বরিশালের উজিরপুর উপজেলার সার্বজনীন কেন্দ্রীয় কীর্তন আঙিনা ও শ্রীগুরু মন্দির সংলগ্ন এলাকার একটি হিন্দু পরিবারের বাড়ি ও মন্দির সংশ্লিষ্ট সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের জেরে দীর্ঘদিন থেকে জটিলতা চলছে। তবে ওই সম্পত্তি নিয়ে হাইকোর্টে সিভিল রিভিশন এবং সহকারী জজ আদালতে মামলা চলমান থাকায় দখলদার উচ্ছেদে অসহায় হয়ে পরেছেন উপজেলা প্রশাসন ও থানা পুলিশ।
স্থানীয় বাসিন্দা বরুণ মিত্র জানিয়েছেন, ২০১৯ সালে তিনি চার শতক জমি ক্রয় করে দ্বিতল ভবন নির্মাণ করেন। ভবনের একাংশ ভাড়া দিয়ে অপর অংশ মন্দিরের ব্যবহারের জন্য দান করেছেন। প্রতি বছরের বার্ষিক কীর্তন উপলক্ষে মন্দির কর্তৃপক্ষ ভবনের ওই অংশ ব্যবহার করে আসছে। বরুণ মিত্রের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট উজিরপুরে পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহবায়ক নুরুজ্জামান খান তার লোকজন নিয়ে বাড়ি ও মন্দিরের সম্পত্তি জবর দখল করে নিয়েছেন। এমনকি বাড়ি সংলগ্ন মন্দিরের পাকা ফটকে ‘খান বাড়ি’ লেখা নাম ফলক বসিয়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভূমি অফিসের রেকর্ড অনুযায়ী বিরোধপূর্ণ জমির মালিকানা ও মন্দিরের জমির পরিমাণ নিয়ে রয়েছে পৃথক তথ্য এবং আদালতে চলমান রয়েছে একাধিক মামলা। ভূমি অফিসের রেকর্ড পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ৬৬০ নং দাগে ১৭ শতক ভিপি জমিতে লিজপূর্বক শ্রীগুরু মন্দির দখলে আছে। এছাড়া ৬৫৯ নং দাগে ২৪.৭৩ শতক সম্পত্তি দীর্ঘদিন যাবত ব্যবহার করে আসছে। ভূমি অফিসের রেকর্ডে ভিপি ১৭ শতক সম্পত্তি ছাড়া মন্দিরের নামে কোন জমি নেই। মূলত ৬৫৯ নং দাগের ৮১ শতক জমি নিয়ে দীর্ঘ বছরের বিরোধ ও মালিকানা সংক্রান্ত জটিলতা চলছে।
সূত্রে আরও জানা গেছে, মন্দিরের পার্শ্ববর্তী ৬৫৯ দাগের চার শতক জমিতে একটি দ্বিতল ভবন রয়েছে। যা ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট উজিরপুরে পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহবায়ক নুরুজ্জামান খান দখল করেন। ওই জমি নিয়েই মূল বিরোধ। ভূমি অফিসের রেকর্ড পর্যালোচনায় ওই জমি বরুন মিত্রের নামে নামজারী করা। যদিও নামজারী যেখান থেকে উৎপত্তি সেটাও বাতিল হওয়া। কারণ এই জমি ব্যক্তি নামে নামজারী হওয়া। মন্দিরের নামে কোন নামজারীর রেকর্ড ভূমি অফিসে নেই। ২০১৯ সালের পরবর্তী সময়ে দ্বিতল ভবনের নিচ তলায় কয়েকটি রুম মন্দিরের অফিস ঘর হিসেবে ব্যবহৃত হতো বলে বরুন মিত্র দাবি করেন।
সূত্রে আরও জানা গেছে, ৬৫৯ নং দাগের ৮১ শতক জমি নিয়ে হাইকোর্টে সিভিল রিভিশন ৪১৭/২০১৩ এবং সহকারী জজ আদালত, উজিরপুরে ৮৭/২০১৪ এবং ৫৩/২০১৫ মামলা চলমান রয়েছে।
উজিরপুর উপজেলা সহকারি কমিশনার ভূমি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ভূমি জবর-দখল হলে উচ্ছেদের বেশ কিছু আইনী প্রক্রিয়া রয়েছে। সেসব আইনী প্রক্রিয়া ছাড়া দখলদারদের উচ্ছেদ করা যাচ্ছেনা। সূত্রটি আরও জানিয়েছেন, অবৈধভাবে দখল হওয়া ভূমি বা ভবন উদ্ধারের প্রক্রিয়া নির্ভর করে সম্পত্তির ধরন (সরকারি নাকি ব্যক্তিগত) এবং দখলদার কতোদিন ধরে দখলে রয়েছে তার ওপর। সেক্ষেত্রে ব্যক্তিগত জমি বা ভবনের ক্ষেত্রে আইনগত প্রক্রিয়া ব্যক্তিগত সম্পত্তির ক্ষেত্রে মালিক নিজে বলপ্রয়োগ না করে আইনের আশ্রয় নেওয়া আবশ্যক। মালিকানাস্বত্ব প্রমাণ ছাড়াই যদি বেআইনিভাবে ও অসম্মতিতে বেদখল করা হয়, তবে বেদখল হওয়ার ছয় মাসের মধ্যে দেওয়ানি আদালতে মামলা করে দখল উদ্ধার করা যায়। কিন্তু আদালতে মামলা দায়ের ছাড়া ব্যক্তি মালিকানা সম্পত্তি থেকে দখলদার উচ্ছেদে উপজেলা প্রশাসনের তেমন কিছুই করার নেই। বরুণ মিত্র অভিযোগ করেন, নুরুজ্জামান খান ও তাঁর লোকজনে তার বাড়িটি দখল করেন এবং বাড়ি সংলগ্ন মন্দিরের ফটকে ‘খান বাড়ি’ লেখা হয়। সম্প্রতি ওই সাইনবোর্ড সরিয়ে মন্দিরের অফিস কক্ষের ভবনে লাগানো হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এ বিষয়ে প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করেও তিনি প্রতিকার পাননি।
বাড়ি ও মন্দিরের সম্পত্তি দখলের বিষয়ে উজিরপুরে পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহবায়ক নুরুজ্জামান খানের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও মোবাইল নাম্বারটি বন্ধ থাকায় তার কোন বক্তব্য গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। অপরদিকে সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে আদালতে মামলা চলমান থাকায় প্রশাসনিক পদক্ষেপের ক্ষেত্রে আইনি জটিলতা রয়েছে দাবি করে উজিরপুর মডেল থানার ওসি মো. রকিবুল ইসলাম জানিয়েছেন, জমি নিয়ে মামলা থাকায় পুলিশের এখতিয়ার সীমিত। ওই সম্পত্তি নিয়ে আদালতে একাধিক মামলা চলমান থাকায় থানা পুলিশের পক্ষে কিছুই করা সম্ভব নয়। সম্প্রতি বরিশাল জেলা প্রশাসকের কাছে জেলা পুজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি মানিক মুখার্জি হিন্দু পরিবারের বাড়ি ও মন্দিরের সম্পত্তি দখলমুক্ত করার দাবিতে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগ পেয়ে জেলা প্রশাসক মো. মামুন খন্দকার উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন।
উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আলী সুজা বলেন, বরুণ মিত্রের বাড়ি দখলের অভিযোগ পেয়ে বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় নেতৃবৃন্দের সাথে একাধিকবার আলোচনা করা হয়েছে। এমনকি সরেজমিন পরিদর্শন করেও বিষয়টি সমাধান করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু আদালতে মামলা চলমান থাকায় বিষয়টি নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার আরও জানিয়েছেন-সম্পত্তি নিয়ে যেখানে আদালতে মামলা চলমান রয়েছে, সেখানে আদালতের পরবর্তী নির্দেশ ছাড়া উপজেলা প্রশাসনের কি-বা করার আছে। থানা পুলিশও আদালতের নির্দেশ ছাড়া দখলমুক্ত করার জন্য ঘটনাস্থলে যেতে অনিহা প্রকাশ করেছেন।