রাজশাহীতে বিএনপি এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ নেতাসহ কয়েকজন ইউপি সদস্য মদ্যপ অবস্থায় উল্লাস প্রকাশ করেছেন। এ ধরনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরালের পর তোলপাড় শুরু হয়েছে। জেলার তানোর উপজেলার পাঁচন্দর ইউনিয়ন (ইউপি) পরিষদ কার্যালয়ে প্রকাশ্যে দিবালোকে গত ১৩ আগস্ট এ ঘটনা ঘটে।
বিএনপির ওই দুই নেতা আব্দুল গাফ্ফার এবং মাইনুল ইসলাম পাঁচন্দর ইউপির সদস্য হিসেবেও বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন। উল্লাসের সময় তাদের সাথে আওয়ামী লীগের পদধারী দুইজন ইউপি সদস্যও উপস্থিত ছিলেন। এ ঘটনায় বিএনপি এবং অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।
পাশাপাশি ইউপি কার্যালয়ে প্রকাশ্যে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের ঘটনায় জনমনে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। তারা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোাষীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। তবে বিএনপি নেতা ইউপি সদস্যরা নাচ-গানের বিষয়টি ন্বীকার করলেও, মদপানের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
এ ব্যাপারে ক্ষোভ জানিয়ে তানোর উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আব্দুল মালেক বলেন, ‘পাঁচন্দর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক গাফ্ফার এবং আট নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি মাইনুলের বিরুদ্ধে বেশকিছু গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। প্রায়শই তারা ইউপি কার্যালয়ের মধ্যে মজমা (অনৈতিক কর্মকাণ্ড) বসান। মদপান করেন। এদের এ ধরনের কর্মকাণ্ডে বিএনপির নেতাকর্মীরা বিব্রত। তাদের অপকর্মে দলের ভাবমূর্তি মারাত্মতভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এরা দুজনেই বিএনপি কর্মী গাণিউল হত্যা মামলার আসামি। দলের সম্মান এবং মর্যাদা রক্ষায় এদেরকে দ্রুত দল থেকে বহিষ্কারের দাবি জানাচ্ছি।’
এদিকে গত ১৩ আগস্ট পাঁচন্দর ইউনিয়ন পরিষদে বিএনপি নেতা গাফ্ফার এবং মাইনুল মদ্যপ অবস্থায় নাচ ও গানের আসরে উপস্থিত ছিলেন- ১,২,৩ নম্বর ওয়ার্ডের নারী সদস্য মাবিয়া খাতুন, মহিলা আওয়ামী লীগের ইউনিয়ন সহসভাপতি ও ৪,৫, ৬ নম্বর ওয়ার্ডের নারী সদস্য বেবি আরা এবং ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ও ওই ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি আরেক আব্দুল গাফ্ফার।
ইউপি সদস্যদের এ ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ডে ক্ষোভ জানিয়ে ওই ইউনিয়নের কিষ্ণপুর গ্রামের বাসিন্দা আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘জনপ্রতিনিধি হিসেবে ইউপি সদস্যরা এটি করতে পারেন না। জনগণ যেকোনো সমস্যা এবং ভালো-মন্দ পরামর্শের জন্য তাদের কাছে যান। আর তারাই যদি খারাপ কাজের সাথে যুক্ত থাকেন, তাহলে জনগণের যাওয়ার জায়গা থাকে না। আমরা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি।’
ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা গেছে, টেবিলের ওপর চোলাই মদের বোতল এবং গ্লাস রয়েছে। উচ্চ শব্দে গান ছেড়ে বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে নাচছেন ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল গাফ্ফার। পাশে থেকে হাত নেড়ে নেড়ে এসময় উল্লাসে ফেটে পড়ছেন আট নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মাইনুল ইসলাম এবং মহিলা লীগ নেত্রী বেবি আরা। এসময় তারা খুব উৎফুল্ল ছিলেন। তাদের পাশাপাশি প্যানেল চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলামসহ অন্য ইউপি সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন। তবে ভিডিওতে তাদের চেহারা খুব বেশি দেখা যায়নি।
নাচের বিষয়টি স্বীকার করে বিএনপি নেতা ইউপি সদস্য আব্দুল গাফ্ফার বলেন, ‘ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল মতিন পরিষদে ছিলেন না। তার অনুপস্থিতিতে আমরা বাজার থেকে হাঁস নিয়ে এসে খাওয়া-দাওয়া করি। মদ পানের অভিযোগ সঠিক না। কিছু মানুষ বিভ্রান্তি ছড়ানোর জন্য বিষয়টি প্রচার করছেন। আর আওয়ামী লীগ বলে না, আমরা দলমত সকলেই মিলেমিশে থাকি।’
এ ব্যাপারে বিএনপি নেতা মাইনুল ইসলাম বলেন, ‘আব্দুল গাফ্ফার ভালো নাচতে পারেন। একারণে পরিষদের বারান্দায় একটু নাচ-গান হয়েছে। এর বেশি কিছু না। সেখানে মদ না, পানির বোতল আর গ্লাস ছিলো। যারা বলছেন- মদ ছিলো, তাদের উদ্দেশ্য খারাপ।’
বিষয়টি জানার জন্য মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রী বেবি আরাকে ফোন দেয়া হয়। তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়ায় তার প্রতিক্রিয়া পাওয়া সম্ভব হয় নি। আওয়ামী লীগ নেতা আরেক আব্দুল গাফ্ফারের ফোনটিও বন্ধ ছিলো। তাছাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং ওই ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল মতিনকে বেশ কয়েকবার ফোন দিলেও তিনি ধরেন নি।
এ বাপারে স্থানীয় সরকার বিভাগ, রাজশাহীর পরিচালক জাকিউল ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টি আমি এখনও জানি না। তানোরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আছেন। তিনি স্থানীয়ভাবে বিষয়গুলো মনিটরিং করেন। উনাকে বিষয়টি দেখার জন্য বলব। আর ইউপি চেয়ারম্যান বা সদস্যদের জন্য সুনির্দিষ্ট আইন এবং আচরণবিধি রয়েছে। উনারা যদি তা ভঙ্গ বা লঙ্ঘণ করেন, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
প্রসঙ্গত, গত ১১ মার্চ পাঁচন্দর ইউনিয়ন বিএনপির ইফতার মাহফিলে প্রধান অতিথি দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) শরীফ উদ্দিনকে বরণ করা নিয়ে বিএনপির দুই গ্রুপে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি মোমিনুল হকের ছোট ভাই গানিউল ইসলাম নিহত হন। নিহতের ভাই মোমিনুল বিএনপির ৩৭ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে তানোর থানায় হত্যামামলা দায়ের করেন।
এ হত্যা মামলার ৫ নম্বর আসামি আব্দুল গাফ্ফার। আর মাইনুল ইসলাম হলেন ৩০ নম্বর আসামি। গত ২৪ এপ্রিল তারা উচ্চআদালত থেকে অস্থায়ী জামিন লাভ করেন। পরে তারা নিম্ন আদালত থেকেও জামিন পান।ই/তা