পৈতৃক সম্পত্তি দখল, জাল আমমোক্তারনামা তৈরি, ভাড়ার ১ কোটি ২০ লাখ টাকা আত্মসাৎ ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সিলেট নগরের সুবিদবাজার এলাকার বাসিন্দা মুমিনুল ইসলাম চৌধুরী। তাঁর দাবি, পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে চলমান বিরোধের জের ধরে তাঁর বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ করা হয়েছে।
গত ২০ অক্টোবর কানাডাপ্রবাসী এহসানুল ইসলাম চৌধুরী ও আমেরিকাপ্রবাসী তাজিন ইসলাম চৌধুরীর সংবাদ সম্মেলনের প্রতিবাদে ২২ অক্টোবর সিলেট প্রেসক্লাবে পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করেন মুমিনুল। লিখিত বক্তব্যে তিনি নিজের অবস্থান তুলে ধরেন। এ সময় তাঁর মা বুলবুল নাহার চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।
লিখিত বক্তব্যে মুমিনুল বলেন, তাঁদের বাবা এনামুল ইসলাম চৌধুরী ২০১০ সালের ২৮ নভেম্বর ৭১/২০১০ নম্বরের একটি নিবন্ধিত দলিল সম্পাদন করেন। ওই দলিলে বাবার মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী বুলবুল নাহার চৌধুরীকে সম্পত্তি ভোগদখলের অধিকার দেওয়া হয়। ২০২১ সালের ৩ জানুয়ারি তাঁর বাবা মারা যান। পরে ২০২২ সালে এহসানুল ও তাজিনের উদ্যোগে ৩৬২৪/২০২২ নম্বরের একটি বণ্টননামা সম্পাদিত হয় বলে তিনি জানান।
মুমিনুলের ভাষ্য, ২০২৫ সালের ৪ আগস্ট তিনি সিলেট জেলা সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয় থেকে বাবার দলিলের নকল সংগ্রহ করেন। এরপর তাঁর মা বণ্টননামা বাতিল চেয়ে ৮৭/২০২৫ নম্বরের একটি স্বত্ব মামলা করেন, যা এখনো বিচারাধীন।
মামলাসংশ্লিষ্ট তিনটি দেওয়ানি রিভিশনে হাইকোর্টের আদেশের কথা উল্লেখ করে মুমিনুল বলেন, ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর সম্পত্তির দখলসংক্রান্ত স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। একই বছরের ১২ নভেম্বর বণ্টননামার কার্যকারিতা স্থগিত করা হয়। পরে ৯ ডিসেম্বর মূল স্বত্ব মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সম্পত্তি হস্তান্তরের দলিল সম্পাদন না করার বিষয়ে সিলেট জেলা রেজিস্ট্রার, সাব-রেজিস্ট্রার, সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও মামলার সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ওপর অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয় বলে তিনি দাবি করেন।
তাঁর অভিযোগ, আদালতের এসব আদেশ থাকা সত্ত্বেও এহসানুল ও তাজিন সম্পত্তি দেখাশোনার জন্য সাতজনকে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে আমমোক্তারনামা দিয়েছেন।
ভাড়ার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ অস্বীকার
ভাড়ার ১ কোটি ২০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ অস্বীকার করে মুমিনুল বলেন, বাবার মৃত্যুর পর তাঁর মা মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী এহসানুল ও তাজিনকে নিয়মিত ভাড়ার অংশ দিতেন। তাঁর দাবি, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এই অর্থ দেওয়া হয়েছে। এহসানুলের আদালতে দাখিল করা আবেদন ও ব্যাংক হিসাব যাচাই করলে বিষয়টি প্রমাণিত হবে।
মুমিনুলের ভাষ্য, সম্পত্তি দেখাশোনার দায়িত্ব বাইরের ব্যক্তিদের দেওয়ার পর তাঁর মা ভাড়ার অর্থ দেওয়া বন্ধ করেন। এ ঘটনায় এহসানুলের উদ্যোগে হাবিবুর রহমান শিবলুর মাধ্যমে তাঁর মা, তিনি নিজে, তাঁর স্ত্রী ও তাঁদের ম্যানেজারের বিরুদ্ধে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ৯৪৭/২০২৬ নম্বরের মামলা করা হয়েছে। মামলাটি বর্তমানে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তদন্তাধীন বলে জানান তিনি।
আমমোক্তারনামা নিয়ে ব্যাখ্যা
ব্র্যাক ব্যাংকে ভাড়া জমা দেওয়ার বিষয়ে কথিত জাল আমমোক্তারনামার অভিযোগের জবাবে মুমিনুল বলেন, নথিটি মূলত ব্যাংকে ভাড়া জমা দেওয়ার জন্য তৈরি একটি অনুমতিপত্র। তাঁর দাবি, ২০২১ সালে কোভিড মহামারির কারণে এহসানুল ও তাজিন দেশে আসতে না পারায় তিন ভাইবোনের স্বাক্ষরসংবলিত অনুমতিপত্র তৈরি করা হয়।
তিনি বলেন, প্রথমে তিনি ওই অনুমতিপত্রে স্বাক্ষর করে কানাডায় এহসানুলের কাছে পাঠান। পরে এহসানুল ও তাজিন তাতে স্বাক্ষর করে ডাকযোগে ফেরত পাঠান। এরপর অনুমতিপত্রটি ব্যাংকে জমা দেওয়া হয় এবং তাঁদের মায়ের হিসাবে ভাড়ার টাকা জমা হতে থাকে।
মুমিনুল আরও দাবি করেন, এহসানুল ২০২১ সালের নভেম্বরে দেশে এসে পাঁচ মাস অবস্থান করলেও তখন অনুমতিপত্রটি জাল বলে অভিযোগ করেননি। এমনকি ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর ব্যাংকে পাঠানো আইনি নোটিশেও বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি। তাঁর বক্তব্য, ভাড়ার কোনো অর্থ তাঁর ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে জমা হয়নি।
প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগও অস্বীকার
প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগকে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন মুমিনুল। তিনি বলেন, এ বিষয়ে কোতোয়ালী থানার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি মুঠোফোনের কললগ ও সময় যাচাই করে তদন্ত করার অনুরোধ জানিয়েছেন।
সংবাদ সম্মেলনে মুমিনুল তাঁর বক্তব্যের সমর্থনে আদালতের আদেশ, দলিল, আবেদন ও ব্যাংক হিসাবের নথি উপস্থাপনের কথা জানান।
তবে সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত দাবিগুলোর সত্যতা এবং সম্পত্তি নিয়ে চলমান বিরোধের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও আদালতের আদেশ যাচাই সাপেক্ষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে।