ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলের উত্তর কুট্রাপাড়া (খুরশেদ ভবনের) ৩ এনজিও অফিসে দূর্ধর্ষ ডাকাতির ঘটনায় দায়ের করা মামলার প্রধান আসামী পেশাদার ডাকাত গাফ্ফার (৩৫) এখন পুলিশের কব্জায়। গত ২৪ আগষ্ট সোমবার দুপুরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর এলাকা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া মডেল থানা পুলিশের সহায়তায় সরাইল থানার এস আই রাজিব বড়ুয়ার নেতৃত্বে একদল পুলিশ গাফ্ফারকে গ্রেপ্তার করেন। দূর্ধর্ষ ডাকাত গাফ্ফার সদর উপজেলার খাঁটিহাতা গ্রামের কাদির মিয়ার ছেলে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এনজিও অফিসের ডাকাতির ঘটনায় জড়িত থাকার তথ্য পেয়েছেন পুলিশ। ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ আদালতে ৭ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেছেন। তার বিরূদ্ধে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর, সরাইল, ঢাকাসহ বিভিন্ন থানায় ডাকাতি ও দস্যুতার একাধিক মামলার রেকর্ড পাওয়া গেছে। তবে তার একাধিক স্বজন এ ঘটনায় সম্পৃক্ততায় সন্দেহ পোষণ করে বলছেন, সুযোগে প্রকৃত অপরাধীরা যেন পারপেয়ে না যায়। পুলিশ, মামলা ও স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, গত ২১ আগষ্ট শুক্রবার গভীররাতে সরাইল-নাসিরনগর-লাখাই আঞ্চলিক মহাসড়ক সংলগ্ন সরাইল সদরের কুট্রাপাড়া এলাকায় সামছুদ্দিন মিয়ার বহুতল ভবনের (খুরশেদ ভবন) প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয়তলায় ৩টি এনজিও অফিসে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। মুখোশ পড়া সংঘবদ্ধ ডাকাতদল দেশীয় অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে জিম্মি করে ওই অফিস থেকে নগদ ৫ লক্ষাধিক টাকা ছিনিয়ে নেয়ার অভিযোগ করেছেন কর্মকর্তারা। বাঁধা দেওয়ায় রাব্বি মিয়া নামের এক হিসাব রক্ষককে মারধর ও কুপিয়ে গুরূতর আহত করেছে ডাকাতরা। ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে এখন মৃত্যুর সংগে পাঞ্জা লড়ছেন রাব্বি। গার্কের ফিল্ড অফিসার স্বপন রাজবংশী, সারোয়ার ও এরিয়া ম্যানেজার গোলাম মোস্তফা বলেন, তালা কাটার শব্দে ঘুম থেকে উঠেছি। ডাকাতরা প্রথমেই বাহিরের দিকে আমাদের দরজার চিটকারি লাগিয়ে দিয়েছে। চিৎকার করছি কেউ খুলেনি। ভোর বেলা কাজের বোয়া এসে খুলে দিয়েছেন। ডাকাতরা সিসি টিভির রেকর্ড বক্সটি নিয়ে গেছে। তবে আমাদের দক্ষিণ পাশের ভবনে সিসি টিভি আছে। এত বড় ভবনে কোন সিকিউরিটি গার্ডও নেই। পরের দিন সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সরাইল থানার পুলিশ। উপজেলা সদরে হাইওয়ে থানা ও সরাইল থানার নিকটবর্তী স্থানে মহাসড়ক ঘেষা ভবনে এমন দূর্ধর্ষ ডাকাতির ঘটনায় ভীত সন্ত্রস্থ হয়ে পড়েন সাধারণ লোকজন। এমন জঘন্য ও ন্যাক্কারজনক ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত, গ্রেপ্তার আর বিচার দেখার অপেক্ষা করতে থাকেন এলাকাবাসী। আহত রাব্বি মিয়া পুলিশকে জানায়, মুখোশ পড়া ডাকাতরা ডাকাতি ও তাকে মারধর করার সময় হঠাৎ একজনের মুখোশ খুলে যায়। এ সময় দেখা ওই ডাকাতের শরীরের গঠন, রং, মুখের অবয়ব, মাথা ও চুলের অবস্থাসহ অন্যান্য সকল বিষয়ের ব্যাখ্যা দেন। এমন তথ্যের ভিত্তিতেই সরাইল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. মনজুর কাদেরের নেতৃত্বে পুলিশ প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাদের তদন্ত শুরূ করেন। তদন্তে পুলিশের সন্দেহের তালিকায় আসে দুই ব্যক্তি। তাদের একজন খাঁটিহাতা গ্রামের প্রয়াত কাদির মিয়ার ছেলে গাফ্ফার। গত ২৩ আগষ্ট রোববার রাত ১০টার দিকে সদর উপজেলার খাঁটিহাতা গ্রামে অভিযান চালায় সরাইল থানার এস আই রাজিব বড়ুয়া। অভিযানকালে তিনি ডাকাত গাফ্ফারকে আটক করে হ্যান্ডকাপ পড়ানোর সময় তার স্বজন ও এলাকাবাসী পুলিশের উপর চড়াও হয়। তারা ধস্তাধস্তি করে পুলিশের কাছ থেকে গাফ্ফারকে ছিনিয়ে নেয়। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে দুই ব্যক্তিকে আটক করেন। পরে স্থানীয় ও জেলার রাজনৈতিক ব্যক্তিদের মধ্যস্থতায় সমঝোতা ঘটনাটি নিস্পত্তি হয়। পরের দিন জেলা শহর থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সদর মডেল থানার সহায়তায় সরাইল থানার পুলিশ ডাকাত গাফ্ফারকে গ্রেপ্তার করেন। পুলিশ জানায়, গাফ্ফারের অপকর্মের শিকর অনেক গভীরে। তার বিরূদ্ধে ডাকাতি ও দস্যুতার অভিযোগে ঢাকায় ১টি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানায় ৩টি ও সরাইল থানায় ১টি সহ মোট ৫টি মামলা রয়েছে। সরাইল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. মনজুর কাদের বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এনজিও অফিসে ডাকাতির ঘটনায় জড়িত থাকার কথা শিকার করেছে। বিস্তারিত জানতে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন। তাই আমরা আদালতের কাছে ৭ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেছি। আগামী রোববার ওই আবেদনের শুনানি হতে পারে।
যেভাবে দূর্ধর্ষ ডাকাত গাফ্ফার:
বিশ্বরোড মোড়ের পাশের খাঁটিহাতা গ্রামের মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম গ্রহণ করা গাফ্ফার বেড়ে উঠেছে নানা অপকর্ম ও অপরাধীদের মাঝে। জীবনের প্রয়োজনে গাফ্ফার এক সময় চলে যায় প্রবাসে। কিছুদিন পরই আবার ফিরে আসে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর ও সরাইলের সীমানায় বিশ্বরোড মোড় ঘেষেই তাদের বসবাস। এ মোড়টি রাজধানী ঢাকাসহ বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি জেলার ট্রানজিট পয়েন্ট। ব্যস্ততম এই মোড়ে মাদকসেবন ও ব্যবসা, চুরি, ছিনতাই, ফুটপাতের দোকানে চাঁদাবাজি, সড়কে যানবাহনে চাঁদাবাজি ডাকাতির ঘটনা ঘটছে অহরহ। দেখতে দেখতে এক সময় গাফ্ফারের বন্ধু মহলের আকার বৃদ্ধি পায়। মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে গাফ্ফার। সকাল দুপুর রাত শুধু টাকার সন্ধান করতে থাকে। মা বাবা শেষ করে সড়কের পাশের ফুটপাতের ব্যবসায়িদের কাছ থেকে দৈনিক চাঁদার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। মাদক ও জুয়ার ছোবলে গাফ্ফারের জীবন এলোমেলো হয়ে যায়। টাকার জন্য উশৃঙ্খল হয়ে ওঠে। জড়িয়ে পড়ে চুরি ছিনতাই আর ডাকাতির মত ঘটনায়। পরবর্তীতে তার অপরাধের শিকর শাখা প্রশাখা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। তার রয়েছে বিশাল এক সিন্ডিকেট। গাফ্ফারের নাম শুনলেই চমকে উঠেন বিশ্বরোড মোড়ের ব্যবসায়ি ও যান চালকরা। পুলিশের দেয়া তথ্য মতে গাফ্ফারের ওই সিন্ডিকেটের সদস্যরাই এনজিও অফিসে দূর্ধর্ষ ডাকাতির ঘটনাটি ঘটিয়েছে।