‘চিনির উৎপাদন বৃদ্ধি করতে বিটকে বিকল্প হিসাবে নেওয়ার পরামর্শ’

এফএনএস (টিপু সুলতান, কালীগঞ্জ, ঝিনাইদহ) : | প্রকাশ: ১৯ জুন, ২০২৫, ০৫:০০ পিএম
‘চিনির উৎপাদন বৃদ্ধি করতে বিটকে বিকল্প হিসাবে নেওয়ার পরামর্শ’

বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট ঈশ্বরদীর মহাপরিচালক ড. কবির উদ্দিন আহম্মেদ বলেছেন, আমাদের দেশের অনেক মানুষ আছেন যারা হোয়াইট সুগার পছন্দ করেন না। আমরা নন মিল এলাকায় আখের চাষ করে ব্রাউন সুগার উৎপাদনে যাচ্ছি। এতে চিনির চাহিদা কমানো সম্ভব হবে। এর জন্য আমরা একটি উদ্দ্যোক্তা শ্রেণি তৈরি করতে কাজ করছি। ১৫ জুন ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ শহরের অবস্থিত মোবারকগঞ্জ চিনিকল এলাকার আখচাষিদের নিয়ে অনুষ্ঠিত গুনগতমান সম্পন্ন বীজআখ উৎপাদন কৌশল ও এর ব্যবহার শীর্ষক দুই দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মশালার উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন। 

এসময় এক শ্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দেশের মোট চাহিদার ১ শতাংশের মত চিনি উৎপাদন হয় দেশীয় মিলে। বাকি ৯৯ ভাগ চিনি আমদানি নির্ভর। দেশীয় মিলে চিনি উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য বিটকে বিকল্প হিসবে নেওয়ার পক্ষে মত দেন। সর্বশেষ আখ মাড়াই মৌসুমের ৩ মাসে দেশীয় ৯ মিলে ৪৬ হাজার মেট্রিক টন চিনি উৎপাদন হয়েছে। সে ক্ষেত্রে বিট দিয়ে আরো তিন মাস উৎপাদন করা গেলে চাহিদার প্রায় ৫ শতাংশ বা তার বেশি উৎপাদন করা সম্ভব। তাছাড়া আখ তো সারা বছর ফলাতে পারবো না। দেশে ২ থেকে ৩ লাখ হেক্টর লবনাক্ত জমি সারা বছরই পড়ে থাকে। সেখানে আমরা সহজেই বিট চাষ করতে পারি। দেশের দুইটি অথবা তিনটি মিলকে যদি আমরা পাইলট হিসাবে নিয়ে চিনি উৎপাদন করতে পারি, তাহলে চিনির বিদেশ নির্ভরতা কমানো সম্ভব বলে মনে করি। বিটচাষ করা গেলে আখমাড়াই শেষ হবে বিট শুরু হবে। আখ তো ক্রাস করে চিবিয়ে তারপর রস বের করতে হয় কিন্তু বিট থেকে সহজে রস পাওয়া যায়। আমরা যদি জাতীয় স্বার্থটা দেখি তাহলে মনে হয় এটা সম্ভব। একটা সময় চিনি থেকে আমাদের কারেন্সি আসতো এখন আসছে না কেন। বিষয়টি নিয়ে ভাবার সুযোগ আছে। 

এসময় তার সাথে উপস্থিত ছিলেন, মোবারকগঞ্জ সুগার মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহম্মদ সাইফুল ইসলাম, বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (রোগতত্ব বিভাগ) ড. মো. আনিসুর রহমান, প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগ) ড. কেএম রেজাউল করিম ও মোবারগঞ্জ সুগার মিলের মহাব্যবস্থাপক (কৃষি) গৌতম কুমার মন্ডল। 

বিএসআরআই এর মহাপরিচালক ড. কবির উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, উৎপাদনের প্রথম শর্ত হলো ভালো বীজ। মা সুস্থ্য না হলে সন্তান সুস্থ্য আশা করা যায় না। সুস্থ্য বীজ না হলে আপনারা আখ চাষে যতই সার ওষুধ দেন, ভালো ম্যানেজমেন্ট করেন না কেন ভালো ফলন পাবেন না। আখচাষের ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে। আমাদের কৃষকরা ধানের ক্ষেত্রে যখন সার প্রয়োজন দিচ্ছে, কীটনাশক দিচ্ছে, সেচ দিচ্ছে কিন্তু আখের ক্ষেত্রে উদাসিনতা লক্ষ্য করা যায়। আবার আখ ভালো হলেও কারখানার ত্রুটি থাকে যে কারনে সঠিক রিকভারি পাওয়া যায়না। এজন্য আমরা এককভাবে আখচাষ বা কারখানার ত্রুটি আইডেন্টিফাই না করে উৎপাদনের ক্ষেত্রে উভয় পক্ষকেই শতর্ক হওয়া পরামর্শ দেন। রিকভারি ভালো হচ্ছে না। আখ হারভেস্টের পর যতটুকু রস পায় তা যদি মেইন সিস্টেমে ঠিকমত কাজে না লাগাতে পারি তাহলে রিকভারি কমে যাবে। আমরা যখন মাঠ পর্যায়ে পরীক্ষা করি তখন ১০ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত সুগার পায় কিন্তু মিলে এলে ৪ থেকে ৬ শতাংশ পাওয়া যায়। তাহলে গ্যাপটা কোথায়, এটা আমাদের দেখতে হবে। আখের একটি ভেরাইিিটতে সুগার পারসেন্টেজ কম এটা বলা যাবে না। 

একটি সময় দেখা গেছে, মিলের কারখানায় চিনির রিকভারি ৭ পর্যন্ত ছিল কিন্তু এখন ৫ শতাংশের উপর যায় না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, সেটা আজ থেকে ১০ ১৫ অথবা ২০ বছর আগের কথা। তখন মিল কারখানার যন্ত্রপাাতি ভালো ছিল এখন তেমন নেই। দেশের প্রত্যেকটি সেক্টর আধুনিকায়ন করা হয়েছে বা হচ্ছে। কিন্তু সুগার মিলের ক্ষেত্রে কোন আধুনিকায়ন করা হয়নি। সেই ৫০ থেকে ৬০ বছর আগের যন্ত্রপাতিতে চলছে সুগারমিলগুলো। আপনি যদি একটি গাড়ি কেনেন তাহলে ১০ বছর পর আর আগেরর মত সার্ভিস দিবে না। মিলের পুরাতন যন্ত্রপাতি কি আগের মত ফিটনেস আছে, নাই। এখন উচিৎ হবে সরকারের শিল্প মন্ত্রণালয় বা চিনি খাদ্য শিল্প করপোরেশন একটি একটি করে পর্যায়ক্রমে সুগার মিল আধুনিকায়ন করা। বিকল্প উৎপাদন করা। আমরা মিলগুলোতে ইথানল তৈরি করতে পারি। এগুলো দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যপক চাহিদা রয়েছে। দেখেন কারখানায় উৎপাদিত চিটাগুড় পড়ে রয়েছে। এগুলো একেবারেই অল্প টাকায় বিক্রি করা হয়। এগুলো রাখার জায়গা নেই। আমাদের চিনিকলগুলো মাত্র তিনমাস উৎপাদনে থাকে। বছরের বাকি সময় বসে থাকে। এতে আমাদের উৎপাদন খরচ বাড়ে।

মাঠে চাষ হওয়া অন্যান্য ফসল থেকে আখের লাভ কম এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আখ ১ বছরের ফসল। আখ চাষের শুরুতেই সাথী ফসল চাষ করার সুযোগ রয়েছে। সেখান থেকে ভালো একটা প্রফিট করা যায়। যা দিয়ে আখ চাষের খরচ উঠে যায়। বর্তমানে আখের দামও ভালো, আগামিতে আরো ভালো হবে বলে কৃষক ভাইদের আশস্ত করতে পারি বলে যোগ করেন তিনি।