মাত্র ২৫ হাজার টাকা মাসিক বেতন। অথচ আট বছরের ব্যবধানে মাটির ঘর বদলে গ্রামে গড়ে উঠেছে বিলাসবহুল বাড়ি। স্থানীয়দের দাবি, জমি-জমা ও অন্যান্য সম্পদ মিলিয়ে এখন তাঁর সম্পদের পরিমাণ অন্তত ২০ কোটি টাকা। কীভাবে এত অল্প সময়ে এই বিপুল সম্পদের মালিক হলেন নিশান সোসাইটির সাবেক এরিয়া ম্যানেজার জামাল মিয়া-এ প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে মাধবপুরের চৌমুহনী ইউনিয়নের সাহেবনগরসহ আশপাশের এলাকায়।
অভিযোগ উঠেছে, নিশান সোসাইটির এরিয়া ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় গ্রাহকদের আস্থা ও বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে অধিক মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ টাকা আমানত হিসেবে সংগ্রহ করেন জামাল। কিন্তু এসব অর্থ প্রতিষ্ঠানের হিসাবে জমা না দিয়ে ব্যক্তিগতভাবে আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। প্রথম দিকে কয়েক মাস নিয়মিত মুনাফা দিয়ে আমানতকারীদের বিশ্বাস অর্জন করলেও পরে বড় অঙ্কের টাকা নেওয়ার পর তিনি গা-ঢাকা দেন বলে অভিযোগ তাঁদের।
ভুক্তভোগীদের দাবি, শুধু সাহেবনগর নয়, মাধবপুর ও আশপাশের বিভিন্ন গ্রামের বহু মানুষ তাঁর কাছে টাকা দিয়ে এখন সর্বস্বান্ত হওয়ার পথে।
‘মুনাফা দিয়ে বিশ্বাস, পরে টাকা নিয়ে উধাও’ ভুক্তভোগীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মনির মিয়ার কাছ থেকে ৭ লাখ, সুমন মিয়ার কাছ থেকে ৮ লাখ, মীর হৃদয়ের কাছ থেকে ৫ লাখ, মোশাররফ হোসেনের কাছ থেকে ১৭ লাখ, পারভীন আক্তারের কাছ থেকে ৮ লাখ, জাহাঙ্গীর মিয়ার কাছ থেকে ১৪ লাখ, নার্গিস আক্তারের কাছ থেকে ১৩ লাখ, বাবু মিয়ার কাছ থেকে ৮ লাখ এবং আরেক মোশাররফ হোসেনের কাছ থেকে ১৮ লাখ টাকা আমানত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে জামালের বিরুদ্ধে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, টাকা নেওয়ার পর কয়েক মাস নিয়মিত মুনাফা দেওয়ায় তাঁরা আরও বেশি আস্থাশীল হয়ে পড়েন। সেই সুযোগে তাঁদের পরিচিত আরও অনেকের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করেন জামাল। পরে একপর্যায়ে আমানতের টাকা ফেরত দেওয়া বন্ধ করে দেন তিনি। বিজয়নগর উপজেলার মেঘশিমুল গ্রামের এমদাদ বলেন, জামাল তাঁর কাছ থেকে ৭ লাখ টাকা নিয়েছিলেন। কিন্তু এখন তাঁর সঙ্গে কোনোভাবেই যোগাযোগ করতে পারছেন না তিনি। ভবানীপুর গ্রামের মোশাররফ হোসেনের অভিযোগ, জামালকে বিশ্বাস করে তিনি ২০ লাখ টাকা দিয়েছিলেন। এখন সেই টাকা ফেরত পাওয়া তো দূরের কথা, জামালের সঙ্গেই যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।
সম্পদের উৎস নিয়েও প্রশ্ন
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কয়েক বছর আগেও জামালের আর্থিক অবস্থা ছিল সাধারণ। সাহেবনগর গ্রামে ছিল মাটির ঘর। কিন্তু নিশান সোসাইটিতে চাকরির পর অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর জীবনযাত্রায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আসে। অভিযোগ রয়েছে, মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে তিনি বিপুল জমি-জমা, বাড়ি ও অন্যান্য সম্পদের মালিক হয়েছেন। সাহেবনগরে পুরোনো মাটির ঘরের জায়গায় নির্মাণ করেছেন ব্যয়বহুল বাড়ি। স্থানীয়দের প্রশ্ন-মাত্র ২৫ হাজার টাকা মাসিক বেতনের চাকরি করে আট বছরে কথিত কোটি কোটি টাকার এই সম্পদ কীভাবে গড়ে উঠল? তবে জামালের কথিত ২০ কোটি টাকার সম্পদের হিসাব স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তাঁর নামে থাকা জমি, বাড়ি, ব্যাংক হিসাব ও অন্যান্য সম্পদের দলিলপত্র যাচাই করা হলে এ বিষয়ে প্রকৃত চিত্র পাওয়া যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
একাধিক মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা?
ভুক্তভোগীদের দাবি, টাকা ফেরত চাওয়ার পর জামালের বিরুদ্ধে চেক প্রতারণাসহ বিভিন্ন আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কয়েকটি মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে বলেও দাবি তাঁদের। বর্তমানে তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। তবে এসব মামলার সংখ্যা, মামলা নম্বর, আদালতের আদেশ এবং গ্রেফতারি পরোয়ানার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট আদালতের নথি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
‘যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি’
জামালের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে তাঁর স্ত্রী হাসিনা বেগম স্বামীর বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘কিছু দুষ্টু প্রকৃতির মানুষ আমাদের ক্ষতি করতে উঠেপড়ে লেগেছে। তারা নানা অভিযোগ করছে। আল্লাহ সহায় থাকলে কেউ আমাদের কিছু করতে পারবে না।’
তদন্তের দাবি
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, তাঁদের কাছ থেকে নেওয়া বিপুল অর্থ কোথায় গেছে, ওই অর্থ নিশান সোসাইটিতে জমা হয়েছিল কি না, জামালের নামে বা তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে কী পরিমাণ সম্পদ রয়েছে এবং এসব সম্পদের বৈধ উৎস কী-এসব বিষয় তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। মাধবপুর থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ সোহেল রানা বলেন নিশান এনজিও এর মালিক ও কর্মচারীরা গ্রাহকের শত কোটি টাকা আত্নসাৎ করেছে। তাদের বিরুদ্ধে অনেক মামলা রয়েছে। জামালের বিরুদ্ধে ওযারেন্ট রয়েছে। তবে কয়টি রয়েছে তা দেখে বলতে হবে।