শ্রমিকের রক্তে লেখা ইতিহাস কি আজও মূল্যহীন?

এফএনএস | প্রকাশ: ১ মে, ২০২৬, ০৯:০৭ এএম
শ্রমিকের রক্তে লেখা ইতিহাস কি আজও মূল্যহীন?

শ্রম ছাড়া উৎপাদন সম্ভব নয়, শ্রমের মর্যাদা ছাড়া গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়, শ্রমিকের জীবনের নিরাপত্তা ছাড়া উৎপাদনশীল মানবিক সমাজও প্রতিষ্ঠা সম্ভব না। শ্রম ও মেধা দিয়ে যে উৎপাদন, তা থেকেই সমাজ বিকশিত হয়, পুঁজি বিকশিত হয়। কিন্তু মানুষ যখন কৃষি থেকে বিচ্যুত হয়ে শিল্পে এসেছে, তখন থেকে পুঁজিপতিরা ক্ষুদ্র থেকে দ্রুতই বড় হতে শুরু করে এবং যে মানুষ কৃষক থেকে শ্রমিকে রূপান্তরিত হয়েছে, তারা সত্যিকার অর্থে সর্বহারা শ্রেণি হিসেবে আরও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। পুঁজির মালিক শ্রমিকের সাথে ক্রীতদাসের মতো আচরণ শুরু করে, তাদের ওপর চালাতে থাকে শোষণ, নির্যাতন। শ্রমিককে এমনভাবে পুঁজির জালে আবদ্ধ করে ফেলে যে, তারা বাঁচার জন্য দিনে ১২ ঘণ্টা, ১৪ ঘণ্টা, ১৬ ঘণ্টা, ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে বাধ্য হয়। একটা সুন্দর পৃথিবীর কথা চিন্তা করারও সময় তারা পায় না। ১৮৭৯ সালে প্যারিসে প্যারি কমিউন বিপর্যয়ের পর শ্রমিকেরা আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে রাস্তায় নামে। ১৮৮৬ সালের ১ মে। শিকাগো শহরের হে মার্কেটে হাজারো শ্রমিক জড়ো হয়েছিলেন আট ঘণ্টা কর্মদিবস প্রতিষ্ঠার দাবিতে। শান্তিপূর্ণ সেই আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে রক্তাক্ত হয় শ্রমিকরা। এই আত্মত্যাগের মাধ্যমেই বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আন্দোলনে এক নতুন অধ্যায় সূচিত হয়। সেই দিনটির স্মরণেই বিশ্বব্যাপী পালিত হয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস্তমে দিবস। বাংলাদেশেও এ দিবসটি রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হয়। থাকে র‌্যালি, আলোচনা, ছুটি। কিন্তু বাস্তবতা হলো—এই দেশে শ্রমিক শ্রেণির একটি বিশাল অংশ এখনও কোনো ধরনের শ্রম অধিকার ভোগ করে না। শিকাগোর আত্মত্যাগ আজ ঢাকার কলকারখানার বাস্তবতায় নির্বাসিত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ইইঝ) সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ (২০২২) অনুসারে, দেশে আনুমানিক ৬.৮ কোটি শ্রমজীবী মানুষ রয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ৮৫% কাজ করেন অনানুষ্ঠানিক খাতে, যেখানে নেই কোনো লিখিত চুক্তি, স্বাস্থ্যবীমা, কিংবা পেনশন সুবিধা। গার্মেন্টস, নির্মাণ, পরিবহন ও কৃষিখাতের শ্রমিকরা অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, নিম্নমজুরি, এবং অনিরাপদ পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য হন। ২০২৩ সালে গাজীপুরে এক পোশাক কারখানায় আগুনে নিহত হন ১০ জন শ্রমিক। তদন্তে বেরিয়ে আসে, সেফটি এক্সিট তালাবদ্ধ ছিল। অথচ আইন অনুযায়ী, এটি একটি গুরুতর অপরাধ। ২০০৬ সালে প্রণীত এবং ২০১৩ সালে সংশোধিত বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী, শ্রমিকদের সংগঠন করার অধিকার, ধর্মঘটের অধিকার, ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। তাছাড়া ২০১৮ সালে শ্রম আইন পুনরায় সংশোধনের সময় আইএলও-এর সাথে সামঞ্জস্য রাখার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। তবে বাস্তবে এসব অধিকার প্রায় অকার্যকর। শ্রমিক সংগঠন করতে গিয়ে বহু শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। তাই  শ্রমিক আন্দোলনের সাথে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মেলবন্ধন রচনা করতে হবে। শ্রমিকের চেতনার জায়গাটাকে আরও তীক্ষ্ন-ধারালো করে তুলতে হবে। শ্রমিকের যে অধিকার আছে, তারা যে দাবি করতে পারে, তাদের যে দাবি করার অধিকার রয়েছে, সেই বোধ বা চেতনা জাগাতে হবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে