গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণের আলোকে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা সংস্কারের আহবান

এফএনএস (এম এ আজিম; খুলনা) : | প্রকাশ: ২৯ জানুয়ারী, ২০২৫, ০৫:৩২ পিএম
গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণের আলোকে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা সংস্কারের আহবান

বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো যথাযথ কর্তৃত্ব, জনবল, আর্থিক সামর্থ্য ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতির কারণে স্থানীয় জনগণকে প্রয়োজনীয় সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে নানাবিধ সমস্যার মুখোমুখি হয়। বিশেষত ইউনিয়ন পরিষদের ক্ষেত্রে এ সমস্যাগুলো অত্যন্ত প্রকট। সংসদ সদস্য-উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান-ইউএনও এ ত্রিমুখী টানাপোড়েনে উপজেলা পরিষদ যথাযথ ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারছে না। আইনে উল্লেখ থাকলেও হস্তান্তরিত কার্যক্রমগুলো এখনও উপজেলা পরিষদের কাছে যথাযথভাবে ন্যস্ত করা হয়নি। জেলা পরিষদের কাজ কী, জেলার মানুষের কোন উপকারে তারা পাশে থাকেন- এ সম্পর্কে কারোরই কোনো স্বচ্ছ ধারণা নেই। আইনগত বাধ্যবাধকতা না থাকলেও পৌরসভা এলাকার উন্নয়ন কর্মকান্ড ও সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের ‘পরামর্শ’ উপেক্ষা করা যায় না। সিটি কর্পোরেশনের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদে আমাদের ‘নগর সরকার’ গঠনের দিকে অগ্রসর হতে হবে। বুধবার (২৯ জানুয়ারি) খুলনার একটি অভিযাত হোটেলের এসডিসি’র সহযোগিতায় গভর্নেন্স এডভোকেসি ফোরাম ও ইউএনডিপির আয়োজনে ‘গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণ ও জনআকাংখার আলোকে স্থানীয় সরকার সংস্কার’ শীর্ষক বিভাগীয় সংলাপে বক্তারা এসব বলেন। গভার্নেন্স এডভোকেসি ফোরামের সচিবালয় ওয়েভ ফাউন্ডেশনের উপ-পরিচালক কানিজ ফাতেমার সঞ্চালনায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন ফোরামের সদস্য সংগঠন গভার্নেন্স কোয়ালিশনের খুলনা বিভাগীয় সমন্বয়কারী মো. নজরুল ইসলাম। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন গভার্নেন্স এডভোকেসি ফোরামের ফ্যাসিলিটেটর অনিরুদ্ধ রায়। বিভাগীয় সংলাপে স্থানীয় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, বর্তমান ও সাবেক স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি, নারী, পেশাজীবী, গণমাধ্যম কর্মী, উন্নয়ন কর্মী, সমাজকর্মী, স্বেচ্ছাসেবক, যুব প্রতিনিধি, ছাত্র প্রতিনিধি, গৃহবধূ, এনজিও সংগঠিত দলের নেত্রী, শিক্ষক, স্থানীয় ক্লাব, ধর্মীয় নেতা, দলিত, হিজড়া, অতিদরিদ্রসহ সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান শেষে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন সদস্য সংগঠন আইআরভি’র নির্বাহী পরিচালক মেরিনা পারভীন যুথী। অংশগ্রহণকারীরা মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণ করে উত্থাপিত প্রস্তাবগুলোর সাথে একমত পোষণ করে করা সুপারিশ ও মতামতগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: পরোক্ষভাবে চেয়ারম্যান বা মেয়র নির্বাচিত হলে ভোটার কেনাবেচা হতে পারে এবং একটি ভঙ্গুর পরিষদ তৈরি হবে; জনপ্রতিনিধিদের শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে; জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার শুরুতেই যথাযথভাবে তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা; উপকূলীয় অঞ্চলকে আলাদা গুরুত্ব প্রদান করা; নীতি-নির্ধারণে কীভাবে স্থানীয় সরকার ভূমিকা রাখতে পারে তা নির্ধারণ করা; উন্নয়ন বরাদ্দ সরাসরি স্থানীয় সরকার পরিষদে প্রদান করা; উপজেলা পরিষদে প্রতি ইউনিয়ন থেকে নির্বাচিত সদস্য রাখা, গ্রাম আদালতের মতো বিচারিক সেবা পৌরসভা থেকেও প্রদান করা ইত্যাদি। আলোচনায় অংশগ্রহণ করে বাগেরহাটের সন্তোষপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বিউটি আখতার বলেন, ইউনিয়ন পরিষদে ভূমি উন্নয়ন করের ১% আসলে সরাসরি পরিষদ পায় না। অন্যান্য পরিষদের মতো ইউনিয়ন পরিষদে কোনো সহকারী বা সাপোর্ট স্টাফ নাই। জনপ্রতিনিধিদের সম্মানী অত্যন্ত কম। ইউপি জনপ্রতিনিধিদের যাতায়াতের জন্যও কোনো বরাদ্দ নেই, ইউনিয়ন পরিষদে যে দপ্তরগুলোর কার্যালয় রয়েছে সেগুলো কার্যকর না। এ বিষয়গুলোতে কাজ করতে হবে। দলিত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি অঞ্জলী রাণী স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন কমিটিতে দলিত জনগোষ্ঠীদের অন্তর্ভুক্তির আহবান জানান। হিজড়া জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি পাখি দত্ত বলেন, আমরা আসলে পিছিয়ে পড়া নই, পিছিয়ে রাখা জনগোষ্ঠী। হিজড়া ছাড়াও আদিবাসী, দলিত, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা এর অংশ। ফলে এসব জনগোষ্ঠীর জন্য আসন সংরক্ষণ করা দরকার সকল স্থানীয় সরকার পরিষদে। প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে যে সংস্কার প্রস্তাবগুলো উত্থাপন করা হয় সেগুলো হলো- স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও দায়িত্ব বিভাজন, ইউনিয়ন পরিষদের ৯টি ওয়ার্ড জনসংখ্যা অনুপাতে ১২টি ওয়ার্ডে উন্নীত করা এবং সকল ইউনিয়ন পরিষদে সহকারী হিসাব কর্মকর্তা কাম কম্পিউটার অপারেটর নিয়োগসহ প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগের ব্যবস্থা করা। উপজেলা পরিষদে সংসদসদস্যদের উপদেষ্টার ভূমিকা সম্বলিত বিধান বাতিল করা। উপজেলার প্রধান হিসেবে উপজেলা চেয়ারম্যানের ভূমিকা সুনির্দিষ্ট করা এবং উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সাচিবিক দায়িত্ব সুস্পষ্ট করা। উপজেলা ভাইস-চেয়ারম্যানদের ভূমিকা, দায়-দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর করা। সকল স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে নির্বাচিত নারী প্রতিনিধিদের ভূমিকা ও দায়-দায়িত্ব সুস্পষ্ট করা। পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশনের ওয়ার্ড সংখ্যা জনসংখ্যার ভিত্তিতে বৃদ্ধি/পুনঃনির্ধারণ করা। সিটি কর্পোরেশনের ক্ষেত্রে সকল অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবা সমন্বয়ের মূল দায়িত্ব প্রদান করে ‘নগর সরকার’ বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়কে জেলা পরিষদ কার্যালয়ে রূপান্তর করা। এক্ষেত্রে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান তথা জেলা পরিষদকে সাচিবিক সহায়তা প্রদান করবেন একজন জেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। জেলা পরিষদকে জেলার অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূলকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা। দরিদ্র ও মধ্যবিত্তদের মধ্যে যুব ও নারীদের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা (মাইক্রো এন্টারপ্রেনিয়র) হিসেবে গড়ে তুলতে প্রশিক্ষণ, কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা প্রদানের পাশাপাশি মার্কেটিংয়ের জন্য সহায়তা প্রদান করা। অত্যাবশ্যকীয় গণ-পরিষেবা যেমন - শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ইত্যাদি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কাছে পূর্ণাঙ্গভাবে ন্যস্ত করা। স্থানীয় সরকারের প্রশাসনিক ও জনসেবার মান বৃদ্ধির জন্য স্থানীয় সরকার ক্যাডার সার্ভিস চালু করা।স্থানীয় সরকার পর্যায়ে নির্বাচন পদ্ধতির পরিবর্তন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন পূর্বের মতো নির্দলীয় ভিত্তিতে আয়োজন করা। পাশাপাশি পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদে সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা করা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও সমন্বয়ের সুবিধার্থে কাছাকাছি সময়ে সকল স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে নির্বাচনের ব্যবস্থা করা, স্থানীয় সরকারের সকল স্তরে এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণ করে ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে নারী প্রতিনিধিদের সরাসরি নির্বাচনের বিধান করা, কর-রাজস্ব ব্যবস্থার স্থানীয়করণ, স্থানীয় সরকারের মডেল ট্যাক্স শিডিউল হালনাগাদ করা। কর-ন্যায্যতার ভিত্তিতে বিভিন্ন স্থানীয় সরকারে বিদ্যমান অন্যায্য ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ হোল্ডিং ট্যাক্স ও অন্যান্য ফি/ ট্যারিফ সংশোধন করা। স্থানীয় সরকারের জন্য সম্পদ আহরণের নতুন উৎস অনুসন্ধান করা, আঞ্চলিক বৈষম্য ও অসমতা দূর করতে জাতীয় বাজেটে সকল স্তরের স্থানীয় সরকারের জন্য সুনির্দিষ্ট ’বাজেট বন্টন কাঠামো’ বা ’রিসোর্স ডিস্ট্রিবিউশন ফ্রেমওয়ার্ক’ তৈরি করা। বাজেটের যথাযথ ব্যবহারে উৎসাহিত করার জন্য ম্যাচিং গ্রান্ট প্রদানের ব্যবস্থা করা, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির কাছে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সকল স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচিত পরিষদের কাছে তাদের আওতাধীন কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর কার্যক্রম মনিটরিং এবং তাদের বার্ষিক কার্যক্রম প্রতিবেদন (এপিআর) লেখা কার্যকর করা, ই-গভার্নেন্স ব্যবস্থা ও ওয়েব ভিত্তিক মনিটরিং ব্যবস্থার প্রচলনসহ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর করা এবং স্থানীয় সকল উন্নয়ন কর্মকান্ডে জনঅংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, স্থানীয় সরকারের সকল স্তরে গণতান্ত্রিকভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্তগ্রহণ করা এবং সিদ্ধান্তের অনুলিপি ওয়েবসাইটে নিয়মিত প্রকাশের ব্যবস্থা করা, স্থানীয় উন্নয়নের সকল স্তরে জনঅংশগ্রহণ ও তৃণমূল মানুষের অন্তর্ভুক্তি, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের স্ট্যান্ডিং কমিটিগুলোতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা-লিঙ্গ-বয়স-প্রতিবন্ধিতা-জাতি-সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব ও অধিকসংখ্যক নাগরিক ও যুব প্রতিনিধির অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা। সামাজিক নিরীক্ষার পদ্ধতিসহ ওয়ার্ড সভা, উন্মুক্ত বাজেট, ইত্যাদি কার্যক্রমে জনঅংশগ্রহণ বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা। স্ট্যান্ডিং কমিটিগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে একশন প্ল্যান প্রণয়ন এবং এটার বাস্তবায়নে রাজস্ব খাতে বরাদ্দ রাখা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, স্থানীয় সরকার বিভাগে একটি নিবেদিত গবেষণা, ডকুমেন্টেশন ও নীতি তথ্য ভান্ডার স্থাপন করা। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে এনআইএলজির কাজের পরিধি বৃদ্ধি করা ও বিকেন্দ্রিকরণ করা, উপরিউক্ত সুপারিশসমূহ বাস্তবায়ন এবং স্থানীয় সরকারের আর্থিক মঞ্জুরি, অডিট, তদারকি ও মনিটরিংসহ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যপরিধি নির্ধারণ ও প্রয়োজনীয় নীতি প্রণয়নের জন্য অবিলম্বে একটি স্থায়ী স্থানীয় সরকার কমিশন গঠন ও কার্যকর করা। স্বাগত বক্তব্যে নজরুল ইসলাম বলেন, গভার্নেন্স এডভোকেসি ফোরাম ২০০৭ সাল থেকে প্রায় পঞ্চাশটির অধিক সংগঠন নিয়ে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণ ও শক্তিশালী স্থানীয় সরকার বিষয়ে এডভোকেসি ও ক্যাম্পেইন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। ২০০৭ সালে কনভেনশনের মাধ্যমে ফোরাম যে ৪০ দফা দাবিনামা উপস্থাপন করে তার বেশিরভাগই পরবর্তীতে প্রণীত আইনগুলোতে প্রতিফলিত হয়েছে। তবে স্থানীয় সরকার কমিশন কার্যকর না করা এবং সংসদ সদস্যদের উপজেলা পরিষদের উপদেষ্টা হিসেবে ভূমিকা রাখার বিধানের ফলাফল ভালো হয়নি। এ ধারাবাহিকতায় বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের স্থানীয় সরকার সংস্কার উদ্যোগে সহায়তা করার জন্যই ফোরামের এ প্রয়াস।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে