বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, বিগত শাসনামলে দেশের সবচেয়ে বেশি জুলুম ও অন্যায়ের শিকার হয়েছে সাতক্ষীরা জেলার মানুষ। তিনি অভিযোগ করেন, সাতক্ষীরার মানুষ ন্যায়, ইনসাফ ও ইসলামের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় তৎকালীন সরকার এই জেলাকে উন্নয়নের বাইরে রেখেছিল এবং পরিকল্পিতভাবে সাধারণ মানুষের ওপর চড়াও হয়েছিল।
মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) সাতক্ষীরায় এক সমাবেশে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ২০১৫ সালে নিজের সাতক্ষীরা সফরের স্মৃতি চারণ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, "সে সময় রাস্তাঘাটের বেহাল দশা দেখে আমি মানুষের কাছে জানতে চেয়েছিলাম। তারা বলেছিল, সরকার সাতক্ষীরাকে দেশের অংশই মনে করে না। যারা জুলুম করে আল্লাহ তাদের কাছ থেকে সম্মান কেড়ে নেন, আর সাতক্ষীরাবাসী সেই সম্মানের পথেই অবিচল ছিল।"
নিজেদের 'মাজলুম' দাবি করে জামায়াত আমির বলেন, "আমাদের অসংখ্য নেতাকর্মীকে গুম ও খুন করা হয়েছে। শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি দেওয়া হয়েছে, নিবন্ধন ও প্রতীক কেড়ে নিয়ে শেষ পর্যন্ত দলটিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। অনেককে আয়না ঘরে আটকে রাখা হয়েছিল।" সাতক্ষীরা প্রসঙ্গে তিনি আরও যোগ করেন, "এখানকার নেতাকর্মীদের ঘরবাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যা দেশের অন্য কোথাও দেখা যায়নি। আল্লাহর ওপর বিশ্বাস রাখাই ছিল তাঁদের একমাত্র অপরাধ।"
৫ আগস্টের পরিবর্তনের পর দলীয় কর্মীদের শান্ত থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, "আমরা কারো ওপর প্রতিশোধ নেব না। তবে যারা জনগনের সম্পদ লুট করে বিদেশে পাচার করেছে, তাদের ছাড় দেওয়া হবে না। ক্ষমতায় গেলে লুণ্ঠিত সম্পদ উদ্ধার করে জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে।"
তিনি আরও বলেন, আগে যারা যা করেছেন তা পরে বিচার্য, তবে এখন থেকে কোনো অন্যায় বা চাঁদাবাজি করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি দাবি করেন, জামায়াতের কোনো নেতাকর্মী চাঁদাবাজি বা দখলদারিত্বে জড়াননি।
ক্রিকেটার মোস্তাফিজুর রহমানকে শ্রীলঙ্কায় খেলার অনাপত্তি না দেওয়া প্রসঙ্গে ক্ষোভ প্রকাশ করে ডা. শফিক বলেন, "মোস্তাফিজ বিশ্ব ক্রিকেটে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করেছে। একটি ফ্রেন্ডলি ম্যাচে তাকে যেতে না দেওয়া চরম অন্যায় ও দুঃখজনক। প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে আমরা বন্ধুত্ব চাই, তবে প্রভুত্ব মেনে নেব না।"আসন্ন নির্বাচন ও ভোটাধিকার নিয়ে জামায়াত আমির বলেন, "হ্যাঁ ভোট মানে আজাদী, আর না ভোট মানে গোলামী। আমাদের যুবকরা যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছে, তা বাস্তবায়ন করা আমাদের দায়িত্ব।" দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ারও অঙ্গীকার করেন তিনি।
২০১৫ সালে নিহত নেতাকর্মীদের পরিবারের সদস্যদের সাথে দেখা করার কথা স্মরণ করে ডা. শফিকুর রহমান আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, "যাঁরা আল্লাহকে ভালোবেসে জীবন দিয়েছেন, তাঁদের ত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই আমি বারবার সাতক্ষীরায় আসি। আমরা কেবল আল্লাহর কর্তৃত্ব মানি, এটাই আমাদের আদর্শ।" বিএনপিসহ অন্যান্য বিরোধী দলও গত ১৫ বছরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাংবাদিক, আলেম-ওলামাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। “অনেক সময় জুলুমের শিকার মানুষই পরে জালিম হয়ে যায়। তাই ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা জরুরি,”বলেন তিনি। সাতক্ষীরার চারটি সংসদীয় আসনে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের সরকার গঠনের লক্ষ্যে সমর্থন চান জামায়াত আমির। তিনি বলেন, মদিনা সনদের আদলে সুশাসন প্রতিষ্ঠাই তাদের লক্ষ্য। সমাবেশে সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের আমির শহিদুল ইসলাম মুকুলের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সাতক্ষীরা-১ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী অধ্যক্ষ মুহাম্মদ ইজ্জতউল্লাহ, সাতক্ষীরা-২ আসনের প্রার্থী মুহাদ্দিস আব্দুল খালেক, সাতক্ষীরা-৩ আসনের প্রার্থী রবিউল বাশার এবং সাতক্ষীরা-৪ আসনের প্রার্থী গাজী নজরুল ইসলাম।
এছাড়া ১০ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের নেতৃবৃন্দ বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আজিজুর রহমান।