চার উপজলোর হাওরে ছয় মাসে উৎপাদন ৫২ হাজার টন দুধ

এফএনএস (সানি সূত্রধর; নিকলী, কিশোরগঞ্জ) : | প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর, ২০২৫, ০৩:০২ পিএম
চার উপজলোর হাওরে ছয় মাসে উৎপাদন ৫২ হাজার টন দুধ

চারদিকে সবুজের সমারোহ। মাঝখান দিয়ে চলে গেছে নদী ও সড়কের দুই প্রান্তে দিগন্ত বিস্তৃত পতিত জমি। যেখানে শত শত গরু অবাধ বিচরণ। এ যেন গো-চরণভূমি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এমন অপরূপ দৃশ্যের দেখা মিলবে কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলাসহ পার্শ্ববতী হাওর উপজেলার হাওর গুলোতে। বোরো চাষ, মাছ শিকারের পাশাপাশি ৬ মাস মেয়াদি গবাদিপশু লালনপালনে ঝুঁকছে এখানকার প্রান্তিক কৃষকরা।

এ সময় পুরো হাওর জুড়ে ঘাসের আধিক্য থাকায় বিনা খরচে গবাদি পশু লালন পালন করে উপকৃত হন প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করা এসব মানুষ। তাদের সেই পরিশ্রমে ছয় মাসে হাওরাঞ্চল থেকেই উৎপাদন হয় ৫২ হাজার টন দুধ ও সাড়ে ২১ হাজার টন মাংস। পাল্টে যাচ্ছে উপজেলাগুলোর অর্থনৈতিক চাকা।

অস্থায়ী খামারিরা জানান, নিকলী উপজেলার বরুলিয়া, জোয়ানশাহী, ভাতশালা, ঘোড়াদীঘা ও বড়াইল হাওরে গরু নিয়ে আসা খামারি ও কৃষকরা জানান, গরু গুলো এই হাওরের স্থায়ী বাসিন্দাদের নয়। হাওর উপজেলা নিকলী, মিঠামইন, ইটনা ও অষ্টগ্রাম হাওরে নিয়ে এসেছেন দরিদ্র প্রানি—ক কৃষক। প্রতিদিন সকালে দুই-তিন কিলোমিটার দূরের গ্রাম থেকে গরু গুলোকে আনা হয় অথবা গরুগুলোর জন্য হাওরেই বানানো হয় অস্থায়ী তাঁবুর মতো ডেরা। শুকনা মৌসুমে হাওরে অস্থায়ীভাবে গরু লালন পালনের পুরোনো-প্রচলিত একটি পদ্ধতি হচ্ছে এই বাথানব্যবস্থা। বিকেলে গরুর ছোট ছোট পালের দেখা মেলে এখানে-ওখানে। একেক পালে ১৫টি থেকে ২০টি গরু থাকে। পানি কমে যাওয়ার পর শুকনো মৌসুমে হাওরের বুকে বিভিন্ন জাতের ঘাস বেড়ে ওঠে। সেই ঘাসকে পুঁজি করে ৬ মাস মেয়াদি গরু লালনপালন করে থাকে এখানকার কৃষকরা। প্রাকৃতিক উপায়ে সবুজ ঘাসের মাধ্যমে মোটাতাজা করায় অল্প খরচে অধিক লাভ হয় বলে জানান প্রানি—ক কৃষকরা।

হাওরে অস্থায়ী গরু পালন করতে আসা খামারি রুবেল মিয়া বলেন, আমি হাওরে শুকনোর ছয়মাসের জন্য অস্থায়ী খামার দিয়েছি। এখানে ৫১টি গরু আছে। এই ঘাসকে পুঁজি করেই আমাদের গরু লালন পালন করতে হয়। প্রাকৃতিক উপায়ে কোরবানি ঈদের আগ পর্যন— এখানে লালনপালন করব। এরপর বিভিন্ন হাটে বিক্রি করে দেব। বাইরের কোনো খাবার খাওয়াতে হয় না। অতিরিক্ত কোন খরচ না থাকায় আমাদের লাভটা একটু বেশি হয়। ঘাসগুলো বড় করতে কিছু খরচ হয়। আমাদের থাকা খাওয়াটা কষ্ট হয়।

কৃষক ফালু মিয়া বলেন, মূলত যে সব উঁচু জমিগুলো চাষের উপযুক্ত না থাকে এখানে শুকনো মৌসুমে প্রচুর পরিমাণে ঘাস হয়। সেই ঘাস গুলোকে পুঁজি করে গরু লালনপালন করা হয়। ঘাসগুলো ছোট থাকতে যত্ন নিতে হয়। আমাদের খরচ কম। তাই আমাদের লাভ বেশি। প্রাকৃতিক উপায়ে গরু মোটাতাজা করা হয়। তবে মাঝে- মাঝে গরু চোরের দল হাওর থেকে গরু চুরি করে নিয়ে যায়। তায় সব সময় সর্তক অবস্থায় হাওরে জীবন-যাপন করতে হয় গরুর পাল নিয়ে।

কৃষক বিল্লাল মিয়া বলেন, বর্ষাকালে আসার আগেই আমরা গরু বিক্রি করে ফেলি। বর্ষা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আবার গরু কিনে আনি। আগে একটা গরু পালতাম ।গরু পাললে লাভ বেশি হওয়ায় এই বছর ১২টি গরু পালছি। যেসব জমিতে ধান আবাদ হয় না সেই জমিগুলোতে ঘাস চাষ করেছি। সেই চাষকৃত ঘাস দিয়ে গরু পালি করে থাকি। খরচ কম লাভ বেশি।

নিকলী উপজেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা মোঃ আবু হানিফ জানান, হাওরে পানি কমে যাওয়ার পর শুকনো মৌসুমে হাওরের বুকে বিভিন্ন জাতের ঘাস বেড়ে ওঠে। সেই ঘাসকে পুঁজি করে ছয় মাস গরু লালন-পালন করে থাকেন এখানকার কৃষকরা। প্রাকৃতিক উপায়ে সবুজ ঘাসের মাধ্যমে গরু মোটাতাজা করায় অল্প খরচে অধিক লাভ হয় তাদের।

কিশোরগঞ্জ জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. সুভাষ চন্দ্র পন্ডিত এফএনএস২৪কে বলেন, বর্ষাকালে কিশোরগঞ্জের হাওর উপজেলাগুলো গবাদি পশু লালনপালন কমে যায়। সাধারণত বর্ষায় ৩৪ হাজার টন দুধ ও সাড়ে ১৪৮ হাজার টন মাংস উৎপাদন হয়। শুকনোর সময় উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা বেড়ে দুধের পরিমাণ দাড়ায় ৫২ হাজার টন। পাশাপাশি সাড়ে ২১ হাজার টন মাংস উৎপাদন হয়। হাওরে প্রাকৃতিক ঘাস খাওয়ানোর মাধ্যমে নিরাপদ পদ্ধতিতে দুধ ও মাংস উৎপাদনে প্রাণিসম্পদ দপ্তর পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হয়। জেলায় উৎপাদিত দুধ ও মাংসের ১৭ শতাংশ আসে হাওর থেকে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে