কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৯:০৪ এএম
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার

দেশের বিদ্যমান বিদ্যুৎ ঘাটতি মোকাবেলায় সরকার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। সামপ্রতিক সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা প্রকট হওয়ায় সরকার নতুন করে দুই হাজার ৬৪০ মেগাওয়াট সক্ষমতার দুটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের নিয়েছে। তিন বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি ব্যয়ে কক্সবাজারের মাতারবাড়ী এবং পটুয়াখালীর পায়রায় ওই দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। তার মধ্যে মাতারবাড়ীতে এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের কেন্দ্র নির্মাণে ব প্রায় ১.৫৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় ধরা হয়েছে। মূলত বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই সরকার কয়লার দিকে ঝুঁকছে। বিদ্যুৎ বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বর্তমানে দেশে তীব্র জ্বালানি সঙ্কট বিদ্যমান। বিশ্ব পরিস্থিতির কারণে গ্যাসের সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা, উচ্চমূল্যের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানিতে বাড়তি চাপ এবং ধারাবাহিকভাবে দেশীয় গ্যাসের মজুদ কমে আসছে। কিন্তু এলএনজির তুলনায় তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল কয়লার উৎস ও সরবরাহ। কারণ খুব বেশি ঘটেনি কয়লার সরবরাহ বন্ধ হওয়া বা দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার ঘটনা। আর কয়লার দামও মোটামুটি স্থিতিশীল। সরবরাহে ঘাটতির সম্ভাবনাও তুলনামূলক কম। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা থেকে অনেকটাই সুরক্ষা দিতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে পরিবেশগত ঝুঁকির বিষয়টিও বিবেচনা করা জরুরি।

সূত্র জানায়, দেশে বর্তমানে বিদ্যমান কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর প্রায় ৬ হাজার ৬৯০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে। এর সাথে নতুন ২ হাজার ৬৪০ মেগাওয়াটের দুটি কেন্দ্র যোগ হলে সক্ষমতা বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ৯ হাজার ৩৩০ মেগাওয়াট। দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পরিচালনায় বছরে প্রয়োজন হয় প্রায় ২ কোটি টন কয়লা। তার বড় অংশ ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি করা হয়। দুটি নতুন কেন্দ্র চালু হলে উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে কয়লার চাহিদা। সেক্ষেত্রে আমদানিনির্ভর কয়লার পাশাপাশি সরকার দেশীয় উৎস থেকেও জ্বালানি সংগ্রহের উদ্যোগ নিচ্ছে। দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে কয়লা উত্তোলনের কাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। তাছাড়া বড়পুকুরিয়ায় নতুন করে প্রায় ৩০০ একর এলাকায় কয়লা উত্তোলনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সেখানে বোরহোল করার প্রস্তুতি চলছে। তাছাড়া কয়লার মজুদ রয়েছে জয়পুরহাটের জামালগঞ্জ এবং রংপুরের খালাশপীরেও। কিন্তু সামাজিক ও অন্যান্য কারণে ওসব এলাকায় কয়লা উত্তোলনের বিষয়ে এখনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই। ফুলবাড়ীতেও কয়লা উত্তোলনের ক্ষেত্রে প্রধান বাধা সামাজিক বিষয় ও জমি অধিগ্রহণ। 

সূত্র আরো জানায়, মাতারবাড়ীতে এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র সমপ্রসারণ প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার কম্পানি লিমিটেড (বিসিপিসিএল) তৈরি করেছে। প্রকল্পে প্রায় ১.৫৬ বিলিয়ন ডলার ব্যয় ধরা হয়েছে। মূলত মধ্যপ্রাচ্যে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে গ্যাস সরবরাহে সঙ্কট এবং তেলভিত্তিক উৎপাদনে বাড়তি খরচের কারণে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকেই গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমাতে সরকার নিজস্ব কয়লা উত্তোলনের ওপরও জোর দিচ্ছে। কারণ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে দেশীয় কয়লা। ন্তিু এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে পরিবেশ, কৃষি, বসতি ও পুনর্বাসনসহ সংশ্লিষ্ট সব বিষয় নিরপেক্ষভাবে যাচাই জরুরি। 

এদিকে সরকারের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। বিশেষ করে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন দ্রুত বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যে ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। আর ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নেয়া হয়েছে। সরকারি পরিকল্পনায় বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পও রয়েছে। বর্তমানে দেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৩০ হাজার মেগাওয়াট। টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) হালনাগাদকৃত তথ্যানুযায়ী দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের মোট সক্ষমতা ১৮৫২.০৬ মেগাওয়াট। তার মধ্যে গ্রিডভিত্তিক সক্ষমতা ১৪৭৩.০৫ মেগাওয়াট এবং গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত নয় (অফ গ্রিড) এমন বিদ্যুতের সক্ষমতা ৩৭৮.৫৬ মেগাওয়াট।

অন্যদিকে এ বিষয়ে বিপিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম জানান, দেশে আরো দুটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সামপ্রতিক জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তার কারণেই বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্রিড-সংযুক্ত নির্ভরযোগ্য বিকল্প হিসেবে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকে বিবেচনা করা হচ্ছে। এর মধ্যে এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের মাতারবাড়ী সমপ্রসারণ প্রকল্পের ডিপিপি তৈরি করেছে বিসিপিসিএল। তাতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১.৫৬ বিলিয়ন ডলার। মাতারবাড়ীতে আগে থেকেই বিদ্যুৎ সঞ্চালনের অবকাঠামো থাকায় নতুন কেন্দ্র স্থাপনের জন্য স্থানটি বেছে নেয়া হয়েছে। প্রকল্পটির প্রথম ইউনিট ৩ বছরের মধ্যে এবং দ্বিতীয় ইউনিট প্রায় ৪ বছরের মধ্যে উৎপাদনে আসতে পারে। বিদেশি অর্থায়ন না পাওয়া গেলে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নেও প্রকল্পটি বাস্তবায়নের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।