মুক্ত জলাশয়ে সূক্ষ্ণ ফাঁসের নিষিদ্ধ জাল ও বাঁশের ঘের দিয়ে অবাধে ধরা হচ্ছে সব ধরনের মাছ। এতে অকালে ধ্বংস হচ্ছে প্রজননক্ষম মা মাছ ও রেনু পোনা। স্থানীয় নদী, খাল ও বিলে অনিয়ন্ত্রিতভাবে ক্ষতিকর নিষিদ্ধ জাল ও ইলেকট্রিক শক মেশিন ব্যবহারের কারণে দেশীয় প্রজাতির অনেক মাছ এখন বিলুপ্তির পথে। ফলে চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে প্রাকৃতিক জলজ জীববৈচিত্র ও দেশের দীর্ঘমেয়াদি মৎস্যসম্পদ।
বিশেষ করে ছোট মাছের মধ্যে টেংরা, পুঁটি, মলা, ঢেলা, কাচকি, চান্দা, খলসে, ফলি, পাবদা, চাপিলা, বেলে, শিং, মাগুর, কই, গুতুম, ভেদা (মেনি), বাতাসী, কাজলী, তারা বাইম, পাঁকাল বাইম ও ঘনিয়া এবং মাঝারি ও বড় মাছের মধ্যে ঘারুয়া (ঘাউড়া), আইড়, শোল, গজার, বোয়াল, চিতল, কাতলা, রুই, মৃগেল ও কালবাউশসহ নানা সুস্বাদু মাছ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়েছে।
দেশে গ্রীষ্ম ও বর্ষাকাল (মে থেকে সেপ্টেম্বর) দেশীয় মাছের প্রধান প্রজনন মৌসুম। বিশেষ করে জুন ও জুলাই মাসে নদী-নালা ও খাল-বিলে নতুন পানি এলে মা মাছ ডিম ছাড়ে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এ সময়েই অবৈধ উপায়ে সবচেয়ে বেশি মাছ শিকার করা হয়। আবার পানি নামার সময়েও সাধারণত আশ্বিন থেকে অগ্রহায়ণ/পৈৗষ মাস (সেপ্টেম্বর থেকে জানুয়ারি) খাল-বিলে ক্ষতিকর জাল ও বাঁশের ঘের দিয়ে দেশীয় প্রজাতির সব মাছ নির্বিচারে নিধন করা হচ্ছে।
স্থানীয় জলাশয়গুলো ঘুরে দেখা যায়, একশ্রেণির অসাধু জেলে ও স্থানীয় ব্যক্তিরা নদী-নালা, খাল-বিলের বিভিন্ন পয়েন্টে বাঁশের বানা ও ঘের তৈরি করেছেন। সেখানে ব্যবহার করা হচ্ছে সূক্ষ্ণ ফাঁসের কারেন্ট জাল, চায়না দুয়ারি বা রিং জাল ও ভৈরব জালের মতো ক্ষতিকর উপকরণ। এতে ছোট-বড় কোনো মাছই রেহাই পাচ্ছে না। ফলে যে মৌসুমে মাছের বংশবৃদ্ধি করার কথা, সে সময়ই মা মাছ ধরা পড়ে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে দ্বাড়ীগাঁও গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দা মো. মিজানুর রহমান উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, অবৈধ রিং জাল, ভৈরব জাল, ইলেকট্রিক শক দিয়ে ছোট-বড় সব মাছ নির্বিচারে শিকার করার কারণে মিঠা পানির এসব সুস্বাদু মাছ এখন আর আগের মতো মেলে না। বর্ষায় ডিম ছাড়ার সময় এবং পরে খাল-বিল থেকে পানি নামার সময়; দুই মৌসুমেই পোনা ও মা মাছ নির্বিচারে শিকার করছে। বাছবিচার ছাড়া এভাবে রেনু পোনা ধ্বংস করায় দেশীয় মাছ আর বংশবৃদ্ধি করতে পারছে না। আমাদের ঐতিহ্যবাহী মিঠা পানির মাছ রক্ষা করতে হলে অবিলম্বে ক্ষতিকর জালের ব্যবহার বন্ধ ও ডিম ছাড়ার সময় মাছ শিকারে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে।
এ বিষয়ে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা নাজমা আক্তার জানান, মুক্ত জলাশয়ে নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। আমরা ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালনা করছি এবং অবৈধ জাল জব্দ করে ধ্বংস করা হচ্ছে। দেশীয় মাছ রক্ষায় মৎস্য আইন বাস্তবায়নে কোনো ধরনের ছাড় দেয়া হবে না। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে আইনি ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, মুক্ত জলাশয়ে নিষিদ্ধ জাল ও বৈদ্যুতিক শক দিয়ে মা মাছ ও পোনাসহ যেকোনো ধরনের মাছ নিধন করা মারাত্মক অপরাধ, যা আমাদের দেশীয় মাছের জাত ধ্বংস করছে। আমরা উপজেলা প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগের যৌথ উদ্যোগে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছি এবং জব্দকৃত অবৈধ জাল জনসমক্ষে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হচ্ছে। পাশাপাশি এর কেনাবেচা বন্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা বন্ধ রাখতে কঠোর মনিটরিং নিশ্চিতের প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে। মৎস্য কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করে মাছের অভয়াশ্রম তৈরির ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।