জুলাই গনঅভ্যূত্থান ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জাতীয় রাজনীতির পাশাপাশি সিলেটের স্থানীয় রাজনীতিতেও শুরু হয়েছে নতুন সমীকরণ। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গণতান্ত্রিক সরকার দায়িত্ব গ্রহণ এবং নির্বাচন কমিশনের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ঘোষণা-দুইয়ে মিলে সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীদের তৎপরতা বেড়েছে কয়েক গুণ।
নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার আগেই মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন পেতে নিজেদের অবস্থান জানান দিতে মাঠে নেমেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। এরই মধ্যে মেয়র পদে একক প্রার্থী ঘোষণা করে প্রচার-প্রচারণা শুরু করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। অন্যদিকে বিএনপিতেও একাধিক হেভিওয়েট নেতার নাম সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় থাকলেও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি। তবে সাংগঠনিক অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বিএনপির কয়েকজন নেতাকে ইতোমধ্যে বিভিন্ন সাংবিধানিক ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব দেওয়ায় সিটি নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন হিসাব-নিকাশ। মাঠে রয়েছেন এনসিপির প্রার্থীসহ স্বতন্ত্র প্রাথীরাও।
সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সরকারি দল বিএনপির প্রায় ডজনখানেক নেতা সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। বিপরীতে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ইতোমধ্যে একক প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে।
সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে একক প্রার্থী হিসেবে ড. নুরুল ইসলাম বাবুলের নাম ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। তিনি সিলেট মহানগর জামায়াতের নায়েবে আমির। দলীয়ভাবে প্রার্থিতা ঘোষণার পর থেকেই তিনি গণসংযোগসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা শুরু করেছেন।
এদিকে মেয়র প্রার্থী হিসেবে সিলেট মহানগর জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট মো. আব্দুর রহমান আফজালের নামও আলোচনায় রয়েছে।
সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে দলের একাধিক নেতার নাম আলোচনায় রয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন, কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকী, জেলা বিএনপির প্রথম যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইশতিয়াক আহমেদ সিদ্দিকী, সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, মহানগর বিএনপির সভাপতি নাছিম হোসেইন, মহানগর বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, সাধারণ সম্পাদক এমদাদ হোসেন চৌধুরী, মহিলাদলের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ও সিলেট জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি সামিয়া বেগম চৌধুরী এবং সিলেট জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন দিনার (হাজী দিনার) সহ কয়েকজন নেতার নামও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছে। তবে এখনো দলীয়ভাবে চূড়ান্ত প্রার্থী ঘোষণা করা হয়নি।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বিগত সময়ে সাংগঠনিক কার্যক্রমে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বিএনপি সরকার দলের অন্তত পাঁচজন নেতাকে সিলেটে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব দিয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) প্রশাসকের দায়িত্বে রয়েছেন আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী। সিলেট জেলা পরিষদের প্রশাসক পদে রয়েছেন আবুল কাহের চৌধুরী শামীম। সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন রেজাউল হাসান কয়েস লোদী। সিলেট ওয়াসার চেয়ারম্যান পদে রয়েছেন মিফতাহ সিদ্দিকী এবং জালালাবাদ গ্যাসের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বদরুজ্জামান সেলিম। মনোনয়ন বা দলীয় প্রার্থী বিবেচনায় এটি একটি নতুন সমীকরণ বলে মনে করেন মূল্যায়ন বঞ্চিত নেতারা।
ফলে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে দলীয় সাংগঠনিক অবস্থান, অতীতের ভূমিকা এবং বর্তমানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পাওয়া নেতাদের বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। সব মিলিয়ে সিলেট সিটি নির্বাচন সামনে রেখে আওয়ামী লীগবিহীন নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের ঘিরে নগর রাজনীতিতে শুরু হয়েছে নতুন মেরুকরণ।
সিলেট মহানগর জামায়াতের নায়েবে আমীর ড. নুরুল ইসলাম বাবুল বলেন, দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর এ টি এম আজহারুল ইসলাম এমপি আমার নাম ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের আমার পক্ষে নির্বাচনি কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। এরপর থেকেই দলীয় নেতাকর্মীরা আমার পক্ষে সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন।
তিনি বলেন, দেশ-বিদেশে অবস্থানরত আমার শুভাকাঙ্ক্ষীরাও ক্ষুদে বার্তার মাধ্যমে আমার পাশে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করছেন। স্বল্প সময়ের মধ্যেই নগরবাসীর কাছ থেকে আমি যে ভালোবাসা ও সাড়া পাচ্ছি, তা আমাকে আরও দায়িত্বশীল করে তুলছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে যে উৎসাহ-উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করছি, তা আমাকে আশাবাদী করে তুলেছে।
ড. নুরুল ইসলাম বাবুল বলেন, তরুণরাই আগামী দিনের বাংলাদেশ। তাই তাদের স্বপ্ন, চিন্তা, চাওয়া-পাওয়া ও প্রত্যাশাকে সামনে রেখেই আমি আমার পরিকল্পনা ও স্বপ্নের কথা তুলে ধরতে চাই। তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করেই একটি সুন্দর ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ নির্মাণে কাজ করতে চাই। আশা করি, নতুন প্রজন্ম তাদের ভালোবাসা, আস্থা ও সমর্থনের মাধ্যমে আমাকে মূল্যায়ন করবে।
জেলা বিএনপির প্রথম যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইশতিয়াক আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, “দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ জনগণ, বিশেষ করে আলেম-ওলামা, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, মুসলিমসহ দল-মত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ আমাকে সমর্থন করছেন। শুরু থেকেই আমি জনগণের সঙ্গে মিশে তাদের কথা শোনার চেষ্টা করেছি। জনগণের স্বপ্ন, আশা-আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশার কথা তারা আমাকে জানাচ্ছেন। আমি চেষ্টা করছি সবসময় জনগণের পাশে থাকতে। আর জনগণের ভালোবাসা ও সমর্থনই আমাকে আরও বেশি অনুপ্রাণিত করছে।”
তিনি বলেন, “দলের একজন কর্মী হিসেবে বিগত দিনগুলোতেও দলের জন্য কাজ করেছি। দলের প্রতি আমার আনুগত্য ও দায়িত্ববোধ সবসময় অটুট ছিল। আমি আশা করি, দল আমাকে নিরাশ করবে না এবং আমার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও জনসম্পৃক্ততাকে মূল্যায়ন করবে।”
নির্বাচনী অভিজ্ঞতার বিষয়ে ইশতিয়াক আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, “বর্তমান মন্ত্রী ও সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর নির্বাচনী সময়ে সমন্বয়কারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। সেই সময়ের অর্জিত অভিজ্ঞতা, দলের প্রতি আমার দীর্ঘদিনের কাজ এবং জনগণের ভালোবাসা ও সমর্থনকে কাজে লাগিয়ে আমি সামনে এগিয়ে যেতে চাই।”
তিনি আরও বলেন, “ইনশাআল্লাহ, ভবিষ্যতে জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডে সবার সহযোগিতা ও দোয়া চাই। জনগণের পাশে থেকে তাদের প্রত্যাশা পূরণে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।”
সিলেট মহানগর বিএনপির সাধারন সমম্পাদক এমদাদ হোসেন চৌধুরী বলেন, মানুষের জন্য রাজনীতি করা মানে জনসেবা করা। এজন্য জনপ্রতিনিধি হওয়াও জরুরী। বিগত দিনে দলের বিভিন্ন পদে থেকে মানুষের জন্য কাজ করেছি। দলের ক্রান্তিকালে ১/১১ এর সময়ে যখন অনেক নেতা দেশান্তরিত হয়েছে, তখনও আমি দলের জন্য নিবেদিত ছিলাম। করনা এবং বন্যা কবলিতম মানুষের পাশে দাড়িয়েছি। আমি চাদাবাজদের পাশে রাখিনা এবং প্রশ্রয় দেইনা। আমার পাশে কোনো চাদাবাজদের ঠাইনাই। তাই ইমেজ রক্ষার্থে দল যদি আমাকে সুযোগ দেয় তাহলে অবশ্যই জনসেবার জন্য কাজ করব। আমি আশাবাদি দল আমাকে মূল্যায়ন করবে।
সিলেট মহানগর জাতীয় নাগকির পার্টির (এনসিপি) আহবায়ক এডভোকেট মো. আব্দুর রহমান আফজাল বলেন, গত ২৯ মার্চ জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপি কেন্দ্রীয় আহবায়ক নাহিদ ইসলাম ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন কমিটির চেয়ারম্যান সারজিস আলম সহ দলের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র প্রার্থী হিসেবে আমার নাম ঘোষণা করেন। এরপর থেকেই আমি প্রচার-প্রচারণার কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। জনগন এনসিপির কার্যক্রমকে গ্রহণ করছে এটি প্রতিয়মান। জনগনের সহযোগিতা, সমর্থন ও ভোটের মাধ্যমে দলের পক্ষ থেকে নাগরিক সেবা করতে চাই।
কেন্দ্রীয় মহিলাদল ও সিলেট জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি সামিয়া বেগম চৌধুরী বলেন, “বিগত দিনে দলের বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে আমি সক্রিয়ভাবে পাশে ছিলাম, এখনো দলের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। বিশেষ করে মহানগর এলাকায় নারী নেত্রীদের সঙ্গে নিয়ে দলের দুঃসময়ে রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছি। পাশাপাশি নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ডে রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থেকে মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করছি। দল যদি আমাকে জনসেবার সুযোগ দেয়, তাহলে নগরবাসীর কল্যাণে নিজেকে আরও বেশি সম্পৃক্ত করতে চাই। মানুষের সুখ-দুঃখে পাশে থেকে একটি সুন্দর, নিরাপদ ও বাসযোগ্য নগর গড়ে তুলতে আন্তরিকভাবে কাজ করে যাব।”
সিটির মেয়র পদে প্রার্থী হওয়া নিয়ে সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন বলেন, বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে দলের সাথে ছিলাম এখনো আছি। দলের কর্মীরা ভালো-মন্দ বিবেচনা করেই আমাকে ভোট দিয়ে সভাপতি নির্বাচিত করেছে এবং দলীয় কর্মীদের আস্থা ও ভালোবাসায় সবসমই আমি ভোটে জিতেছি। এখন দল যদি আমাকে সুযোগ দেয় তাহলে সবার সমর্থনে জনগনের পাশে থেকে কাজ করে যেতে চাই।
এ ব্যাপারে বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকী বলেন, “আমি রাজনীতি করছি দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য। জনগণ আমাদের কাজের মূল্যায়ন করবে-এই বিশ্বাসকে সামনে রেখেই আমি কাজ করে যাচ্ছি। বিশেষ করে সিলেট সিটির ৪২টি ওয়ার্ডে ধারাবাহিকভাবে কাজ করছি এবং গণমানুষের ব্যাপক সহযোগিতা ও ভালোবাসা পাচ্ছি।
সর্বোপরি, আমি একটি রাজনৈতিক দলের কর্মী হিসেবে দলের জন্য কাজ করছি। তাই দলের সিদ্ধান্ত ও বিবেচনাই আমার কাছে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। দলের সমর্থন, জনগণের ভালোবাসা ও সহযোগিতা-সবকিছু মিলিয়ে যদি সুযোগ পাই, তাহলে সিলেট নগরবাসীর প্রত্যাশা ও ইচ্ছাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে একটি সুন্দর, আধুনিক ও জনবান্ধব নগরী হিসেবে সিলেটকে গড়ে তুলতে চাই।”