত্র দেখাইতে বলেছে শুনলাম। কোন ব্যাংকে টাকা জমা করা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি জানান, কালীগঞ্জ কৃষি ব্যাংকে। এরবেশি কিছু জানিনা বলে এড়িয়ে গেছেন।
কালীগঞ্জহাট কৃষি ব্যাংকের ম্যানেজার রুমানের সাথে মোবাইলে যোগাযোগ করে টাকা জমার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি অন্যজনের কাছ থেকে খোঁজ নিয়ে জানান এ ধরনের প্রকল্পের টাকা জমা হয়নি। তবে তানোর শাখায় হতে পারে।
তানোর কৃষি ব্যাংকে গিয়ে ম্যানেজারের সাথে কথা বলে সরনজাই ইউপির ভি.ডাব্লিউ.বি প্রকল্পের টাকা জমা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে ম্যানেজার জানান- হিসাব নম্বর দিলে হয়তো বলা যাবে। তবে, সরনজাই ইউনিয়নের এ ধরনের টাকা তানোর কৃষি ব্যাংকে জমা হবার কথা নয়।
প্রকল্প তদারককারী সংস্থা তানোর উপজেলা মহিলা দপ্তরের কর্মকর্তা হাবিবা খাতুনের সাথে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, এ প্রকল্পের টাকা চেয়ারম্যানের পকেটে রাখার এখতিয়ার নেই। উপকারভোগী নিজে ব্যাংক হিসাব খুলে নিজে প্রতি মাসে জমা রাখবেন। চাল বিতরণের সময় ট্যাগ অফিসার থাকে তার সব কিছু বলার কথা। কিন্তু এধরনের অভিযোগ পাওয়া যায়নি। এখন পেয়েছি খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ট্যাগ অফিসার তানোর উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা আমীর হামজার মোবাইলে ফোন দেয়া হলে সহকারী একজন মহিলা রিসিভ করে বলেন- স্যার তো কথা বলতে পারেনা। চাল বিতরণের সময় আমাকে পাঠায়। তার পরিচয় জানতে চাইলে তিনি জানান- আমার নাম সোনালি সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা। তিনি জানান, আমি শুধু চাল সঠিকভাবে দেয়া হচ্ছে কিনা সে বিষয়ে দেখাশোনা করি।
এব্যাপারে তানোর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) নাঈমা খাঁন জানান, বিষয়টি তার অজানা। উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার সাথে কথা বলে বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ খবর নেয়া হবে। ঘটনার সত্যতা পেলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানান ইউএনও।