রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচ বেড়েছে, বাড়তে পারে হুন্ডির ঝুঁকি

নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশ: ৭ অক্টোবর, ২০২৬, ০৫:৫৬ পিএম
রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচ বেড়েছে, বাড়তে পারে হুন্ডির ঝুঁকি
ছবি: সংগ্রহীত

বিদেশ থেকে ব্যাংকিং চ্যানেলে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচ বেড়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে যেখানে গড়ে খরচ ছিল ১ দশমিক ৭৮ শতাংশ, এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৮২ শতাংশে। তিন মাসের ব্যবধানে রেমিট্যান্স পাঠানোর গড় খরচ বেড়েছে দশমিক ০৪ শতাংশ পয়েন্ট। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিদেশি ব্যাংক ও এক্সচেঞ্জ হাউজগুলোর সেবার খরচ বৃদ্ধি, রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের ফি ও কর এবং বিভিন্ন দেশের মুদ্রার বিপরীতে ডলারের বিনিময় হারের ওঠানামার কারণে এ ব্যয় বাড়ছে। ফলে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের একটি অংশ আগের তুলনায় বেশি খরচ হিসেবে চলে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে ১ হাজার ডলার রেমিট্যান্স পাঠাতে গড়ে খরচ হতো ১৭ দশমিক ৮০ ডলার। এপ্রিল-জুনে সেই খরচ বেড়ে হয়েছে ১৮ দশমিক ২০ ডলার। অর্থাৎ তিন মাসের ব্যবধানে ১ হাজার ডলার পাঠাতে অতিরিক্ত খরচ হয়েছে ৪০ সেন্ট।

অঙ্কভেদেও রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচে পার্থক্য রয়েছে। ২০০ ডলার পর্যন্ত রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে জানুয়ারি-মার্চে গড় খরচ ছিল ২ দশমিক ৮৩ শতাংশ। এপ্রিল-জুনে তা বেড়ে হয়েছে ২ দশমিক ৯৪ শতাংশ। ২০০ থেকে ৫০০ ডলার পাঠানোর ক্ষেত্রে খরচ অবশ্য কিছুটা কমেছে। এই অঙ্কে খরচ ০ দশমিক ৯৬ শতাংশ থেকে কমে ০ দশমিক ৯৪ শতাংশ হয়েছে। আর ৫০০ ডলারের বেশি পাঠানোর ক্ষেত্রে খরচ ০ দশমিক ৪৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ০ দশমিক ৫০ শতাংশে উঠেছে।

অর্থাৎ তুলনামূলক ছোট অঙ্কের রেমিট্যান্স পাঠাতে খরচ বেশি হচ্ছে। বড় অঙ্কের ক্ষেত্রে শতাংশের হিসাবে ব্যয় কম থাকলেও ৫০০ ডলারের বেশি পাঠানোর খরচও সামান্য বেড়েছে।

দেশভেদে রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচের চিত্রও এক নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে ২০০ ডলার পর্যন্ত রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে দেখা যায়, সৌদি আরব, কুয়েত, যুক্তরাষ্ট্র ও সিঙ্গাপুর থেকে খরচ কমেছে। বিপরীতে সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, কাতার, ইতালি, ওমান ও যুক্তরাজ্য থেকে এ খরচ বেড়েছে।

সৌদি আরব থেকে সব ধরনের রেমিট্যান্সের গড় খরচ জানুয়ারি-মার্চে ছিল ২ দশমিক ৫২ শতাংশ। এপ্রিল-জুনে তা কমে ২ দশমিক ২৭ শতাংশ হয়েছে। ২০০ ডলার পর্যন্ত পাঠানোর ক্ষেত্রেও সৌদি আরব থেকে খরচ ৪ দশমিক ১২ শতাংশ থেকে কমে ৩ দশমিক ৫৩ শতাংশে নেমেছে।

অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে সব অঙ্ক মিলিয়ে রেমিট্যান্স পাঠানোর গড় খরচ ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২ দশমিক ৯২ শতাংশ হয়েছে। ২০০ ডলার পর্যন্ত পাঠানোর ক্ষেত্রে এ খরচ ৫ দশমিক ৫৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬ দশমিক ৪৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

মালয়েশিয়া থেকে সামগ্রিক খরচ ১ দশমিক ০৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ১ দশমিক ১২ শতাংশ হয়েছে। ২০০ ডলার পর্যন্ত পাঠানোর ক্ষেত্রে তা ৩ দশমিক ১৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩ দশমিক ১৯ শতাংশে উঠেছে।

কাতার থেকে রেমিট্যান্স পাঠানোর সামগ্রিক খরচ ১ দশমিক ২২ শতাংশ থেকে বেড়ে ১ দশমিক ২৮ শতাংশ হয়েছে। ২০০ ডলার পর্যন্ত পাঠালে খরচ ৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫ দশমিক ১১ শতাংশ হয়েছে।

ইতালি থেকে সামগ্রিক খরচ ১ দশমিক ১৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ১ দশমিক ২৭ শতাংশে উঠেছে। ২০০ ডলার পর্যন্ত পাঠানোর ক্ষেত্রে খরচ ১ দশমিক ৩৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ১ দশমিক ৫৭ শতাংশ হয়েছে।

ওমান থেকে রেমিট্যান্স পাঠানোর গড় খরচ ১ দশমিক ৩৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ১ দশমিক ৪০ শতাংশ হয়েছে। ২০০ ডলার পর্যন্ত পাঠালে খরচ ৬ দশমিক ০৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ হয়েছে।

যুক্তরাজ্য থেকে সামগ্রিক রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচ ১ দশমিক ১৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ১ দশমিক ৪৬ শতাংশ হয়েছে। ২০০ ডলার পর্যন্ত পাঠানোর ক্ষেত্রে তা ১ দশমিক ৪৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ২ দশমিক ১০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

অন্যদিকে কুয়েত থেকে সামগ্রিক রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচ ১ দশমিক ৬১ শতাংশ থেকে কমে ১ দশমিক ৫১ শতাংশ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১ দশমিক ৩৩ শতাংশ থেকে কমে ১ দশমিক ১১ শতাংশ এবং সিঙ্গাপুর থেকে ১ দশমিক ৩১ শতাংশ থেকে কমে দশমিক ৯৮ শতাংশ হয়েছে। সিঙ্গাপুরে কমার হার ছিল তুলনামূলকভাবে বেশি।

২০০ ডলার পর্যন্ত রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রেও কুয়েত, যুক্তরাষ্ট্র ও সিঙ্গাপুরে খরচ কমেছে। কুয়েতে ৪ দশমিক ০৪ শতাংশ থেকে ৩ দশমিক ৯১ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্রে ২ দশমিক ০৮ শতাংশ থেকে ১ দশমিক ৪৪ শতাংশ এবং সিঙ্গাপুরে ২ দশমিক ৫১ শতাংশ থেকে ১ দশমিক ৭৬ শতাংশে নেমেছে।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচ বাড়লে প্রবাসীদের একটি অংশ হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাঠাতে উৎসাহিত হতে পারেন। এতে বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রবাহ ধরে রাখার ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ কারণে খরচ বাড়ার বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আগেই সতর্ক হতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রয়োজনে বিদেশে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও এক্সচেঞ্জ হাউজগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে বিদেশে প্রবাসীদের ব্যাংকিং সুবিধা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। বর্তমানে অনেক দেশে প্রবাসীদের জন্য ব্যাংকিং সুবিধা সীমিত থাকায় রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত খরচ তৈরি হচ্ছে।

বিদেশে দেশীয় ব্যাংক বা এক্সচেঞ্জ হাউজের কার্যক্রম বাড়ানো গেলে এ খরচ কমানো সম্ভব হতে পারে বলেও মত দিয়েছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা। এতে প্রবাসীরা বৈধ চ্যানেলে তুলনামূলক কম খরচে অর্থ পাঠানোর সুযোগ পাবেন।

এদিকে দেশের ভেতরে ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রবাসীদের স্বজনদের কাছে রেমিট্যান্সের অর্থ পৌঁছানোর খরচ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। এর ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচ কিছুটা কমেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের সামগ্রিক চিত্রে দেখা যাচ্ছে, বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স দেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে গড় ব্যয় সামান্য হলেও বেড়েছে। তবে দেশ ও রেমিট্যান্সের অঙ্কভেদে ব্যয়ের পরিবর্তন একরকম নয়। কোথাও খরচ বেড়েছে, কোথাও কমেছে। 

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে