বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রভাবশালী লেখক ও শিক্ষাবিদ সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের মরদেহ সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধার জন্য শনিবার (১১ অক্টোবর) সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার সামনে আনা হয়। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সেখানে সহকর্মী শিক্ষক, প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থী, সাংস্কৃতিক কর্মী ও শুভানুধ্যায়ীরা ফুল দিয়ে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান খান, ইংরেজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক তাজিন আজিজ চৌধুরী, ইংরেজি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য, সংগীত বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। এরপর সকাল ১১টার দিকে মরদেহ নেয়া হয় কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে। সেখানে সর্বস্তরের মানুষ তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানায়।
এরপর বাদ জোহর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে তাঁর দাফন করা হবে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে।
শুক্রবার (১০ অক্টোবর) বিকেল ৫টার দিকে রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম মৃত্যুবরণ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর। বিকেলের দিকে ধানমন্ডিতে ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশে (ইউল্যাব) যাওয়ার পথে গাড়িতে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। পরে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা জানান, তাঁর ‘ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক’ হয়েছে। চিকিৎসা শেষে তাঁর হৃদ্যন্ত্রে স্টেন্ট বসানো হয়, তবে শেষ পর্যন্ত তিনি বাঁচেননি।
১৯৫১ সালের ১৮ জানুয়ারি সিলেট শহরে জন্মগ্রহণ করেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। বাবা সৈয়দ আমিরুল ইসলাম এবং মা রাবেয়া খাতুনের বড় সন্তান তিনি। ১৯৬৬ সালে সিলেট সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রবেশিকা এবং ১৯৬৮ সালে সিলেট এমসি কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। পরে ১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও ১৯৭২ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৮১ সালে কানাডার কিংস্টনের কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইরিশ কবি ডব্লিউ বি ইয়েটসের ওপর পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।
পেশাগত জীবনে তিনি দীর্ঘদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন। অবসরোত্তর সময়ে যোগ দেন ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশে (ইউল্যাব)। তিনি ছিলেন কেবল একজন শিক্ষক নন—ছিলেন একজন চিন্তক, কথাসাহিত্যিক ও প্রবন্ধকার, যিনি বাংলা কথাসাহিত্যে জাদুবাস্তবতার এক স্বতন্ত্র ধারা সৃষ্টি করেন।
তাঁর গল্পগ্রন্থ ‘প্রেম ও প্রার্থনার গল্প’ ২০০৫ সালে প্রথম আলো বর্ষসেরা সৃজনশীল বইয়ের পুরস্কার পায়। সাহিত্যচর্চায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ১৯৯৬ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, ২০১৬ সালে কাজী মাহবুবুল্লাহ পুরস্কার এবং ২০১৮ সালে একুশে পদক পান।
শিক্ষার্থী, সহকর্মী ও সাহিত্যপ্রেমীরা বলছেন, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ছিলেন এমন এক শিক্ষক, যিনি ক্লাসরুমের বাইরে থেকেও প্রজন্মকে আলোকিত করতেন। তাঁর মৃত্যু শুধু একজন সাহিত্যিকের নয়, এক চিন্তাশীল আত্মার প্রস্থান।