জলবায়ু পরিবর্তন ও নগরায়নের যুগে ডেঙ্গু এখন আর মৌসুমী সমস্যা নয়; এটি দেশের জনস্বাস্থ্যের স্থায়ী চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। তাপমাত্রা বাড়া, অনিয়মিত বর্ষা, জলাবদ্ধতা ও আর্দ্রতার দীর্ঘায়িত সময়—এসবই এডিস মশার প্রজননকে সহজ করে দিয়েছে। ফলে রোগের বিস্তার দ্রুত বাড়ছে, ভাইরাসের সংক্রমণ ক্ষমতাও বাড়ছে এবং রোগী সেবা ব্যবস্থার ওপর চাপ দিন দিন বাড়ছে। এই বাস্তবতা যে জরুরি পদক্ষেপ দাবি করে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না: আগাম সতর্কতা, লক্ষ্যভিত্তিক লার্ভা নিয়ন্ত্রণ, শক্তিশালী নজরদারি ও স্থানীয় অংশগ্রহণ— এই চারটি স্তম্ভ ছাড়া ডেঙ্গু মোকাবিলা অসম্ভব। কিন্তু বাস্তবে যা হচ্ছে, তা এই প্রয়োজনের সঙ্গে মেলে না। বর্ষা শুরু হলে হঠাৎ করেই বাজেট বাড়ানো, ফগিং‑ভিত্তিক তৎপরতা এবং অস্থায়ী অভিযান—এসবই এখন নিত্যনৈমিত্তিক রুটিনে পরিণত হয়েছে। ফগিংয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা লার্ভা ধ্বংস করে না; বরং দীর্ঘমেয়াদে কীটনাশকের প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে। একই সঙ্গে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে কেনা কীটনাশকের গুণগত মান ও সরবরাহে অনিয়ম, নকল পণ্যের প্রবেশ এবং তদারকির অভাব কার্যকর নিয়ন্ত্রণকে ব্যর্থ করে দিচ্ছে। তথ্য‑ভিত্তিক নজরদারি নেই; মশার প্রজাতি ও ঘনত্ব নিরূপণে পর্যাপ্ত গবেষণা ও জনবল নেই; প্রতিটি সিটি করপোরেশনে কীটতত্ত্ববিদের অভাব কার্যকর পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত করছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনগণের অংশগ্রহণ অপরিহার্য। কিন্তু বহু মানুষ এখনও মনে করেন দায়িত্ব শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর। প্রতিটি পরিবারকে সপ্তাহে এক দিন বাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার করার মতো সহজ অভ্যাস গড়ে তুলতে না পারলে প্রজননস্থল ধ্বংসের কাজ অসম্পূর্ণ থাকবে। অপরদিকে নগরপরিকল্পনায় জলাবদ্ধতা রোধ, ড্রেন পরিষ্কার রাখা ও নির্মাণস্থলে তদারকি না থাকায় নতুন প্রজননস্থল তৈরি হচ্ছে—এগুলোই রোগকে বারোমাসি করে তুলছে। ডেঙ্গুকে মৌসুমী কর্মসূচি হিসেবে না দেখে সারা বছরের পরিকল্পনায় পরিণত করতে হবে। রিয়েল‑টাইম সার্ভেইলেন্স, জিআইএস‑ভিত্তিক হটস্পট শনাক্তকরণ, আবহাওয়া‑ভিত্তিক পূর্বাভাস ও লক্ষ্যভিত্তিক লার্ভা নিয়ন্ত্রণ একসঙ্গে চালু করতে হবে। প্রতিটি সিটি করপোরেশনে কীটতত্ত্ববিদ ও পর্যাপ্ত মাঠকর্মী নিয়োগ, কীটনাশক ক্রয়‑প্রয়োগে স্বচ্ছতা ও অডিট বাধ্যতামূলক করা জরুরি। হাসপাতালগুলোকে বর্ষার আগেই প্রস্তুত রাখতে হবে—ডেঙ্গু কর্নার, পর্যাপ্ত স্যালাইন ও প্রশিক্ষিত স্টাফ নিশ্চিত করতে হবে। টিকা একটি সহায়ক হাতিয়ার হতে পারে, কিন্তু তা কখনোই একমাত্র সমাধান নয়; টিকা প্রয়োগের আগে স্থানীয় রোগপ্রবণতা ও টিকার কার্যকারিতা যাচাই অপরিহার্য। সবচেয়ে বড় কথা, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সফলতা পেতে হলে সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্যকর্মী ও জনগণ— এই চারপক্ষীয় সমন্বয় ছাড়া কাজ হবে না।