স্বৈারাচারী শেখ হাসিনা পতনের জুলাই বিপ্লব ছিলো ছাত্র-জনতার বিপ্লব। ২০২৪ এর জুলাই বিপ্লবে পিরোজপুর জেলার পাঁচজন শহীদ হয়েছিলেন। ওই পাঁচ জনের তিনজনই ছিলেন দিন মজুর আর দু’জন ছিলেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ফ্যাসিস্ট হাসিনা পতনের আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহন করে শহীদ হন জেলার নাজিরপুর উপজেলার মোঃ হাফিজুল ইসলাম ও রফিকুল ইসলাম, মঠবাড়িয়া উপজেলার আবু জাফর হাওলাদার ও মোঃ মামুন খোন্দকার এবং ভান্ডারিয়া উপজেলার মোঃ এমদাদুল হক। তাঁরা যেভাবে শহীদ হন-
শহীদ হাফিজুল
জেলার নাজিরপুর উপজেলার চর রঘুনাথপুর গ্রামের আবু বকর সিকদারের ছেলে মোঃ হাফিজুল ইসলাম ২০২৪ এর ২০ জুলাই ঢাকার মধ্য বাড্ডায় শহীদ হন। জুলাই শহীদ রিকশা চালক হাফিজুল প্রতিদিেেনর মতো ঢাকার পূর্ব বাড্ডা’র রূপনগর এলাকার বাসা থেকে তার রিকশা নিয়ে বের হন। রামপুরা, মধ্যবাড্ডাসহ ওইসব এলাকা তখন ছাত্র-জনতার আন্দোলনে উত্তাল। সময় তখন সকাল ১০ টা হবে। আন্দোলকারীদের সাথে বিজিবি-পুলিশের সংঘর্ষ চলছে। ওই সংঘর্ষের মাঝে পড়ে হাফিজুল। এ সময় বিজিবির ছোড়া গুলিতে তার বুক ঝাঁঝরা হয়ে যায়।
হাফিজুলের বাবা জানান, ঘটনাটি তিনি একটি মোবাইল ফোনের মাধ্যমে জানতে পান। তিনি ছুটে গিয়ে দেখতে পান তার ছেলেকে রক্তাক্ত অবস্থায় ছাত্ররা বাড্ডা হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তার ছেলেকে চিকিৎসা দিতে অনীহা প্রকাশ করলে ছাত্রদের চাপের মুখে চিকিৎসা শুরু করে। কিন্তু কিছুক্ষনের মধ্যেই পিতার কোলেই হাফিজুলের মৃত্যু হয়, শহীদ হন হাফিজুল।
আবু বকর জানান, গ্রামে আয় করার মত তার অবস্থা ছিলোনা। তাই বাড়ী ভিটা ছেড়ে ২১ বছর আগে ঢাকার বাড্ডায় একটি ভাড়া বাসায় থেকে সিএনজি চালিয়ে সংসার চালাতেন। বয়স ভারে তিনি এখন কিছু করতে পারেন না। তাই ছেলে হাফিজুল রিকশা চালিয়ে সংসারের হাল ধরেছিল। ছেলেই সংসারের একমাত্র উপার্যনক্ষম ব্যক্তি। আমার ছেলের দুটি নাবালক ছেলে-মেয়ে ও প্রতিবন্ধি স্ত্রী আছে। এখন এদের কে দেখবে। আমরা কোথায় যাব। সরকার যে ভাতা দেয় তাতে সংসার চলে না।
শহীদ রফিকুল
বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বৈারাচারী হাসিনা সরকার পতনের আন্দোলনে শারীরিক, মানসিক ও লেখনীর মাধ্যমে নিজেকে আত্ম নিয়োগ করেছিলেন জুলাই শহীদ মোঃ রফিকুল ইসলাম। রফিক পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার সাতকাছেমিয়া গ্রামের মো. আব্দুল জব্বার শিকদারের ছেলে। রফিকুল ১৯ জুলাই অফিস থেকে বেরিয়ে ঢাকার মানিকনগর বিশ্বরোডে প্রতিদিনের মতো আন্দোলনে যোগ দিয়ে মাগরিবের নামাজ পড়তে মসজিদে যান। এরপর তিনি আর বাসায় ফেরেননি। অনেক খোঁজাখুঁজির পরে তার স্ত্রী ও সন্তান জানতে পারে তিনি কেরানীগঞ্জ কারাগারে আছেন। পরে জানতে পারেন তিনি সেখানে নেই। ৫ আগস্ট হাসিনার পতন হলো। ৮ আগস্ট শহীদ রফিকের ভাইয়েরা আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামে গিয়ে লাশের ছবি দেখে রফিকুল ইসলামকে শনাক্ত করেন। আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম কর্তৃপক্ষ তাদেরকে জানিয়েছে রফিকুল ইসলামকে ২৪ জুলাই বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে রায়ের বাজার কবরস্থানে অগনিত লাশের সাথে দাফন করা হয়।
স্বজনরা বলছেন, লাশের ছবিতে দেখা গেছে ঘাতকরা রফিকুল ইসলামকে ধরে নিয়ে নির্মমভাবে কুপিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে হত্যা করে। যা নাৎসি বাহিনীকেও হার মানিযেছে। শহীদ রফিকুল ইসলাম এক স্ত্রী এক ছেলে রেখে গেছেন। ছেলেটি তা’মিরুল মিল্ল্লাত কামিল মাদ্রাসার আলিম শ্রেণীর ছাত্র। শহীদ রফিকের স্ত্রী নার্জিয়া ইসলাম বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা করেছে।
শহীদ মামুন খোন্দকার
চব্বিশের ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতনের মাত্র ২ ঘন্টা আগে আশুলিয়ার বাইপালে আন্দোলনরত মোঃ মামুন খোন্দকারের কপাল ভেদ করলো পুলিশের বুলেট। রাস্তায় লুটিয়ে পড়লো মামুন। সহযোদ্ধারা তাঁকে ধরাধরি করে নিয়ে গেলো সাভারের এনাম মেডিকেলে। ৭ আগস্ট ওই হাসপাতালে শহীদ হলেন মামুন খোন্দকার। পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার বেতমোর রাজপাড়া গ্রামের মৃত মজিবুর রহমান খোন্দকারের ছেলে মামুনের আশুলিয়ায় ছোট্ট একটি এম্ব্রয়ডারীর দোকান ছিলো। ওই দোকানের আয়ে ২ ছেলে ২ মেয়ে আর স্ত্রী নিয়ে ৬ জনের সংসার চলতো। এ অবস্থায়ও প্রতিদিন ছাত্র-জনতার ফ্যাসিস্ট বিরোধী আন্দোলনে আশুলিয়ার বাইপালে নেতৃত্ব দিতো মামুন।
মামুনের স্ত্রী সাথী খোন্দকার জানিয়েছেন, তাদের বড় ছেলে হেলাল খোন্দকার টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং এর ছাত্র। ছোট ছেলে সাখাওয়াত ও বড় মেয়ে মুনতাহা সাভারের একটি মাদরাসায় হিফজ এর ছাত্র। ৩ বছর বয়সী ছোট মেয়ে মাবরুকা জাহিন। সাথী জানান, সরকার থেকে প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকা পান আর নিজে ওই এম্ব্রয়ডারীর দোকান চালিয়ে যে টাকা পান তা দিয়ে কষ্টেসৃষ্টে সংসার চলে তার। জানান, স্বামী হত্যায় নিজে বাদী হয়ে মামলা করেছেন। পুলিশ এখনো চার্জশীট দেয়নি। তিনি শহীদ মামুন হত্যায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান।
শহীদ আবু জাফর
পেশায় বাস চালক মোঃ আবু জাফর। সারা দেশে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা পতনের আন্দোলন চলছে। ছাত্র-জনতার উপর পুলিশ ও আওয়ামী গুন্ডাদের অত্যাচারের দৃশ্য দেখে সইতে না পেরে জাফর নিজেও আন্দোলনে শরীক হয়ে ১৮ জুলাই সন্ধ্যা ৭ টার দিকে ঢাকার গোলাপবাগ এলাকায় পুলিশের গুলিতে শহীদ হন। জাফর জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলার ছোট মাছুয়া গ্রামের আঃ মজিদ হাওলাদারের ছেলে। শহীদ জাফর ছিলো ৬ জনের সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। স্ত্রী সেতারা বেগম, তিন ছেলে শাওন, নুহু ও নাঈম এবং দাদা এ পাঁচ জনের সংসার চলে বড় ছেলে শাওনের আয়ে। শাওন আইকনিক নামের একটি বাসের সুপারভাইজার। নুহু জানান, তার পিতা শহীদ হওয়ার পর এক মহিলা জাফরকে স্বামী দাবী করলে জাফরের পরিবার সরকারী মাসিক ২০ হাজার টাকা ভাতা পান না। জানান, তার বাবা শহীদ হওয়ার পর সরকার থেকে একেকালীন ৫ লাখ টাকা পেয়েছিলেন এবং জামায়াত ইসলামী দিয়েছিলো ২ লাখ টাকা। এ ছাড়া জামায়াত প্রতি ঈদে ১০ হাজার টাকা করে দিয়েছে। এ ছাড়া তারা অন্য কোনো সহযোগিতা পাননি। এখন তারা দুর্বিসহ জীবন যাপন করছেন বলে জানান। পিতা হত্যায় কোনো মামলা করেছেন কিনা জানতে চাইলে নুহু বলেন, কার বিরুদ্ধে মামলা করবো, মামলা করলে ওই মামলার পেছনে কে দৌড়াবে।
শহীদ এমদাদুল
ঢাকার উত্তর বাড্ডায় ২০২৪ এর ২০ জুলাই সকালে মিছিলে শরীক হন মোঃ এমদাদুল ইসলাম। মিছিলটি এ এম জেড হাসপাতালের সামনে গেলে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের ঘাতক পুলিশ গুলি চালালে একটি বুলেট তার কপাল ফুটো করে দেয়, শহীদ হন মে এমদাদুল।
জুলাই শহীদ এমদাদুল পিরোজপুর জেলার ভান্ডারিয়া উপজেলার ধাওয়া গ্রামের মোঃ আবদুস সোবাহান ও হাসিনা বেগমের দুই ছেলের মধ্যে ছোট। রিক্সা চালক পিতার ছোট ছেলে এইচএসসি পাশ এমদাদ উচ্চ শিক্ষা লাভের আশায় ঢাকায় যান। কিন্তু পরিবারে একমাত্র উপার্জনক্ষম বাবা সোবাহান রোগাক্রান্ত হলে তার উচ্চ শিক্ষা লাভ হয়ে ওঠেনি। সংসারের হাল ধরতে গাড়ির স্টিয়ারিং ধরেন এমদাদ।
ঢাকায় শুরু হয় ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার পতনের আন্দোলন। এমদাদও যোগ দেন আন্দোলনে। ২০ জুলাই ঘাতক পুলিশের ছোঁড়া বুলেটে শহীদ হন এমদাদুল।
শহীদ এমদাদুলের মা হাসিনা বেগম জানান, ‘আমাগো ৮ জনের পরিবারে কোনো জাগা জমি নাই। পরের জাগায় ঘর উডাইয়া থাহি। সামান্য বিষ্টি অইলেই ভাঙ্গা ঘরের চাল দিয়া ঘরে পানি পড়ে। এর মইদ্যে আমাগো কষ্ট কইররা থাকতে অয়।’
জুলাই শহীদ পরিবার হিসেবে সরকার থেকে মাসে বিশ হাজার টাকা ভাতা এবং ১০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র থেকে যে টাকা পায় তার একটি মোটা অংকের টাকা এমদাদুলের পিতার চিকিৎসায় ব্যয় হয়। পরিবারের খরচ মেটাতে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি এমদাদুলের বড় ভাই মোঃ হাসান এখন দিন মজুরের কাজ করে।
সরকারের কাছে দাবী জানিয়ে হাসিনা বলেন, ‘আমাগো তো কোনো জাগা-জমি, ঘরবাড়ী নাই, সরকার যদি একটু জমি দেতো, হেলে মোরা ঘর বানাইয়া থাকতে পারতাম।’ ছেলে হত্যার বিচার বিষয়ে হাসিনা বলেন, তারা কোনো মামলা করেননি। শুনেছেন ঢাকায় মামলা হয়েছে। মাঝে মধ্যে ঢাকা থেকে তদন্তে লোক আসতো। তবে এমদাদুলের পরিবার তার হত্যার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান।