সিলেটের ছয়টি আসনে আগাম নির্বাচনী উত্তাপ এখন তুঙ্গে। প্রতীক হাতে প্রার্থীদের পথসভা, মিছিল, মতবিনিময় ও সামাজিক আয়োজন মিলিয়ে পুরো জেলা পরিণত হয়েছে রাজনৈতিক উৎসবমুখর মাঠে। আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির অনুপস্থিতিতে মূল লড়াই সীমাবদ্ধ বিএনপি ও ইসলামি দলগুলোর মধ্যে-এমন ম্যাপ সিলেটের রাজনীতিতে বহুদিন দেখা যায়নি।
সিলেট-১: শহরের কেন্দ্রে বিএনপি-জামায়াতের হিসাব-নিকাশ
সিলেট-১ আসনকে অনেকেই সরকারের ‘লিটমাস টেস্ট’ বলেন। এখানকার বিজয়ী দলই কেন্দ্রীয় ক্ষমতার পাল্লায় এগিয়ে থাকে-ইতিহাস তাইই বলে। এবারের লড়াই জমে উঠেছে বিএনপির খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ও প্রথমবার এ আসনে মাঠে নামা জামায়াত নেতা মাওলানা হাবিবুর রহমানকে ঘিরে। শহরতলির সভা-সমাবেশে দু’জনই পূর্ণোদ্যমে প্রচার চালাচ্ছেন। তরুণ ভোটারদের ধরে রাখতে চেষ্টা করছে জামায়াত, আর পুরোনো সমর্থক আর বংশপরম্পরার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের ভরসায় এগোচ্ছে বিএনপি।
সিলেট-২: ইলিয়াস আলীর স্মৃতি লড়াইকে বদলে দিয়েছে
বিশ্বনাথ-ওসমানীনগর এলাকার মানুষ এখনও ভুলতে পারেননি এম ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা। তার স্ত্রী তাহসীনা রুশদীর লুনা বিএনপির মনোনয়ন পাওয়ার পর পুরো আসনজুড়ে এক ধরনের আবেগী স্রোত তৈরি হয়েছে। ইসলামী দলের একাধিক প্রার্থী থাকলেও ভোটারের সহমর্মিতা লুনাকে এগিয়ে রেখেছে বলে মাঠের আলোচনা।
সিলেট-৩: মনোনয়নে তৃণমূলে অস্বস্তি, তবু প্রতিযোগিতা জমজমাট
দক্ষিণ সুরমা-ফেঞ্চুগঞ্জ-বালাগঞ্জের এই আসনে বিএনপি মনোনয়ন দিয়েছে যুক্তরাজ্য বিএনপির নেতা এমএ মালিককে। এতে তৃণমূল কিছুটা ক্ষুব্ধ হলেও কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে সবাই একাকার হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। অন্যদিকে উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে মাঠ-পরিচিত জামায়াত প্রার্থী লোকমান আহমদও সমানতালে ভোটার টানছেন। ইসলামি দলের প্রার্থীর সংখ্যা এখানে সর্বাধিক-যা শেষ মুহূর্তে সমীকরণ বদলে দিতে পারে।
সিলেট-৪: জাফলং-রাতারগুলের রাজনীতিতে মনোনয়নের দোলাচল
পর্যটনে সমৃদ্ধ সিলেট-৪ আসনে বিএনপি এখনও চূড়ান্ত প্রার্থী ঘোষণা করেনি। সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী প্রচারণায় ব্যস্ত থাকলেও মনোনয়নপ্রত্যাশী অন্য নেতারা তা ‘অগ্রিম দৌড়’ হিসেবে দেখছেন। জমিয়ত এখানে আসন ছাড় চাইছে, সাথে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে আসছেন জামায়াতের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন। এই আসনে ভোটসমীকরণ এখন সবচেয়ে অনিশ্চিত।
সিলেট-৫: ইসলামী ভোটে কঠিন হিসাব, বিএনপির সিদ্ধান্ত অপেক্ষায় সবাই
জকিগঞ্জ-কানাইঘাটে ইসলামী দলগুলোর ভোটশক্তিই মূল নির্ণায়ক। বিএনপি প্রার্থী ঘোষণা না করায় জোটের ভেতরে সমঝোতার তরঙ্গ স্পষ্ট। জমিয়তের উবায়দুল্লাহ ফারুক জোটের প্রতীক আশা করছেন, আর জামায়াত-ইসলামী আন্দোলন-খেলাফতসহ সবাই অবস্থান শক্ত করতে ব্যস্ত। স্বতন্ত্র হিসেবে আবারও মাঠে নামতে পারেন হুছামুদ্দীন চৌধুরী-যা প্রতিযোগিতাকে আরও ঘোলাটে করতে পারে।
সিলেট-৬: তরুণ বনাম অভিজ্ঞ-দুই ধারার রাজনীতি মুখোমুখি
গোলাপগঞ্জ-বিয়ানীবাজারে বিএনপি রেখেছে তরুণ প্রার্থী এমরান আহমদ চৌধুরীকে, যাকে ঘিরে দলীয় ঐক্য গড়ে ওঠাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে নিজ এলাকা হওয়ায় জামায়াতের সেলিম উদ্দিন স্বাভাবিক সুবিধা পাচ্ছেন। সাথে ইসলামি দল ও গণফোরামের প্রার্থীরা নিজের অবস্থান পাকা করতে মাঠে ঘুরছেন।
শেষকথা
সিলেটের ছয় আসন যেন ছয়টি ভিন্ন গল্প-কোথাও আবেগ, কোথাও মনোনয়নের প্রতিযোগিতা, কোথাও জোটের দরকষাকষি। সবমিলিয়ে সিলেট এখন দেশের সবচেয়ে প্রাণবন্ত ও উত্তেজনাপূর্ণ রাজনৈতিক মঞ্চে পরিণত হয়েছে। নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, এই উত্তাপ আরও বাড়বে-নির্বাচনী মাঠের চোখ সিলেটেই।