শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু অভিভাবকের দায়িত্ব নয়, এটি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। কিন্তু শিশুদের প্রতি যৌন নিপীড়নের বিভিন্ন ঘটনা সামনে আসার পরও তাদের ব্যক্তিগত সীমানা, নিরাপদ স্পর্শ ও অনিরাপদ স্পর্শ সম্পর্কে সচেতন করে তোলার বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রে উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। ছোটবেলা থেকেই শিশুদের গুড টাচ ও ব্যাড টাচ সম্পর্কে শেখানো হলে তারা কোন আচরণে সতর্ক হতে হবে এবং কোনো কিছুতে অস্বস্তি বোধ করলে কাকে জানাতে হবে, তা সম্পর্কে একটা স্পষ্ট ধারণা পাবে। সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়টি নতুন করে সামনে এনেছে। তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ২৪১ শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে এবং ১৪১ শিশু এমন নির্যাতনের চেষ্টার শিকার হয়েছে। এ সময়ে ২১ শিশুকে নির্যাতন বা নির্যাতনের চেষ্টার পর হত্যা করা হয়েছে। এই পরিসংখ্যানের আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো, ৫৯ শতাংশ ঘটনা ঘটেছে ঘরে ও পারিবারিক পরিবেশে। অপরাধীদের ১০ জনের ৯ জনই ছিল শিশুর পরিচিত। এসব তথ্য থেকে স্পষ্ট, শুধু অপরিচিত ব্যক্তির কাছ থেকে সতর্ক থাকলেই শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাচ্ছেনা। এ অবস্থায় শিশুদের গুড টাচ ও ব্যাড টাচ শেখানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুকে সহজ ভাষায় বোঝাতে হবে, তার শরীর তার নিজের এবং নিজের শরীর সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারও তার। কোন আচরণে সে নিরাপদ বোধ করে, কোন আচরণে ভয় বা অস্বস্তি তৈরি হয়, তা বোঝাতে হবে বয়স উপযোগী উদাহরণের মাধ্যমে। শরীরের ব্যক্তিগত অংশগুলো সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার পাশাপাশি কেউ অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে স্পর্শ করলে, গোপন রাখতে বললে কিংবা ভয় দেখালে কী করতে হবে, সেটিও শেখাতে হবে। তবে শুধু শিশুদের শেখালেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যাবে, তা নয়। অনেক শিশু ভয়, লজ্জা কিংবা বকুনি খাওয়ার আশঙ্কায় নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনা বলতে পারে না। আবার কোনো শিশু অভিযোগ জানালে পরিবারের সদস্যরা অনেক সময় বিষয়টি গুরুত্ব দেন না বা পরিচিত ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ শুনে তা বিশ্বাস করতে চান না। তাই অভিভাবকদের এমন মনোভাব থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে শিশুদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং কোনো ঘটনা জানালে দোষারোপ না করে পাশে দাঁড়াতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও শিশু সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। শিক্ষক ও কর্মচারীদের শিশু সুরক্ষাবিষয়ক প্রশিক্ষণ, অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাদের ওপর অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ আরোপ নয়, বরং সচেতনতা, আস্থা ও সহায়তার পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। গুড টাচ ও ব্যাড টাচ সম্পর্কে শিক্ষা কোনো এক দিনের আলোচনা নয়; এটি শিশুর বেড়ে ওঠার সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। ছোটবেলা থেকেই সচেতনতা গড়ে তোলা ও শিশুদের কথা গুরুত্বের সাথে নেয়ার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা গেলে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা প্রতিরোধে করা সম্ভব হবে।