বৈষম্য ও অবহেলা ঘুচিয়ে

বগুড়া তথা উত্তরাঞ্চলের ন্যায্য উন্নয়ন নিশ্চিত হবে: প্রতিমন্ত্রী

এফএনএস ( মো: রাজিবুল ইসলাম রক্তিম; বগুড়া) : | প্রকাশ: ৮ আগস্ট, ২০২৬, ০৪:৪২ পিএম
বগুড়া তথা উত্তরাঞ্চলের ন্যায্য উন্নয়ন নিশ্চিত হবে: প্রতিমন্ত্রী

দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত বৈষম্য, অবহেলা ও বঞ্চনার গণ্ডি পেরিয়ে বগুড়াসহ সমগ্র উত্তরাঞ্চলের ন্যায্য উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন সরকারের তিন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী। বগুড়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির নবনির্বাচিত পরিচালনা পর্ষদের অভিষেক অনুষ্ঠানে প্রধান ও বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তারা এই ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন। গত শনিবার (৮ আগস্ট ২০২৬) সকালে বগুড়ার মমইন কনভেনশন সেন্টারে আয়োজিত এ জমকালো অভিষেক অনুষ্ঠানটি স্থানীয় ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তা এবং সাধারণ মানুষের মনে এক নতুন আশার আলো ছড়িয়ে দিয়েছে। সাতটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা তিন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে শিল্পায়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, শিক্ষা ও বিমান যোগাযোগ সম্প্রসারণ এবং নদী পুনর্জীবনসহ বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের রূপরেখা উন্মোচিত হয়েছে।

বিসিক শিল্পপার্ক ও শিল্পায়নের নতুন দিগন্ত

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এমপি বলেন যে, সরকারের পক্ষ থেকে পরিচালিত বিভিন্ন জরিপে বগুড়ার শিল্পোন্নয়নের ক্ষেত্রে অত্যন্ত ব্যাপক ও জোরালো চাহিদা রয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, অতীতে সেই চাহিদা ও প্রয়োজনের তুলনায় বগুড়ার তেমন কোনো দৃশ্যমান উন্নয়ন হয়নি। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে বগুড়ার অর্থনৈতিক ভিত্তিকে শক্তিশালী করতে ৪০০ একর জমির ওপর একটি আধুনিক বিসিক শিল্পপার্ক প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন তিনি। মন্ত্রী আরও বলেন, বগুড়া আমাদের সবার আবেগের একটি অনন্য কেন্দ্রবিন্দু। এ অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পের যে বিশাল সম্ভাবনা লুকিয়ে রয়েছে, তাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে বর্তমান সরকার সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করবে।

ঐতিহাসিক বঞ্চনা ও উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক গুরুত্ব

অনুষ্ঠানের উদ্বোধক সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেল এবং নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল ইসলাম তাঁর বক্তব্যে বগুড়ার ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বগুড়া বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিকে গভীরভাবে সমৃদ্ধ করেছে। বিশেষ করে, জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বগুড়ার কৃতি সন্তান এবং জাতি গঠনে তাঁর অনন্য অবদান কোনোদিন ভোলার নয়। বগুড়ার ঐতিহাসিক অবদানের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, এ অঞ্চলের কাছে পুরো দেশ সবসময় কৃতজ্ঞ থাকতে পারে।

বিগত সময়ের রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক বৈষম্যের কথা স্বীকার করে মন্ত্রী স্পষ্টভাবে বলেন, গত বিশ বছর ধরে বগুড়া নানাভাবে উন্নয়নবঞ্চিত হয়েছে-এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই। অথচ এই অঞ্চলের পরিশ্রমী ও সৎ মানুষ দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। জাতীয় অগ্রগতির স্বার্থেই এখন সুষম উন্নয়নের অংশ হিসেবে বগুড়ার সার্বিক উন্নয়ন বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বিমানবন্দর, রেলপথ, ওভারপাস ও মেগা উন্নয়ন পরিকল্পনা

অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এমপি বগুড়ার উন্নয়নে সরকারের গৃহীত বহুমুখী কর্মপরিকল্পনার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বগুড়া একটি প্রধান খাদ্য উদ্বৃত্ত জেলা এবং এখান থেকে উৎপাদিত কৃষিপণ্য প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার বাজার সৃষ্টি করে সারা দেশসহ বিদেশেও রপ্তানি হয়। এতৎসত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলটি নানাভাবে অবহেলিত ও বঞ্চিত ছিল। বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশে বগুড়ার অতীতের সমস্ত ঘাটতি পূরণ করে এখন সম্পূর্ণ ন্যায্যতার ভিত্তিতে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ নির্মাণের অগ্রগতি সম্পর্কে প্রতিমন্ত্রী জানান, আগামী নভেম্বর কিংবা ডিসেম্বর মাসের মধ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন। এছাড়া বগুড়া বিমানবন্দর চালুর বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, আগামী ২০২৭ সালের জানুয়ারির মধ্যে অন্তত দেশের অভ্যন্তরীণ রুটে বিমানবন্দরটি যাতে চালু করা যায়, সেই লক্ষ্য সামনে রেখে জোর প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। একই সঙ্গে আগামী মাস থেকেই স্থানীয় পর্যায়ে ড্রোন তৈরির কারখানার কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে বলে তিনি সুসংবাদ দেন।

শহরের দীর্ঘদিনের তীব্র যানজট নিরসনে রেললাইনের ওপর একটি আধুনিক ওভারপাস নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, এই ওভারপাস নির্মিত হলে বগুড়া শহরের যানজট পরিস্থিতির অভূতপূর্ব উন্নতি ঘটবে। করতোয়া নদীর বর্তমান বেহাল দশা ও পুনর্জীবন প্রসঙ্গে মীর শাহে আলম বলেন, সরকারের বিশেষ উদ্যোগে এককালের খরস্রোতা করতোয়া নদী আবারও তার হারানো প্রাণ ও রূপ ফিরে পাচ্ছে। এছাড়া ক্রীড়া খাতের আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে বগুড়ার তিনমাথায় একটি আধুনিক ক্রীড়াগ্রাম ও আন্তর্জাতিক মানের ফুটবল স্টেডিয়াম নির্মাণের পরিকল্পনাও তুলে ধরেন তিনি। ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্বের কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, বগুড়ার সঙ্গে অন্য কোনো অঞ্চলের তুলনা চলে না; কারণ এই জেলার ওপর দিয়ে ১৩টি জেলার মানুষ যাতায়াত করে। কৃষি ও শিল্পের প্রতিটি ক্ষেত্রেই বগুড়া অত্যন্ত সমৃদ্ধ।

স্থানীয় সংসদ সদস্য ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতি

অভিষেক অনুষ্ঠানে বগুড়ার সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভাবনা নিয়ে নিজেদের মতামত প্রকাশ করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বগুড়া-৬ আসনের সংসদ সদস্য রেজাউল করিম বাদশা, বগুড়া-৫ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ, বগুড়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোশারফ হোসেন, বগুড়া-৭ আসনের সংসদ সদস্য মোরশেদ মিল্টন, বগুড়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল মুহিত তালুকদার, বগুড়া সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক এমআর ইসলাম স্বাধীন, বিসিক চেয়ারম্যান বেনজীর আহমেদ, বগুড়া জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান, টিএমএসএসের নির্বাহী পরিচালক ড. হোসনে আরা বেগম এবং বগুড়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হামিদুল হক চৌধুরী হিরু।

ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা ও সমাপ্তি

বগুড়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির নবনির্বাচিত পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি আতিকুর রহমান বাদলের সভাপতিত্বে এই জমকালো অভিষেক অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। অনুষ্ঠানে বগুড়ার শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অবহেলা ও বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে একসঙ্গে এতগুলো মেগা উন্নয়ন প্রকল্পের ঘোষণা আসায় স্থানীয় ব্যবসায়ী মহলে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনা লক্ষ করা গেছে। তারা আশা প্রকাশ করছেন যে, এই পরিকল্পনাগুলো দ্রুত বাস্তবায়িত হলে বগুড়া কেবল উত্তরাঞ্চলের নয়, বরং সারা দেশের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে