দেশের আবাসন খাত বর্তমানে যে সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা তাই কেবল ডেভেলপারদের সমস্যা নয়; বরং বৃহত্তর অর্থনীতির জন্যও একটি উদ্বেগজনক বার্তা। সামপ্রতিক সময়ে ফ্ল্যাট বিক্রির হার ধারাবাহিকভাবে কমছে। নতুন প্রকল্প গ্রহণে আগ্রহ হারাচ্ছেন অনেক উদ্যোক্তা, কোথাও কোথাও নির্মাণকাজ স্থগিত রয়েছে, আবার জমির মালিক ও ডেভেলপারদের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তিও বাতিল হচ্ছে। এটি স্পষ্ট করে যে আবাসন বাজারে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। ক্রেতারা যেমন বিনিয়োগে সতর্ক হয়ে উঠেছেন, তেমনি উদ্যোক্তারাও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। এই পরিস্থিতির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি গত কয়েক বছরে প্রকল্প ব্যয়কে অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা, জ্বালানি ব্যয়ের বৃদ্ধি এবং আমদানি নির্ভরতার কারণে রড, সিমেন্টসহ বিভিন্ন উপকরণের দাম বেড়েছে। একই সঙ্গে গৃহঋণের উচ্চ সুদের হার মধ্যবিত্তের জন্য ফ্ল্যাট কেনা কঠিন করে তুলেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কর ও নিবন্ধন ব্যয়ের চাপ, যা আবাসন ক্রয়কে আরও ব্যয়বহুল করে তুলছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, আবাসন খাতের সংকট এখন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপরও প্রভাব ফেলছে। নতুন প্রকল্প কমে গেলে নির্মাণশ্রমিক থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট শিল্পগুলোর উৎপাদনও কমে যায়। এর ফলে অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসংস্থানমুখী খাত দুর্বল হয়ে পড়ে। দীর্ঘমেয়াদে এটি সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে সংকটের মধ্যেও সম্ভাবনা রয়েছে। জনসংখ্যার ঘনত্ব, নগরায়ণের গতি এবং বাড়তি আবাসনের চাহিদা বিবেচনায় বাংলাদেশের আবাসন খাতের ভবিষ্যৎ এখনও উজ্জ্বল। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে নীতিগত স্থিতিশীলতা প্রয়োজন। গৃহঋণ সহজলভ্য করা, নিবন্ধন ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা, নির্মাণসামগ্রী খাতে অযৌক্তিক ব্যয় কমানো এবং বেসরকারি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। আমরা মনে করি, আবাসন খাতকে শুধুমাত্র ব্যবসা হিসেবে না দেখে জাতীয় অর্থনীতির একটি কৌশলগত খাত হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনা, বিনিয়োগবান্ধব নীতি এবং বাস্তবভিত্তিক কর কাঠামো ছাড়া এ খাতের স্থবিরতা কাটবে না। আবাসন খাত সচল হলে শুধু ফ্ল্যাট বিক্রি বাড়বে না, অর্থনীতির বহু খাতেও নতুন গতি সঞ্চারিত হবে। তাই এখনই সময় সমন্বিত ও দূরদর্শী উদ্যোগ নেওয়ার।