সুনামগঞ্জে হাওরের ধান তলিয়ে কৃষকের হাহাকার

এফএনএস (একে কুদরত পাশা; দিরাই, সুনামগঞ্জ) :
| আপডেট: ২৯ এপ্রিল, ২০২৬, ০৫:৪৬ পিএম | প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল, ২০২৬, ০৫:৪৬ পিএম
সুনামগঞ্জে হাওরের ধান তলিয়ে কৃষকের হাহাকার

সুনামগঞ্জে হাওরাঞ্চলে অকাল পানি বৃদ্ধি ও জলাবদ্ধতায় পাকা বোরো ধান তলিয়ে যাওয়ায় চরম দুর্দশায় পড়েছেন কৃষকেরা। জেলার ১২টি উপজেলার প্রায় একই চিত্র-কোথাও পানির নিচে পাকা ধান, কোথাও কেটে রাখা ধান ভেসে যাচ্ছে। এতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন হাওরপাড়ের কৃষকেরা। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার সকাল ৯টা থেকে বুধবার সকাল ৯টা পর্যন্ত জেলায় ২২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এ সময়ে সুরমা নদীর পানি বেড়েছে ৫৬ সেন্টিমিটার। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় ১৩৭ মিলিমিটার বৃষ্টিতে নদীর পানি বেড়েছিল ৩৫ সেন্টিমিটার। একই সঙ্গে কুশিয়ারা, নলজুর, পাটলাই, যাদুকাটা, খাসিয়ামারা ও বৌলাইসহ জেলার সব নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আজ বুধবার ও আগামীকাল বৃহস্পতিবার সুনামগঞ্জে অতিভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। উজানে ভারতের চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টির কারণে পাহাড়ি ঢল নেমে পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে হাওর ও নদ-নদীতে দ্রুত পানি বাড়ছে এবং চোখের সামনেই তলিয়ে যাচ্ছে কৃষকের স্বপ্নের ফসল।

মাঠ পর্যায়ে দেখা গেছে, পানির নিচ থেকে ধান কাটার চেষ্টা করছেন কৃষকেরা। তবে শ্রমিক সংকটের কারণে ধান কাটা ব্যাহত হচ্ছে। অনেক জায়গায় কেটে রাখা ধানও শুকাতে না পেরে পানিতে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কালিয়াকোটা হাওরপাড়ের কৃষক সাজিবুর রহমান বলেন, “আমরা এলাকাবাসী মিলে কাইমার খালে বাঁধ দিয়েছি। কিন্তু যেভাবে পানি বাড়ছে, এই বাঁধ টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। প্রশাসনের সহযোগিতা প্রয়োজন।”

ভরাম হাওরের কৃষক বাবুল দাস বলেন, “চোখের সামনে পাকা ধান পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। কিছু ধান কেটে শুকাতে দিয়েছিলাম, কিন্তু বৃষ্টিতে তা সম্ভব হচ্ছে না। এখন আল্লাহই ভরসা।” চাপতির হাওরের কৃষক আফরোজ মিয়া বলেন, “তিন দিন আগেও যেখানে পাকা ধান ছিল, এখন সেখানে শুধু পানি। পরিবার নিয়ে কীভাবে বাঁচব, সেটাই চিন্তা করছি।” এদিকে হাওরের কৃষকদের দুর্দশা দেখতে সংসদ থেকে ছুটি নিয়ে এলাকায় এসেছেন সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল। তিনি বলেন, “আমি কৃষকের সন্তান। হাওরের মানুষের সুখ-দুঃখ আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি ও বুঝি। জীবনে কখনো ভাবিনি এমপি বা উপজেলা চেয়ারম্যান হবো; তবে সবসময়ই চেয়েছি হাওরের মানুষের পাশে থাকতে।

সংসদ সদস্য বলেন, “এ কারণেই স্পিকার ও প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে ছুটি নিয়ে আমি কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে এসেছি। আমি হয়তো সব সমস্যার সমাধান করতে পারব না, তবে তাদের পাশে থেকে সাহস ও মানসিক শক্তি জোগাতে চাই।” তিনি আরও বলেন, “প্রায় ৩০ বছর ধরে আমি এই এলাকার মানুষের সঙ্গে আছি। আমি জানি, একটি পাকা ধানের সঙ্গে তাদের কত স্বপ্ন জড়িয়ে থাকে-নতুন কাপড় কেনা, সন্তানদের পড়াশোনার খরচ, সংসারের প্রয়োজন মেটানো-সবই নির্ভর করে এই ফসলের ওপর। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগে যখন সেই ফসল নষ্ট হয়ে যায়, তা মেনে নেওয়া খুবই কষ্টের।” কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এ পর্যন্ত জেলার প্রায় ৫০ শতাংশ জমির ধান কাটা হয়েছে। বাকি অর্ধেক জমির ধান অতিবৃষ্টি ও উজানের ঢলের ঝুঁকিতে রয়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, “হাওরাঞ্চলে পানি দ্রুত বাড়ছে। টানা বৃষ্টির কারণে কৃষকেরা মাড়াই করা ধানও ঠিকভাবে শুকাতে পারছেন না। ফলে তারা নানা দিক থেকে সংকটে পড়েছেন।

তিনি আরও বলেন, “জেলায় ১২ থেকে ১৪টি অটোরাইস মিল রয়েছে। জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে মিলগুলোতে কাঁচা ধান শুকানো ও প্রক্রিয়াজাত করার ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।” কৃষকদের সতর্ক করে তিনি বলেন, “ধান পলিথিন বা অন্য কিছু দিয়ে ঢেকে না রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সম্ভব হলে বড় ঘরে ধান ছড়িয়ে নেড়ে-চেড়ে রাখতে হবে, যাতে আর্দ্রতা কমে। তাহিরপুর থেকে অভিযোগ পাওয়া গেছে, কিছু কৃষক বস্তায় ভরে ধান পানিতে ভিজিয়ে রাখছেন-এটি খুবই ক্ষতিকর। এতে ধান পচে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ বিষয়ে কৃষকদের সচেতন করা হচ্ছে।”

হাওর বাঁচাও আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় বলেন, “হাওরাঞ্চলের সব নদী-খাল খননের দাবি আমরা দীর্ঘদিন ধরে জানিয়ে আসছি। কিন্তু সে উদ্যোগ না নিয়ে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে মাটির বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, “অপরিকল্পিত এসব বাঁধ এখন উল্টো কৃষকের ফসলের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিস্ময়কর বিষয় হলো-বাঁধ ভাঙেনি, তবুও একের পর এক হাওর তলিয়ে যাচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, “সুনামগঞ্জের কৃষকদের রক্ষা করতে হলে নদী-খাল খননের বিকল্প নেই। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।” বর্তমান পরিস্থিতিতে বৈরী আবহাওয়া, পানির চাপ, বজ্রপাতের আতঙ্ক ও শ্রমিক সংকট-সব মিলিয়ে হাওরাঞ্চলে গভীর সংকট তৈরি হয়েছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে