কোনো জাতির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় গড়ে ওঠে তার ইতিহাস, সাহিত্য, শিল্পকলা ও মনীষীদের অবদানের ওপর। সেই কারণে মতভেদ থাকতেই পারে, ইতিহাস নিয়ে বিতর্কও হতে পারে; কিন্তু কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রতি আপত্তি প্রকাশের ভাষা কখনোই ভাঙচুর, অপমান বা প্রতীকী আক্রমণ হতে পারে না। রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমির সামনে আঁকা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতিতে কালি লেপে দেওয়ার ঘটনা তাই শুধু একটি দেয়ালচিত্র নষ্ট করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি আমাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সহনশীলতার প্রশ্নকেও সামনে নিয়ে এসেছে। ঘটনার পর অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন দাবি ও ব্যাখ্যা সামনে এসেছে। কেউ বলেছেন, এটি রাজনৈতিক প্রতিবাদের অংশ; কেউ আবার ঐতিহাসিক অভিযোগের কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে যাচাইহীন তথ্য, বিকৃত ইতিহাস এবং আবেগনির্ভর প্রচারণা অনেক সময় বাস্তব সত্যকে আড়াল করে দিচ্ছে। কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে আপত্তি থাকলে তা নিয়ে গবেষণা, আলোচনা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্কের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু কালি লেপে বা প্রতিকৃতি নষ্ট করে ইতিহাসের সঙ্গে বিতর্ক করা যায় না; বরং এতে অসহিষ্ণুতার সংস্কৃতিই উৎসাহিত হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেবল একজন কবির নাম নয়, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসে তিনি একটি অনিবার্য অধ্যায়। তাঁকে নিয়ে সমালোচনা হতে পারে, তাঁর চিন্তা বা অবস্থান নিয়ে গবেষণা হতে পারে, কিন্তু তাঁর অবদানকে অস্বীকার করার প্রয়াস কোনো সুস্থ বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার পরিচয় বহন করে না। একইভাবে অন্য যেকোনো মনীষী, লেখক বা শিল্পীর ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। সভ্য সমাজে যুক্তির মোকাবিলা যুক্তি দিয়ে করতে হয়, রঙ বা কালি দিয়ে নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জনপরিসরে স্থাপিত সাংস্কৃতিক প্রতীকগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। নগরজীবনের নানা স্থানে যে দেয়ালচিত্র, ভাস্কর্য ও শিল্পকর্ম তৈরি করা হয়েছে, সেগুলো কেবল সৌন্দর্যবর্ধনের উপাদান নয়; এগুলো আমাদের সম্মিলিত স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক চেতনাকে ধারণ করে। এসব স্থাপনায় আক্রমণ বারবার ঘটতে থাকলে তা সমাজে বিভাজন ও উসকানির পরিবেশ তৈরি করবে। এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। আইনের শাসনের স্বার্থে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে এর পাশাপাশি আরও জরুরি হলো ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কে তথ্যভিত্তিক শিক্ষা, সহনশীলতা এবং গণতান্ত্রিক বিতর্কের চর্চা জোরদার করা। কারণ সংস্কৃতির পরিসর যত সংকুচিত হবে, সমাজে তত বাড়বে বিদ্বেষ ও বিভাজন। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করতে হলে ভিন্নমতের প্রতি সম্মান দেখানোর সংস্কৃতিও সমানভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সেটিই একটি আত্মবিশ্বাসী, পরিণত এবং সভ্য সমাজের পরিচয়।