আহ্বায়ক কমিটি গঠনের প্রায় দুই বছর পেরিয়ে গেলেও সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রমে দৃশ্যমান গতি নেই। এখনো অধিকাংশ উপজেলা ও পৌরসভায় সম্মেলন হয়নি। অনেক এলাকায় শেষ হয়নি ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পর্যায়ের কমিটি গঠনের কাজ। ফলে দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ছে।
কেন্দ্রীয় বিএনপির নির্দেশনা অনুযায়ী ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে জেলা বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ের প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু এখনো জেলা সম্মেলনের আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। স্থানীয় নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, সমন্বয়ের ঘাটতি এবং সময়মতো সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা না পাওয়ায় জেলার সাংগঠনিক কার্যক্রম অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ তৃণমূল নেতাকর্মীদের।
এমন পরিস্থিতিতে আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর জেলা বিএনপির উদ্যোগে মতবিনিময় সভা ডাকা হয়েছে। সভায় অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক জি কে গৌছ এমপি ও সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক এবং সিলেট ওয়াসার চেয়ারম্যান মিফতাহ্ সিদ্দিকী। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতাদের নিয়ে এ সভায় সাংগঠনিক বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে মনে করছেন নেতাকর্মীরা। জাতীয় নির্বাচনের পর বিএনপিতে দলীয় কোন্দল ও নেতৃত্বের বিভাজন আরও বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে তৃণমূলের ইউনিট কমিটি গঠনেও। বিশেষ করে জামালগঞ্জে ওয়ার্ড কমিটি গঠন নিয়ে স্থানীয় নেতাকর্মীদের বিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে। সম্প্রতি সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল জামালগঞ্জ উপজেলায় এক সাংগঠনিক সভায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ওয়ার্ড কমিটি গঠন করতে না পারলে জেলা ও কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুযায়ী কমিটি গঠন করতে বাধ্য হবেন।
তৃণমূলের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, বিভিন্ন ওয়ার্ডে সম্মেলনের মাধ্যমে কমিটি গঠন করে উপজেলা পর্যায়ে জমা দেওয়া হলেও উপজেলা নেতাদের পছন্দের লোকজন কমিটিতে না থাকায় সেগুলো অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে না। এতে সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
জামালগঞ্জে কমিটি গঠন নিয়ে বিরোধের জেরে গত বছরের ১১ আগস্ট সদর ইউনিয়নের লক্ষ্ণীপুর বাজারের বটতলায় ৪ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির কমিটি গঠনের সভায় দুই পক্ষের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। কমিটির পদ নিয়ে আমিরুল ইসলাম ও আব্দুল মতিনের মধ্যে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে হাতাহাতি ও মারামারি হয়। এতে উভয় পক্ষের প্রায় ৫০ জন আহত হন। চলতি বছরের ১৩ জুলাই জেলা বিএনপির পক্ষ থেকে উপজেলা ও পৌর বিএনপির আহ্বায়ক এবং যুগ্ম আহ্বায়কদের কাছে পাঠানো এক নির্দেশনায় বাকি থাকা সব ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডের সম্মেলন দ্রুত সম্পন্ন করে কমিটি গঠনের তাগিদ দেওয়া হয়।
জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন এবং স্বাক্ষর ক্ষমতাপ্রাপ্ত সদস্য অ্যাডভোকেট আব্দুল হক স্বাক্ষরিত ওই নির্দেশনায় সম্মেলনের মাধ্যমে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড কমিটি গঠন এবং গঠিত কমিটির তথ্য জেলা বিএনপিকে অবহিত করার কথা বলা হয়। তবে ওই নির্দেশনার পরও সাংগঠনিক কার্যক্রমে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি বলে অভিযোগ তৃণমূল নেতাকর্মীদের।
তাদের আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে বিএনপি ক্ষমতায় থাকা পাঁচ বছরেও জেলার তৃণমূল ইউনিটগুলোর পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন শেষ হবে কি না, তা নিয়েই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
২০২৪ সালের ৪ নভেম্বর সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির পুরোনো কমিটি ভেঙে নতুন আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক করা হয় কেন্দ্রীয় বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক কলিম উদ্দিন আহমদ মিলনকে। কমিটিতে কোনো সদস্যসচিব রাখা হয়নি; অন্যরা সবাই ছিলেন সদস্য। পরে ওই বছরের ৩১ ডিসেম্বর অ্যাডভোকেট আব্দুল হককে স্বাক্ষর ক্ষমতা দিয়ে আরও পাঁচজনকে সদস্য হিসেবে যুক্ত করা হয়।
এরপর ২০২৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের ১২ উপজেলা ও চার পৌরসভাসহ মোট ১৬টি ইউনিটের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। এতে অধিকাংশ ইউনিটের আহ্বায়ক ও যুগ্ম আহ্বায়ক নির্ধারণ করা হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সাংগঠনিক কার্যক্রম এগোয়নি। বেশ কয়েকটি উপজেলায় এখনো ওয়ার্ড কমিটি গঠনই শেষ হয়নি।
তৃণমূল নেতাকর্মীদের অভিযোগ, ঘোষিত উপজেলা ও পৌর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির অনেকগুলোতেই দীর্ঘদিনের ত্যাগী ও পরিশ্রমী নেতাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি। কমিটি ঘোষণার পরপরই দিরাই উপজেলায় প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ হয়। অন্যান্য উপজেলাতেও বিভিন্ন সময় কমিটি বাতিলের দাবিতে কর্মসূচি পালন করেন নেতাকর্মীরা।
সে সময় জেলা আহ্বায়ক আশ্বাস দিয়েছিলেন, স্বল্পমেয়াদি আহ্বায়ক কমিটি পরবর্তী সময়ে পূর্ণাঙ্গ রূপ পাবে এবং ত্যাগী নেতাকর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হবে। কিন্তু তিন মাসের জন্য গঠিত আহ্বায়ক কমিটির প্রায় বিশ মাস পেরিয়ে গেলেও সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়নি বলে অভিযোগ তৃণমূলের।
দিরাই উপজেলায় ওয়ার্ড কমিটির ভোটারদের ভোটে নির্বাচনের মাধ্যমে নয়টি ইউনিয়ন এবং শাল্লা উপজেলার চারটি ইউনিয়নে সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, সহসভাপতি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদকসহ পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে এখনো কোনো ইউনিয়নের পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়নি। জাতীয় নির্বাচনের পর অনেক নির্বাচনী এলাকায় দলে বিভাজন দেখা দেওয়ায় ইউনিয়ন কমিটির নির্বাচিতদের বাদ দিয়ে পরাজিতদের নিয়ে কাজ করছেন সংসদ সদস্যরা। এ নিয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া রয়েছে ইউনিয়ন কমিটিতে। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার সকল ইউনিয়ন ও পৌর সভার সকল ওয়ার্ড কমিটি গঠন শেষ হয়েছে।
তাহিরপুর, মধ্যনগর ও ধর্মপাশা উপজেলা এবং কিছু এলাকায় ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পর্যায়ের কমিটি গঠনের কাজ এগিয়েছে। বিপরীতে ছাতক, জামালগঞ্জ, শান্তিগঞ্জ, জগন্নাথপুর, বিশ্বম্ভরপুর ও দোয়ারাবাজারসহ বেশ কয়েকটি উপজেলায় এখনো ওয়ার্ড পর্যায়ের কমিটিই পুরোপুরি গঠন করা সম্ভব হয়নি। বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক রাজু আহমেদ ইতোমধ্যে দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন। উপজেলা আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আব্দুছ ছাত্তার বলেন, “ওয়ার্ড কমিটি গঠন শুরু হয়েছে, এরপর ইউনিয়ন হবে। সময় লাগছে বটে, তবে কাজ এগোচ্ছে।”
তাহিরপুর উপজেলা বিএনপির প্রথম যুগ্ম আহ্বায়ক জুনাব আলী বলেন, “ইউনিয়ন কমিটি গঠন এগিয়ে চলছে। এর পরই আমরা উপজেলা সম্মেলনের দিকে আগাবো।”
দোয়ারাবাজার উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আলতাফুর রহমান খসরু বলেন, “আমাদের ওয়ার্ড কমিটি গঠন শেষের দিকে। তবে এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হয়নি। পরে ইউনিয়ন কমিটি গঠনে যাবো।” ছাতক উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ফরিদ আহমদ বলেন, “এখনো ওয়ার্ড কমিটি গঠন চলছে। পরে ইউনিয়নের কাজে হাত দেবো।” সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ফারুক আহমদ লিলু বলেন, “আমরা সব ইউনিয়ন কমিটি শেষ করেছি। জেলা কমিটি সিডিউল দিলেই উপজেলা কমিটি গঠন প্রক্রিয়ায় যাবো।”
সুনামগঞ্জ পৌর বিএনপির আহ্বায়ক সাইফুল্লাহ হাসান জুনেদ বলেন, “আমাদের ওয়ার্ড কমিটি গঠন শেষ। এখন জেলা কমিটির নির্দেশের অপেক্ষায় আছি। তারা সিডিউল দিলেই পৌর সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে।” দিরাই পৌর বিএনপির আহ্বায়ক মিজানুর রহমান বলেন, “আমাদের ওয়ার্ড কমিটি গঠন শেষ হয়েছে। জেলার বাকি তিন পৌরসভা সম্মেলন করলে আমরা শেষে দিরাই পৌর সম্মেলন করবো।”
জগন্নাথপুর পৌর বিএনপির প্রথম যুগ্ম সম্পাদক এমএ মতিন বলেন, “এখন আমরা ওয়ার্ড কমিটি করছি। পরে পৌর কমিটির সম্মেলন করবো।”
সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির স্বাক্ষর ক্ষমতাপ্রাপ্ত সদস্য অ্যাডভোকেট আব্দুল হক বলেন, “জাতীয় নির্বাচনের জন্য অনেক এলাকায় ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন কমিটি গঠনে বিলম্ব হয়েছে। ১৪ সেপ্টেম্বর আমাদের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির সঙ্গে মতবিনিময় করবেন। এ সময় উপজেলা আহ্বায়ক কমিটির দুজন করে উপস্থিত থাকবেন। সেখানে অনেক বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে।”
কেন্দ্রীয় বিএনপির নির্ধারিত ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বরের সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও কেন জেলা সম্মেলন হয়নি-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আমরা কিছুটা পিছিয়ে আছি। ইতোমধ্যে উপজেলা ও পৌর কমিটিকে দ্রুত ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন সম্মেলন করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আশা করছি, দ্রুতই উপজেলা ও পৌরসভা সম্মেলন শেষ করে জেলা সম্মেলনের দিকে অগ্রসর হবো।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, সমন্বয়ের অভাব এবং সময়মতো সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত না আসায় সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির সাংগঠনিক অগ্রগতি থমকে আছে। দীর্ঘদিন আহ্বায়ক কমিটি বহাল থাকায় নেতৃত্বের জটিলতা আরও বাড়ছে। তৃণমূল নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা, দ্রুত ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা ও পৌর পর্যায়ের কমিটি গঠন শেষ করে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জেলা সম্মেলনের আয়োজন করা হবে। তাদের মতে, দীর্ঘসূত্রতা কাটিয়ে সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্বের হাতে সাংগঠনিক দায়িত্ব তুলে দিতে পারলেই সুনামগঞ্জ বিএনপির মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে।