সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ ও মধ্যবিত্তের ওপর নতুন করে অপ্রত্যক্ষ করের বোঝা না চাপিয়ে দেশের তামাক খাতের মতো উচ্চ-সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রগুলোতে প্রযুক্তিনির্ভর কঠোর নজরদারি ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বাস্তবায়নের মাধ্যমে রাজস্ব আদায় বহুগুণ বাড়ানোর একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা উন্মোচন করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। চলতি অর্থবছরে জাতীয় কোষাগারের বিশাল রাজস্ব ঘাটতি মেটানোর লক্ষ্য সামনে রেখে সংস্থাটি কেবল তামাক শিল্প থেকেই অতিরিক্ত ১৫ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব সংগ্রহের পাঁচ ধাপে বিভক্ত এক বিস্তৃত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। বর্তমানে এই শিল্প থেকে রাষ্ট্র প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব পেয়ে থাকলেও উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ ও বাজারজাতকরণের নানা ধাপে ডিজিটাল নজরদারির অভাব এবং তামাক কোম্পানিগুলোর কৌশলী কর ফাঁকির কারণে বিশাল অঙ্কের আয়ের সুযোগ হাতছাড়া হয়ে আসছিল। এনবিআরের নতুন কৌশলগত নীতি অনুযায়ী, সনাতন পদ্ধতির বদলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংবলিত ক্যামেরা, ডিজিটাল ট্র্যাকিং প্রযুক্তি এবং পণ্যের মূল্যস্তরের প্রয়োজনীয় সমন্বয় ঘটিয়ে এই বিপুল পরিমাণ বাড়তি অর্থ আহরণ সম্পূর্ণ সম্ভব। সামগ্রিক করের হার না বাড়িয়ে ফাঁকফোকর বন্ধের এই উদ্যোগকে রাজস্ব আয় বৃদ্ধির এক কার্যকর বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। জানা গেছে, তামাক খাত থেকে প্রাক্কলিত এই অতিরিক্ত কর আদায় নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এনবিআর প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণকে। নতুন এই পরিকল্পনার অধীন তামাকজাত পণ্যের কারখানাগুলোতে কেন্দ্রীয়ভাবে ডিজিটাল নজরদারি চালাতে স্বয়ংক্রিয় পণ্য গণনা যন্ত্রের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ক্যামেরা স্থাপন করা হবে। সিগারেটের প্যাকেটের গায়ে থাকা ব্যান্ডরোল ও স্ট্যাম্পে কিউআর এবং এআর কোড সংযুক্ত করে একটি সমন্বিত ‘ট্র্যাক অ্যান্ড ট্রেস’ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে, যার মাধ্যমে কারখানা থেকে খালাস হওয়া প্রতিটি চালানের গতিবিধি চূড়ান্ত খুচরা বাজার পর্যন্ত তদারকি করা সম্ভব হবে। প্রস্তাবিত কর্মপরিকল্পনায় তামাকজাত পণ্যের মূল্যস্তর বৃদ্ধির মাধ্যমে সবচেয়ে বড় অংশ, অর্থাৎ অতিরিক্ত প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্য রাখা হয়েছে। এর বাইরে আধুনিক ট্র্যাকিং ব্যবস্থার সাহায্যে অবৈধ উৎপাদন ও বিপণন বন্ধ করে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা এবং প্রক্রিয়াজাত তামাকপাতার ডিস্ট্রিবিউশন নিয়মিত পরিবীক্ষণ করে আরও প্রায় ৬০০ কোটি টাকা সংগ্রহের ছক আঁকা হয়েছে। এছাড়া বাজারে জাল স্ট্যাম্প বা রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া পণ্যের বিস্তার রোধে সাধারণ নাগরিকদের সরাসরি তথ্য প্রদানের সুযোগ দিতে একটি বিশেষ মোবাইল অ্যাপ চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যেখানে সঠিক তথ্যদাতাদের উৎসাহিত করতে অর্থ পুরস্কারের আইনি বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। সূত্রমতে, তামাক খাতের এই বিশেষ পরিকল্পনার বাইরেও পুরো অর্থবছরজুড়ে সরকারের নির্ধারিত বিশালাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সংস্থাটির প্রতিটি বিভাগকে সুনির্দিষ্ট কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরে এনবিআরকে আদায় করতে হবে মোট ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, যার সিংহভাগ জোগানে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে ভ্যাট ও আয়কর বিভাগ। এই দুটি স্বতন্ত্র বিভাগের প্রতিটির জন্যই ২ লাখ ২৩ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা করে রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে, আর অবশিষ্ট ১ লাখ ৫৭ হাজার ৪০ কোটি টাকা সংগ্রহের দায়িত্ব শুল্ক বিভাগের ওপর অর্পণ করা হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রার এই বিপুল অঙ্কের টাকা জোগাড় করতে এনবিআর পুরোনো বকেয়া কর আদায়ের মাধ্যমে ১৪ হাজার কোটি টাকা, দীর্ঘদিনের বিচারাধীন আইনি মামলা নিষ্পত্তির মাধ্যমে ৮ হাজার ৪০০ কোটি টাকা এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি বাস্তবায়নের হার বৃদ্ধির মাধ্যমে ১৫ হাজার কোটি টাকা আহরণের উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি করের আওতা শহর থেকে বাড়িয়ে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া, উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ করদাতা প্রতিষ্ঠান চিহ্নিতকরণ এবং উৎসে কর কর্তনকারী সংস্থাগুলোর প্রধান নির্বাহীদের ডাটাবেজ হালনাগাদ করার কাজ দ্রুত কার্যকর করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে অর্থনৈতিক সক্ষমতার বাস্তব চিত্র ও এনবিআরের অতীত রেকর্ডের নিরিখে এ ধরনের দানবীয় লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও জাতীয় নীতির বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপক সংশয় রয়েছে। বিগত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের চূড়ান্ত রাজস্ব আহরণের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সে বছর সংস্থাটি ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় করতে পেরেছিল ৪ লাখ ১৫ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা, যা মূল লক্ষ্য থেকে প্রায় ৮৭ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা বা ১৭ শতাংশেরও বেশি পিছিয়ে ছিল। দেশের সামপ্রতিক অর্থনৈতিক স্থবিরতা, শিল্প উৎপাদনে মন্দা এবং বিনিয়োগের ধীরগতির কারণে চলতি অর্থবছরেও চূড়ান্ত রাজস্ব আদায়ে প্রায় সোয়া লাখ কোটি টাকার বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হতে পারে বলে দেশীয় অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর পূর্বাভাসে উঠে এসেছে। অর্থনীতিবিদদের স্পষ্ট অভিমত হলো, প্রতিবছর বাজেটে সরকারের তরফ থেকে এনবিআরকে বাস্তবতার সাথে সঙ্গতিহীন উচ্চাকাঙ্ক্ষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়, কিন্তু কর প্রশাসনের প্রয়োজনীয় অটোমেশন না থাকা এবং প্রশাসনিক দক্ষতার ঘাটতির কারণে বছর শেষে বড় ধরনের বৈষম্য থেকে যায়। সব মিলিয়ে তামাক খাতের মতো আড়ালে থাকা জটিল বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে কর ফাঁকি বন্ধ ও প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করার উদ্যোগ অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত ইতিবাচক। তবে বিশেষজ্ঞরা তাগিদ দিচ্ছেন যে, প্রযুক্তিগত নজরদারির নামে মাঠপর্যায়ের তদারকি যেন কোনোভাবেই ব্যবসা পরিচালনা ও বিনিয়োগ পরিবেশকে নতুন প্রশাসনিক হয়রানির মুখে না ফেলে। একই সাথে তামাক কোম্পানিগুলো যাতে পুরোনো সিগারেট নতুন দামে বিক্রি বা মূল কারসাজির মাধ্যমে সরকারের কর ফাঁকি দিতে না পারে, সে জন্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ডিজিটাল অডিট জোরদার করতে হবে। রাজস্ব আহরণের প্রস্তাবিত এই সংস্কার ও প্রযুক্তিনির্ভর কর্মপরিকল্পনা যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা কেবল চলতি বাজেটের ঘাটতি কমাবে না, বরং বাংলাদেশের রাজস্ব ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি পেশাদারিত্ব ও স্বচ্ছতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।