শিবচরের ভাইরাল ‘চায়ের কুঠির’, চায়ের সঙ্গে মিলছে প্রকৃতির স্বাদ

এফএনএস (এস. এম. রাসেল; মাদারীপুর) : | প্রকাশ: ৬ অক্টোবর, ২০২৬, ০৫:৩৭ পিএম
শিবচরের ভাইরাল ‘চায়ের কুঠির’, চায়ের সঙ্গে মিলছে প্রকৃতির স্বাদ

চারদিকে বিস্তীর্ণ জলরাশি। পানির বুক চিরে চলে গেছে পাকা সড়ক। বর্ষায় দুই পাশে থইথই পানি, কোথাও শাপলা আর জলজ উদ্ভিদের সমারোহ। মাঝেমধ্যে পানিতে এসে নামে অতিথি পাখির দল। এমন মনোরম পরিবেশের মাঝেই কয়েকজন কলেজপড়ুয়া তরুণ গড়ে তুলেছেন ‘চায়ের কুঠির’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এই চায়ের দোকান এখন পরিণত হয়েছে মানুষের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে।

শুধু চায়ের স্বাদ নিতে নয়, প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতেও প্রতিদিন বিকেলে এখানে ভিড় করছেন নানা বয়সী মানুষ। পরিবার-পরিজন, বন্ধু কিংবা স্বজনদের সঙ্গে সময় কাটাতে দূর-দূরান্ত থেকেও ছুটে আসছেন অনেকে। চা খাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ সারি, বাড়ছে আশপাশের দোকানগুলোর ব্যস্ততাও।

শিবচর থেকে চা খেতে আসা তানভীর বলেন, ‘আমরা চা খাওয়ার পাশাপাশি এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে এসেছি।’

তিনি বলেন, ‘চায়ের দোকানটি কোনো বাজারে হলে আর এর চেয়েও মজার চা বানালেও এত লোক আসত বলে মনে হয় না। মূলত, এই স্থানটিই লোকজনকে টেনে আনছে। সঙ্গে ভাইরাল চা তো আছেই। মানুষ চায় কোলাহল পেরিয়ে দূরে প্রাকৃতিক পরিবেশে গিয়ে একটু সময় কাটাতে। সে হিসেবেই লোকজনের ছুটে আসা।’

মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার ভান্ডারীকান্দি ইউনিয়নের দক্ষিণ ক্রোকচর এলাকার বাওর ব্রিজটি মূলত দুই গ্রামের যোগাযোগের একটি পাকা সড়ক। সড়কের দুই পাশে বিস্তীর্ণ ফসলের জমি। বর্ষায় এসব জমি পানিতে তলিয়ে যায়। শীতকালে পানি নেমে গেলে সেখানে বরিশস্যসহ বিভিন্ন ফসলের চাষ হয়।

বর্ষায় পানিবেষ্টিত পুরো এলাকা অন্য রকম সৌন্দর্য ধারণ করে। স্থানীয় ভাষায় এই জলমগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকাকে বলা হয় ‘বাওর’। গ্রাম থেকে কিছুটা দূরে হওয়ায় জায়গাটি বেশ নিরিবিলি। স্থানীয় তরুণদের কাছে বাওর ব্রিজ আবার আড্ডার পরিচিত জায়গা।  প্রতিদিন বিকেলে সেখানে বসতেন স্থানীয় তরুণ সালাহউদ্দিন, দীন ইসলাম, রাহাত ও শাকিল। একসময় তাদের মনে হয়, আড্ডার জায়গাটিতেই একটি চায়ের দোকান করা যায়। ইউটিউবে নির্জন গ্রামে চায়ের দোকানের একটি ভিডিও দেখার পর নিজেদের মতো করে দোকান তৈরির উদ্যোগ নেন তারা।  ‘চায়ের কুঠির’ নাম দিয়ে নিজেরাই দোকানঘর তৈরি শুরু করেন। পাশাপাশি আরও দুটি ছোট দোকানও তৈরি করেন। দোকান তৈরির বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে থাকেন তারা। গত ৬ সেপ্টেম্বর দোকানটির উদ্বোধন করা হয়।  শুরুতে রং চা, দুধ চা, মালাই চা ও পোড়া পাউরুটি দিয়ে যাত্রা শুরু করে ‘চায়ের কুঠির’। উদ্বোধনের পর থেকেই দোকানটি নিয়ে মানুষের আগ্রহ বাড়তে থাকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর সেই আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। এখন প্রতিদিন বিকেল হলেই বাওর ব্রিজ এলাকায় মানুষের জমজমাট উপস্থিতি দেখা যায়।  চায়ের পাশাপাশি সেখানে রয়েছে চটপটি ও ফুচকার দোকান। দর্শনার্থীদের জন্য বসানো হয়েছে দোলনাও। বিকেল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে মানুষের ভিড়। চায়ের দোকানের সামনে দেখা যায় দীর্ঘ লাইন।  উদ্যোক্তা দীন ইসলাম বলেন, ‘আমরা এখানে আড্ডা দিতাম। আমরা সবাই পড়াশোনা করি। বিকেল হলেই বাড়ির পাশের ব্রিজে আড্ডা দেই। একসময় মনে হয়, এখানে একটা চায়ের দোকান দেওয়া যেতে পারে। ইউটিউবে এরকম স্থানে চায়ের দোকানের একটি ভিডিও দেখি। অন্য বন্ধুদের সঙ্গে আলাপ করে কাজে নেমে পড়ি। নিজেরাই দোকান তৈরি করি।’  তিনি বলেন, ‘৫০ হাজার টাকা মূলধন নিয়ে যাত্রা শুরু করি। দোকানের বয়স মাত্র ১ মাস। প্রতিদিন বিকেল থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকে। প্রচুর বিক্রি হয়। মাসে এক থেকে দেড় লাখ টাকার চা বিক্রি করছি।’  উদ্যোক্তাদের আরেকজন মো. সালাহউদ্দিন হাওলাদার বলেন, ‘আমরা চিন্তা করতে পারিনি আমাদের এত বিক্রি হবে। প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকার চা-রুটি বিক্রি করি। ৩০ থেকে ৩৫ কেজি দুধের চা বিক্রি হয়। এখানে পাঁচটি দোকান রয়েছে এখন। আমরা দুটি দোকান দিয়ে শুরু করি।’  শরীয়তপুর থেকে আসা সৌদি প্রবাসী মো. সবুজ বলেন, ‘টিকটকের মাধ্যমে এই চায়ের দোকানের খোঁজ পাই। বাড়িতে আসার পর এখানে আসলাম। আসলে চায়ের স্বাদ খুবই ভালো। সবচেয়ে ভালো লাগে প্রাকৃতিক পরিবেশ। সব মিলিয়ে প্রত্যন্ত গ্রামের মধ্যে এই প্রাকৃতিক পরিবেশে সময় কাটানো এবং চা পান বেশ ভালো লাগছে।’  সোনিয়া আক্তার নামে এক তরুণী বলেন, ‘চায়ের দোকানটি এখন ভাইরাল হয়ে গেছে। চা খেতে এসে অনেকেই ভিডিও করছে, ছবি তুলছে। এদের মালাই চা আর পোড়া রুটির স্বাদ ঠোঁটে লেগে থাকে।’  আরেক তরুণী ইশরাত জাহান বলেন, ‘আধা ঘণ্টা ধরে চায়ের জন্য অপেক্ষা করছি। প্রচুর ভিড়। লম্বা সিরিয়াল থাকে দোকানে।’  দীন ইসলাম বলেন, ‘আমরা সবাই এখনো লেখাপড়া করছি। বিকেলে অবসর সময়ে আমরা চায়ের দোকান করি। বেকার থাকার চেয়ে ভালো আইডিয়া নিয়ে শুরু করলে সফল হওয়া সম্ভব।’  তিনি বলেন, ‘আশপাশের পানি শুকিয়ে গেলে এখানকার জমিতে সূর্যমুখী চাষ করব। জমি লিজ নিয়েছি। আমাদের গ্রামের নাম এখন মানুষের মুখে মুখে। সারা বছরই যাতে দর্শনার্থীরা এখানে আসেন, সেই পরিকল্পনা রয়েছে।’  বর্ষায় জলমগ্ন বাওর, মাঝখান দিয়ে চলে যাওয়া সড়ক আর তার পাশে তরুণদের ছোট্ট উদ্যোগ-সব মিলিয়ে দক্ষিণ ক্রোকচরের এই ‘চায়ের কুঠির’ এখন শুধু চায়ের দোকান নয়, হয়ে উঠেছে গ্রামীণ সৌন্দর্য উপভোগের এক নতুন ঠিকানা।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে