সেপ্টেম্বরে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি সামান্য বেড়ে ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশে উঠেছে। আগস্টে এই হার ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। একই সময়ে জাতীয় পর্যায়ে সাধারণ মজুরি বৃদ্ধির হার কমে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৯০ শতাংশে, যা আগস্টে ছিল ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ। ফলে পণ্যের দাম বাড়ার সঙ্গে আয়ের বৃদ্ধির ব্যবধান আরও স্পষ্ট হয়েছে, যা নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষের ওপর ব্যয়ের চাপ বাড়িয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) বুধবার (৭ অক্টোবর) প্রকাশিত সেপ্টেম্বরের মূল্যস্ফীতি ও মজুরি হার সূচকের হালনাগাদ তথ্যে এসব চিত্র পাওয়া গেছে। এর আগে টানা তিন মাস মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে থাকার পর জুলাই ও আগস্টে তা কমেছিল। সেপ্টেম্বরে আবার মূল্যস্ফীতি কিছুটা বেড়েছে।
সেপ্টেম্বরে খাদ্য খাতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৭ দশমিক ২২ শতাংশ। আগস্টে এই হার ছিল ৭ দশমিক ০২ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়েছে শূন্য দশমিক ২০ শতাংশীয় পয়েন্ট। এতে মাছ, মাংস, তেল, ডাল, লবণ ও সবজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে ভোক্তাদের ব্যয় বেড়েছে।
অন্যদিকে খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি সামান্য কমেছে। সেপ্টেম্বরে এ খাতে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ, আগস্টে যা ছিল ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ। তবে গত বছরের সেপ্টেম্বরে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৯৮ শতাংশ।
গ্রাম ও শহরের হিসাবেও কিছু পার্থক্য রয়েছে। সেপ্টেম্বরে গ্রামীণ এলাকায় সাধারণ মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ, যা আগস্টে ছিল ৮ দশমিক ৩১ শতাংশ। গ্রামে খাদ্য মূল্যস্ফীতি আগস্টের ৭ দশমিক ০১ শতাংশ থেকে বেড়ে সেপ্টেম্বরে হয়েছে ৭ দশমিক ১৮ শতাংশ। তবে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি সামান্য কমে ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ হয়েছে, আগস্টে যা ছিল ৯ দশমিক ৫৯ শতাংশ।
শহর এলাকায় সেপ্টেম্বরে সাধারণ মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। আগস্টে এই হার ছিল ৮ দশমিক ২০ শতাংশ। শহরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ০৪ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ। বিপরীতে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৯৭ শতাংশ থেকে কমে ৮ দশমিক ৯৪ শতাংশে নেমেছে।
মূল্যস্ফীতি বাড়ার বিপরীতে সেপ্টেম্বর মাসে মজুরি বৃদ্ধির হার কমেছে। বিবিএসের মজুরি হার সূচক অনুযায়ী, জাতীয় পর্যায়ে সাধারণ মজুরি বৃদ্ধির হার আগস্টের ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ থেকে কমে সেপ্টেম্বরে হয়েছে ৭ দশমিক ৯০ শতাংশ। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির হার ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ হলেও মজুরি বৃদ্ধির হার তার নিচে রয়েছে।
খাতভিত্তিক হিসাবেও মজুরি বৃদ্ধির হার কমেছে। সেপ্টেম্বরে কৃষি খাতে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ, আগস্টে যা ছিল ৮ দশমিক ০৭ শতাংশ। শিল্প খাতে এই হার ৭ দশমিক ৯৭ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ। একই সময়ে সেবা খাতে মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ২৫ শতাংশ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ০৭ শতাংশে।
মূল্যস্ফীতি ও মজুরি বৃদ্ধির এই ব্যবধান মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি করছে। আয় যে হারে বাড়ছে, পণ্য ও সেবার দাম তার চেয়ে বেশি বাড়লে একই আয়ে আগের তুলনায় কম পণ্য কেনা সম্ভব হয়। বিশেষ করে সীমিত ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে খাদ্য, যাতায়াত ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয় সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে।
সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতি বাড়ার পেছনে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাবও রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন। ২১ সেপ্টেম্বর অকটেন, পেট্রল ও ডিজেলের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়। এর ফলে পণ্য পরিবহনের ব্যয় বেড়েছে। পরিবহন ব্যয়ের এই চাপ শাকসবজি, মাছ ও মাংসসহ বিভিন্ন পণ্যের বাজারদরেও প্রভাব ফেলেছে।
মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির ফলে সীমিত ও মধ্য আয়ের মানুষের সংসার পরিচালনায় চাপ বাড়ে। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আয় না বাড়লে প্রকৃত আয় কমে যায়। তখন অনেক পরিবারকে ধারদেনা করতে হয় অথবা খাবার, পোশাক, যাতায়াতসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় কমিয়ে আনতে হয়।
সেপ্টেম্বরের পরিসংখ্যান তাই একদিকে পণ্যের দাম বৃদ্ধির চাপ, অন্যদিকে মজুরি বৃদ্ধির গতি কমে যাওয়ার চিত্র তুলে ধরছে। জাতীয় পর্যায়ে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশের বিপরীতে সাধারণ মজুরি বৃদ্ধির হার ৭ দশমিক ৯০ শতাংশ হওয়ায় জীবনযাত্রার ব্যয় সামলানো নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষের জন্য আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।