“ইসলামাবাদ টক্স’’

যুদ্ধ বন্ধের দ্বারপ্রান্তে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র

লে: কর্নেল মো: রুহুল আমীন (অব:) | প্রকাশ: ১৭ এপ্রিল, ২০২৬, ০৮:২৬ পিএম
যুদ্ধ বন্ধের দ্বারপ্রান্তে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র
লে: কর্নেল মো: রুহুল আমীন (অব:)

প্রারম্ভিক

সবার মনে একটা প্রশ্ন, ইরান যুদ্ধ বন্ধ হবে কি? অথচ এই যুদ্ধের সাথে আমাদের সরাসরি কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই, যেমন নেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সাথে, গাজায় ইসরাইলি বর্বরতার সাথে। ইউক্রেন যুদ্ধ হচ্ছে অন্য মহাদেশে-বাঘে-মহিষে লড়াই। তবে মহিষের সাথে সিংহের উস্কানি ও সহায়তা আছে। এই যুদ্ধের বয়স প্রায় ৪ বছর। তার পরেও অন্যদের তেমন মাথাব্যথা নেই। কারণ ওটা বড়দের বিষয়-একদিকে রাশিয়া, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, ন্যাটো ও ইইউ-এর বরপুত্র ইউক্রেন। ওদিকে বিশ্ব সন্ত্রাসী অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইল স্বাধীনতাকামী হামাসকে নিশ্চিহ্ন করার নামে গাজায় অবিরাম ধ্বংসলীলা চালাচ্ছে। বলা যায়, গাজার অবস্থা আমাদের বস্তি এলাকার মতো। তাই মজলুমদের পক্ষে সারা বিশ্ব কথা বলে। তবে ইরান ছাড়া আর কেউ এর বিরুদ্ধে সক্রিয় নয়। আমরা সমবেদনা জানাই, কখনো কখনো মানবিক সাহায্য করার চেষ্টা করি ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা ও মুক্তির জন্য। আরেকটা কারণেও আমরা ব্যথিত যে, যাযাবর ইহুদিরা ফিলিস্তিন ভূখণ্ড অন্যায়ভাবে দখল করে একটি স্বাধীন ইহুদিবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে এবং এই ব্যবস্থাটি করে দেয় সাম্রাজ্যবাদী পশ্চিমা গোষ্ঠী। আর এখন ইসরাইল পুরো মধ্যপ্রাচ্য দখলের চেষ্টা করে যাচ্ছে। তাতেও সায় রয়েছে সাম্রাজ্যবাদী পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা দোসরদের। আরেকটি আবেগিক বিষয়ও আছে, তা হলো-একদিকে নিপীড়িত ফিলিস্তিনি মুসলমান, আর বিপরীতে আগ্রাসী ইহুদি-খ্রিষ্টান চক্র। কিন্তু ইরান যুদ্ধের প্রতি আমাদের আতঙ্ক বা টেনশন ভিন্নতর। এখানেও ইহুদি-খ্রিষ্টানদের সম্মিলিত আগ্রাসন একটি মুসলিম দেশের বিরুদ্ধে। এক্ষেত্রে ইরানও মজলুম বা আক্রান্ত। আমাদের সমস্যা, অর্থাৎ সারা বিশ্ব নড়ে-চড়ে বসেছে প্রধানত এই যুদ্ধের বিরূপ প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতি-অর্থাৎ ব্যবসা-বাণিজ্য, বিশেষ করে জ্বালানি সংকটের ওপর প্রভাব পড়েছে বলে। শুধু সরকার নয়, বাজারের ওপরও এর প্রভাব পড়েছে। জ্বালানি তেলের জন্য হাহাকার। খোদ যুক্তরাষ্ট্রও এর মাশুল দিচ্ছে। তাই যুদ্ধের ছয় সপ্তাহ পরে এসে একটা যুদ্ধবিরতির জন্য কূটনৈতিক মধ্যস্থতার হাল ধরেছে পাকিস্তান। রাজধানী ইসলামাবাদে উচ্চপর্যায়ের দুই দিনব্যাপী প্রাথমিক পর্যায়ের আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বে বিশাল প্রতিনিধিদল (৩০০ জন) এবং ইরানি পার্লামেন্টের স্পিকারের নেতৃত্বে ৭০ জনের প্রতিনিধিদল ২১ ঘণ্টাব্যাপী আলোচনা ও যুক্তি-তর্ক করেও কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে না পেরে ইসলামাবাদ ত্যাগ করে নিজ নিজ দেশে ফেরত যান। এই আলোচনার গুরুত্বের বিবেচনায় এবং রাজধানী ইসলামাবাদ-অর্থাৎ পাকিস্তানের সক্রিয় ভূমিকা ও সদিচ্ছার জন্য গোটা বিশ্বের চোখ ছিল ইসলামাবাদের ওপর। তাই এটি ইতিহাসে “ইসলামাবাদ টক্স”বা “ইসলামাবাদ সংলাপ”হিসেবে স্থান পেয়েছে কূটনীতি ও গণমাধ্যমে। এখানে তার আদ্যোপান্ত নিয়ে এবং ইরানে যুদ্ধবিরতি ও বন্ধের বিষয়ে আলোকপাত করার চেষ্টা করছি।

ইসলামাবাদ টক্স

চলমান কূটনৈতিক বিশ্বে সমস্যা-সংকুল রাষ্ট্র পাকিস্তানকে হিরো বানিয়ে দিয়েছে। দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা এবং প্রতিবেশী ভারত ও আফগানিস্তানের সাথে চলমান বৈরিতার মাঝেও ইসলামাবাদ এই দায়িত্বটি পেয়ে তা সুষ্ঠু ও সফলভাবে পালন করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এর হাল ধরেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ এবং সেনাপ্রধান জেনারেল আসিফ মুনির। অনেকে এজন্য পাকিস্তানকে নোবেল পুরস্কার প্রদানের জন্যও মত ব্যক্ত করেছেন। আলোচনা সফল হয়নি। কিন্তু যুদ্ধবিরতি বহাল রয়েছে এবং পাকিস্তানের আন্তরিকতা ও আতিথেয়তায় দু’পক্ষই সন্তোষ প্রকাশ করেছে। তবে বাধ সেধেছে সেই বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু-ইসরাইলের কুখ্যাত প্রধানমন্ত্রী। যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও লেবাননে হামলা, হত্যা ও ধ্বংসলীলা অব্যাহত রেখেছে এবং কারো কথায় বন্ধ করবে না বলে সাফ জানিয়েছেন। মূলত ইসরাইলই মধ্যপ্রাচ্য এবং সারা পৃথিবীর বিষফোঁড়া। সে যাই হোক, এখন একটি প্রশ্ন জাগে-মধ্যস্থতাকারী বা দূতিয়ালি করার জন্য পাকিস্তান কীভাবে এবং কেন এই মঞ্চে আবির্ভূত হলো? পাকিস্তান তো পরাশক্তিও নয়, কূটনীতিতে সিদ্ধহস্ত নয়, গণতন্ত্রচর্চায় অভ্যস্ত নয় (যেমন ভারতে আছে), সামরিক প্রভাবেই দেশ চলে, অর্থনৈতিক অবস্থা টেকসই নয়। তারপরও পাকিস্তানকে নিয়োগ করা হলো এই জটিল সমস্যার আবর্তে। শুরুতে অবশ্য তুরস্কও আগ্রহী ছিল। পাকিস্তানকে একাই যোগ্য ভেবে নির্বাচন করা হয়েছে-এর কিছু যথাযথ কারণ রয়েছে। আরেকটি প্রশ্ন-পাকিস্তান কি নিজে উদ্যোগী, না তাকে দায়িত্ব পালনে নিযুক্ত করা হয়েছে? যতটুকু জানা বা বোঝা যায়, তা হলো-পাকিস্তানের কূটনৈতিক অবস্থানের কারণে এই দৃশ্যপটের মূল শক্তি যুক্তরাষ্ট্রই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী এবং সেনাপ্রধানকে দায়িত্ব দিয়েছে এবং পাকিস্তান তা সাদরে গ্রহণ করেছে। কেননা যুদ্ধ শেষ করা যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন এবং তা পাকিস্তানকে দিয়েই সম্ভব হতে পারে। পাকিস্তানের লক্ষণীয় দিক হলো-যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, মুসলিম বিশ্ব এবং চীন-রাশিয়ার সাথে তার সুসম্পর্ক। তাই এই প্রস্তাব ইরান গ্রহণ করেছে এবং চীনও সায় দিয়েছে। ওদিকে চীনের সাথে ইরানের দহরম-মহরম রয়েছে। পাকিস্তানকে দিয়ে চীনকেও ব্যবহার করতে পারবে ইরানকে রাজি করানোর জন্য। আসলে তাই হয়েছে। এছাড়া, উন্নয়নশীল দেশ হলেও পাকিস্তান একটি পারমাণবিক শক্তি এবং মুসলিম বিশ্বের কাছে গ্রহণযোগ্য। তাই ইসলামাবাদ টক্স ব্যর্থ হওয়ার পর যখন সবাই হতাশ, তখন পাকিস্তান বলেছে-আলোচনা ব্যর্থ নয়, সাময়িক বিরতি এবং আরও হবে। এর প্রমাণ-যুদ্ধবিরতি কার্যকর আছে। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়েই সাড়া দিয়েছে। কারণ তারাও তো যুদ্ধ শেষ চায়, সমস্যা হলো দাবি-দাওয়া ও দর-কষাকষি।

সংলাপ প্রস্তুতি

৭ই এপ্রিল ২০২৬, মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক ঘোষিত এক মহাপ্রলয়ের দিন হওয়ার কথা ছিল ইরানে। তার দু’দিন আগে তাঁর দেওয়া ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা অনুযায়ী ইরান হরমুজ প্রণালীর অবরোধ তুলে না নিলে ইরানকে প্রস্তরযুগে পাঠিয়ে দেবেন বলে হুমকি দিয়েছিলেন। মঙ্গলবার এসে গেল, ইরান অনড় ট্রাম্পের একতরফা হুঙ্কারে। এর আগে কয়েক দফায় ট্রাম্পের দেওয়া যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবেও ইরান বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া ১৫-দফা প্রস্তাবের বিপরীতে ইরান ৫-দফা দিয়ে শর্ত দেয়। কোনটাই কার্যকর হলো না, যতই আঘাত করুক ইরান প্রত্যাঘাত করেই চলছিল। এখন ট্রাম্প সাহেব কী করবেন? না পারলেন ইরানকে বাধ্য করতে, না পারলেন ইরানের বিরুদ্ধে লক্ষ্য অর্জন করতে-তাকে পরাজিত করতে। তাই মঙ্গলবার ছিল তাঁর জন্য এক মহাসংকটের দিন। জ্বালানি সংকটে মার্কিন অর্থনীতিতে ধস, দেশে-বিদেশে তার বিরুদ্ধে বিরূপ প্রতিক্রিয়া, মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে। তিনি কি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ প্রসারিত করবেন, না নিজের গদি ঠিক রাখবেন এবং মান বাঁচাবেন-অর্থাৎ শ্যাম রাখবেন না কুল রাখবেন। তাই তো পাকিস্তানের মাধ্যমে ১০-দফা শর্ত ইরানের পক্ষ থেকে উপস্থাপন করা হলে তিনি তাৎক্ষণিক তা লুফে নিয়ে মুখ রক্ষা করেন। আসলে সপ্তাহ ধরেই সংলাপের জন্য ট্রাম্প ইসলামাবাদকে চাপ প্রয়োগ করছিলেন, তাড়াটা ট্রাম্পেরই ছিল। ১০ এপ্রিল মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে এক বিশাল প্রতিনিধিদল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে রওনা দেন। এর মধ্যে ছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার, মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ ইউটকফ, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর কমান্ডার ব্রড কুপার। অপর পক্ষে ইরানের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে ছিলেন পার্লামেন্ট স্পিকার বাঘের গালিবাফ; সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগাচি, উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাজিদ তাখতরাভানচি ও জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের সেক্রেটারি মোহাম্মদ বাঘের জোলঘাদর। আর মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের নেতৃত্বে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ ও সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিফ মুনির; তাদের সঙ্গে আরও ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি। সংলাপ উপলক্ষে ইসলামাবাদে নজিরবিহীন নিশ্ছিদ্র ও বহুস্তরব্যাপী নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, যাতে লকডাউনের মতো অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন বাহিনীর ১০ হাজার নিরাপত্তাকর্মী নিয়োজিত ছিল। নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরখ করতে ৩০ সদস্যের একটি মার্কিন নিরাপত্তাকর্মী দলও পাঠানো হয়েছে ইসলামাবাদে। যে বিমানে করে ইরানি প্রতিনিধিদল এসেছেন, সেটির খালি আসনে যুদ্ধ শুরুর দিন ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে মিনাব স্কুলের যে শিশুরা নিহত হয়েছে, তাদের ছবিও সঙ্গে থাকা নিজস্বপত্রও নেওয়া হয়েছে। মৃতের সংখ্যা ১৬৮ জন ছিল বলে এই বিমানের নাম দেওয়া হয়েছে “মিনাব ১৬৮”। এই সংলাপে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দু’পক্ষই যুদ্ধবিরতি প্রত্যাশী হলেও, ইরান পূর্বের অভিজ্ঞতা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অবিশ্বাস, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও কূটনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ নিয়ে সংলাপে অংশগ্রহণ করে।

সংলাপ অনুষ্ঠান

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ আগ্রাসনের চার সপ্তাহ বা প্রায় দেড় মাস পর, ১১ এপ্রিল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের সেরেনা হোটেলে দু’পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় সংলাপ শুরু হয়। উল্লেখ্য, ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামী বিপ্লবের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ পর্যায়ের সংলাপের বৈঠক। প্রথম দিন ছয় ঘণ্টা দু’পক্ষের মুখোমুখি আলোচনা এবং এরপর বিভিন্ন বিষয়ের ওপর দু’পক্ষের বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আলোচনা হয়। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ সংলাপ সফল হওয়ার জন্য দু’পক্ষকে সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করার অঙ্গীকার করেন এবং আশা করেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মধ্যে সংলাপ শুরুর প্রাক্কালেই কয়েকটি বিষয় বাধা ও সন্দেহ হিসেবে কাজ করে। প্রথমটি হলো লেবাননে ইসরাইলের অব্যাহত আক্রমণ এবং ধ্বংসযজ্ঞ। ইরান বেঁকে বসে। একে তারা যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন বলে জানিয়েছে। অবশেষে টেলিফোনের মাধ্যমে ট্রাম্পের চাপে হামলা বন্ধ বা সীমিত করতে এবং লেবাননের সঙ্গে আলোচনা করতে রাজি হয় ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী যুদ্ধবাজ নেতানিয়াহু। এছাড়া, এর মধ্যে ট্রাম্পের হুমকি-ধমকি চলতেই থাকে। সংলাপ সফল না হলে অঘটন ঘটাবেন, শেষ করে দেবেন ইত্যাদি এবং হরমুজে পাল্টা অবরোধের ঘোষণা দেন। ইরানের দেওয়া ১০-দফা শর্ত আলোচনার ভিত্তি হলেও সরেজমিনে তা মানা হচ্ছে না; যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দুটি বিষয়ের ওপর চাপ দেওয়া হয়েছে-হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করা এবং ইরানের পারমাণবিক উন্নয়ন কার্যক্রম বন্ধ বা সীমিত করা। অবশেষে দফায় দফায় দুই দিনে ২১ ঘণ্টাব্যাপী আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে, অর্থাৎ কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। উভয় পক্ষ পরস্পরকে দোষারোপ করেছে। এ নিয়ে হতাশা সৃষ্টি হলেও, আলোচনা আবার অনুষ্ঠিত হওয়ার সংকেত পাওয়া গিয়েছে সব পক্ষ থেকেই। এমনকি আগামীতে এই যজ্ঞে অংশগ্রহণ করতে পারেন ট্রাম্প নিজেও-এমন কথাও এসেছে। সেক্ষেত্রে ইরানের সর্বোচ্চ নির্বাহী এবং অন্যান্য দেশের নেতারাও যোগ দিতে পারেন এবং সেটা উৎসবমুখর হতে পারে। অতএব, অবশেষে একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর হতে পারে। কিন্তু বাধ সাধছে ট্রাম্পের অসংলগ্ন বক্তব্য ও ইরানকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে হুমকি দেওয়া। আশার কথা হলো এই যে, এতোকিছুর পরও যুদ্ধবিরতি বহাল রয়েছে।

শেষ কথা

ইরান যুদ্ধ কি শেষ হবে, না হবে না-প্রশ্নটি থেকেই যায়। কেননা এই চলমান যুদ্ধবিরতির মাঝেই উত্তেজনা চলছে। কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজি নয়। হরমুজ প্রণালীতে ইরানের অবরোধের বিরুদ্ধে পাল্টা অবরোধ ঘোষণা করেছেন ট্রাম্প এবং ইরানের সব বন্দরও এর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা ইসলামাবাদ সংলাপ ব্যর্থ হওয়ার দিনই শুরু হয়েছে। তিনি কর্তৃত্বের সুরে কথা বলছেন, যেন পৃথিবীটাই তাঁর অধীন এবং আজ্ঞাবহ। অবশ্য ইতোমধ্যে তিনি আঁচ করতে পেরেছেন যে, তাঁর পায়ের তলায় মাটি নেই। বলা যায়, তাঁর কোনো বন্ধু ও সহযোগী নেই ইসরাইল ছাড়া। ন্যাটো, ইইউ, মধ্যপ্রাচ্য তাঁকে পাশ কাটিয়ে চলছে। নিজ দেশেও হয়তো তাঁকে হেনস্তা হতে হবে। কংগ্রেস ও সিনেট তাঁর ক্ষমতা সীমিত করেছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত করা হবে, যে কমিটির প্রধান হচ্ছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। একই সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের বিরুদ্ধেও অভিশংসনের জন্য ৬টি প্রস্তাব এসেছে কংগ্রেসে। স্পেন, ফ্রান্স, ব্রিটেন, জার্মানি-সবাই তাঁর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সোচ্চার। পাগল, উন্মাদ, মানসিক ভারসাম্যহীন-“টাকো (ঞঅঈঙ)”-এসব খেতাব তাঁর ভাগ্যে জুটেছে। তাঁকে ‘টাকো’ বলা হয়, যার অর্থ ‘ট্রাম্প সর্বদা পিছু হটেন’ (ঞৎঁসঢ় অষধিুং ঈযরপশবহং ঙঁঃ)। বর্তমান প্রেক্ষিতে একথা মিলে যায়। কেননা তিনি যে বিষয়ে ধমক দেন, সেখান থেকে পিছু হটেন। কতবার যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছেন-না হলে সাংঘাতিক কিছু করবেন, কিন্তু কোনোটাই করছেন না; হরমুজ দখল করবেন-পারলেন না। চীনা জাহাজ ‘রিচ স্টারি’ ও ইরাক থেকে আসা পণ্যবাহী জাহাজ ‘আলিসিয়া’ ট্রাম্পের অবরোধ মানেনি, অন্য কেউ অতিক্রম করেনি। মার্কিন নৌবাহিনী অবরোধে মোতায়েন ছিল, কিন্তু তারা ট্রাম্পের আদেশ মানেনি-তারা বুদ্ধিমান। তারা জানত, চীনের জাহাজে আক্রমণ করলে চীন কী করবে এবং একটি লঙ্কাকাণ্ড শুরু হয়ে যাবে। এরপর ইরানের সুপার ট্যাংকারও মার্কিন অবরোধ অতিক্রম করেছে। নিজ দেশের পোপের সঙ্গেও তিনি বিতণ্ডায় নেমেছেন যুদ্ধের বিরুদ্ধে কথা বলায়। তাই তিনি তড়িঘড়ি করে ইরানের দেওয়া ১০-দফা শর্তে রাজি হয়ে যুদ্ধবিরতি সংলাপের ব্যবস্থা করেছেন।

প্রথম ধাপে ব্যর্থ হলেও সংলাপ চলবে নিশ্চিত, যুদ্ধবিরতিতে ব্যত্যয় ঘটছে না নিশ্চিত, মধ্যপ্রাচ্য, চীন, রাশিয়া, পশ্চিমা দেশগুলো যুক্ত হচ্ছে যুদ্ধবিরতি কার্যক্রমে। ট্রাম্প নিজেও ঘোষণা দিয়েছেন-যুদ্ধ শেষ। তাই হয়তো হবে, তবে তিনি তা অবজ্ঞার সুরে বলেছেন, হুমকি দিয়েছেন। আসলে তাঁর কোনো হুমকিই তো বাস্তবায়িত হয়নি। প্রতীয়মান হচ্ছে, ট্রাম্প পাগল, উন্মাদ, ভারসাম্যহীন কিছুই নন-তবে ‘টাকো’। এক্ষেত্রেও তিনি তাই করবেন। তিনি তালে মাতাল, জাতে ঠিক; তিনি চাল দেন এবং দেখেন কী হয়। তিনি দেখেছেন যে পৃথিবীর সব দেশই এতদিন তাঁর কথায় উঠ-বস করেছে, সরকারের পরিবর্তন হয়েছে, কত রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানকে হাইজ্যাক-গুম করেছেন, কতজনকে হত্যা করেছেন-কিছুই তো হয়নি। তাই তিনি হুমকি বা ভয় দেখিয়ে কাজ উদ্ধার করতে চান। তবে তাঁর সব হিসাব-নিকাশ, সিআইএ-এর প্রতিবেদন-সব এক জায়গায় এসে হোঁচট খেয়েছে, তা হয়েছে ইরান যুদ্ধে। ইরানকে তারা চিনতে পারেনি, ইরানের মানুষকে তারা বোঝেনি। ইরান যে কারিগরি-প্রকৌশল ও বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনে কতদূর এগিয়ে গেছে, তার পূর্ণ ধারণা পায়নি যুক্তরাষ্ট্র ও তার সামরিক বাহিনী। একমাত্র ইরানই ঠেকাতে পারে পৃথিবীর এক নম্বর পরাশক্তিকে এবং বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাতে পারে। এ পর্যন্ত কোনো কথার নড়চড় হয়নি ইরানের। নিজ অধিকারের প্রশ্নে ইরান অনড়। ইরান শুধু আমেরিকা নয়, পুরো বিশ্বকে নাড়া দিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে একঘরে করে দিয়েছে। তাই অবশেষে ট্রাম্প হয়তো যুদ্ধ শেষ করবেন এবং ইরান ধ্বংস হলেও মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে শত প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও। একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার ছাড়া ইরানকে দমানো যাবে না। ট্রাম্পের কি সেই সাহস আছে? তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গরা তাঁকে তা করতে দেবে? ওদিকে ইরানও এসব বোঝে এবং পাল্টা ব্যবস্থা তৈরি করে রেখেছে। আশা করি যুদ্ধ শেষ হবে, ন্যায়ের জয় হবে, বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। ইতোমধ্যে লেবাননেও ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি শুরু হয়েছে এবং সংলাপ চলছে ইসরাইল ও লেবাননের মধ্যে। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আসবে, ফিলিস্তিনিদের রক্ষার জন্য ইরান লড়ে যাবে। পরবর্তী সংলাপে ইরান লেবানন অর্থাৎ ফিলিস্তিনিদের স্বার্থ রক্ষায় সচেতন থাকবে। যুদ্ধ শেষ তো হতেই হবে।

লেখক : সাবেক অধ্যক্ষ ও কলাম লেখক

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে