কৃষি উৎপাদন বাড়াতে কীটনাশকের ব্যবহার প্রয়োজন হলেও এর অনিয়ন্ত্রিত ও ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবহার এখন জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতিরিক্ত ও অনিরাপদ কীটনাশক ব্যবহারের কারণে যেমন কৃষকের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে তেমন খাদ্যপণ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতির আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে এবং মাটি ও জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও অতিঝুঁকিপূর্ণ কিছু বালাইনাশক নিষিদ্ধের দাবি নতুন করে সামনে এসেছে। কীটপতঙ্গ দমনে কৃষকেরা দীর্ঘদিন ধরে রাসায়নিক কীটনাশকের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি মাত্রায় কিংবা সঠিক নির্দেশনা ছাড়া এসব রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে শুধু ফসলের জমি নয়, কৃষক ও ভোক্তাও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় অনিয়ন্ত্রিত কীটনাশক ব্যবহারের কারণে কৃষকদের ক্যানসারসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। ঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশকের ক্ষতি শুধু মানবদেহেই সীমাবদ্ধ নয়। এসব রাসায়নিক মাটির গুণাগুণ নষ্ট করতে পারে, পানির স্বাভাবিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং উপকারী পোকামাকড় ও প্রাণবৈচিত্র্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থাকেও দুর্বল করতে পারে। তবে কৃষিতে কীটনাশকের প্রয়োজনীয়তা পুরোপুরি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ফসল রক্ষায় নিরাপদ ও অনুমোদিত বালাইনাশকের ব্যবহার প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু কোন কীটনাশক কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, কী পরিমাণ ব্যবহার করা যাবে এবং কীভাবে ব্যবহার করতে হবে-এসব বিষয়ে কৃষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা নিশ্চিত করা জরুরি। এমতাবস্থায় সরকারকে অতিঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশকের তালিকা পুনর্বিবেচনা করে ধাপে ধাপে নিষিদ্ধ করতে হবে। বাজারে নিষিদ্ধ ও নিম্নমানের কীটনাশকের প্রবেশ বন্ধে কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে কীটনাশক বিক্রেতাদের নিয়ন্ত্রণ, কৃষকদের প্রশিক্ষণ এবং বিকল্প নিরাপদ পদ্ধতির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু আইন করলেই হবে না, মাঠপর্যায়ে এর কার্যকর প্রয়োগও নিশ্চিত করতে হবে। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে কৃষিতে ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা জরুরি। কৃষকের উৎপাদন, ভোক্তার নিরাপত্তা এবং পরিবেশের ভারসাম্য-এই তিনটি বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিয়েই কীটনাশক ব্যবস্থাপনা করতে হবে।