শিক্ষা উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবিতে সচিবালয়ের ভেতরে শিক্ষার্থীরা, কাঁদুনে গ্যাস ছুড়ল পুলিশ

নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশ: ২২ জুলাই, ২০২৫, ০৫:০২ পিএম
শিক্ষা উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবিতে সচিবালয়ের ভেতরে শিক্ষার্থীরা, কাঁদুনে গ্যাস ছুড়ল পুলিশ

উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান বিধ্বস্ত হয়ে শিক্ষার্থীসহ বহু মানুষের প্রাণহানির ঘটনায় উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজধানী ঢাকা। নিহতদের পরিচয় প্রকাশে অনিয়ম, এইচএসসি পরীক্ষার সময়সূচি ঘোষণা ও স্থগিতের সমন্বয়হীনতা এবং দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ তুলে শিক্ষা উপদেষ্টা চৌধুরী রফিকুল আবরার (সি আর আবরার) ও শিক্ষা সচিব সিদ্দিক জুবায়েরের পদত্যাগের দাবিতে রাজপথে নেমেছে ঢাকার বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা। তাদের এই আন্দোলন গড়িয়েছে সচিবালয়ের ভেতর পর্যন্ত—যেখানে পুলিশের কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জে রূপ নেয় পরিস্থিতি।

মঙ্গলবার (২২ জুলাই) দুপুর থেকে আন্দোলনে অংশ নেয় রাজধানীর ঢাকা কলেজ, সিটি কলেজ, আইডিয়াল কলেজ, বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ পাবলিক কলেজ, মিরপুর বাংলা কলেজসহ বেশ কয়েকটি কলেজের শিক্ষার্থীরা। প্রথমে তারা বিক্ষোভ করে শিক্ষা ভবনের সামনে। এরপর মিছিল করে সচিবালয়ের এক নম্বর গেটে অবস্থান নেন তারা।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বেলা আড়াইটার দিকে শিক্ষার্থীরা সচিবালয়ের গেট ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়েন। এরপর পার্কিংয়ে থাকা একাধিক গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এই সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রথমে শিক্ষার্থীদের নিবৃত করার চেষ্টা করলেও একপর্যায়ে সংঘর্ষ বেঁধে যায়। পুলিশ শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে এবং লাঠিচার্জ করে।

আন্দোলনকারীরা দাবি করেন, মাইলস্টোন স্কুলে বিমান বিধ্বস্ত হয়ে ৩১ জন নিহত ও অন্তত ১৬৫ জন আহত হলেও সরকারের পক্ষ থেকে যথাযথ ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। সোমবার (২১ জুলাই) রাত তিনটায় পরীক্ষাসমূহ স্থগিতের ঘোষণা আসায় বহু শিক্ষার্থী সকালে পরীক্ষা কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে বিপাকে পড়ে।

তারা আরও অভিযোগ করেন, শিক্ষা উপদেষ্টা ও সচিবের দায়িত্বে অবহেলা, দেরিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, প্রশ্নপত্রে ভুল এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি অসংবেদনশীল আচরণ এই আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করেছে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থী তানভীর বলেন, "গোপালগঞ্জে সামান্য কারণে পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে, অথচ এত বড় ঘটনা ঘটার পরও সরকার দীর্ঘ সময় ধরে নিরব ছিল। এটা এক ধরনের বৈষম্য।"

বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী মাহমুদুল হাসান আরেফিন বলেন, “শিক্ষা উপদেষ্টা ও সচিবের পদত্যাগ চাই। তাঁরা প্রশ্নপত্র বিভ্রাট থেকে শুরু করে সব দায়িত্বে ব্যর্থ। আমরা চাই, সব বোর্ডে অভিন্ন প্রশ্ন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হোক।”

মঙ্গলবার (২২ জুলাই) দুপুর সোয়া ১টার দিকে তেজগাঁওয়ের পুরোনো বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়নের পরপরই একটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের হায়দার আলী ভবনের ওপর। ঘটনাস্থলে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে এবং সেনাবাহিনী উদ্ধার কাজে সহায়তা করে।

এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৩১ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে, যাদের মধ্যে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মচারী রয়েছেন। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন আরও ১৬৫ জন। তবে নিহত সবার পরিচয় এখনও প্রকাশ করা হয়নি।

এ ঘটনায় মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সোমবার (২১ জুলাই) গভীর রাতে এইচএসসি পরীক্ষাসমূহ স্থগিতের ঘোষণা দেওয়া হয়। তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের ফেসবুক পেজ থেকে এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়। এতে উল্লেখ করা হয়, “শিক্ষা উপদেষ্টা মহোদয়ের সঙ্গে মাননীয় তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের বৈঠক শেষে স্থগিত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”

তবে এই সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের কাছে যথাসময়ে পৌঁছায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষা কেন্দ্রে এসে পরীক্ষার অনুপস্থিতির বিড়ম্বনায় পড়েন।

এই পরিপ্রেক্ষিতেই শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামেন এবং চূড়ান্তভাবে সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচিতে অংশ নেন। সেখান থেকে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায়।

সচিবালয়ের সামনের সংঘর্ষের পর আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা গুলিস্তান, জিরো পয়েন্ট এবং শিক্ষা ভবনের সামনেও অবস্থান নেন। পরিস্থিতি এখনো উত্তপ্ত থাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে সচিবালয় এলাকায়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনার চেষ্টা চলছে বলে জানা গেছে।

এই আন্দোলনের ফলে ঢাকা শহরে যানজট ও জনদুর্ভোগ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি দপ্তরগুলোতেও স্বাভাবিক কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে