কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদে আবারও দানের নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে। তিন মাস ২৭ দিন পর মসজিদের ১৩টি লোহার দানবাক্স খুলে পাওয়া গেছে ৩৫ বস্তা টাকা। পাশাপাশি মিলেছে স্বর্ণালংকার ও বৈদেশিক মুদ্রাও। শনিবার (২৮ ডিসেম্বর) সকাল ৭টা থেকে শুরু হওয়া এই কার্যক্রমে বিপুল অঙ্কের দানের অর্থ গণনা চলছে।
নরসুন্দা নদীর তীরে হারুয়া এলাকায় অবস্থিত পাগলা মসজিদে সাধারণত তিন মাস পর পর দানবাক্স খোলা হয়। তবে এবার নির্ধারিত সময়ের কিছু বেশি সময় পর দানবাক্স খোলা হয়েছে। দানের চাপ বাড়ায় আগেই মসজিদে নতুন করে আরও দুটি দানবাক্স বসানো হয়েছিল। ফলে এবার বস্তাভর্তি টাকার পরিমাণও আগের তুলনায় বেড়েছে।
সকাল থেকেই দানবাক্স খোলা ও টাকা গণনায় ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন কয়েক শ মানুষ। মসজিদ ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যদের পাশাপাশি মসজিদ কমপ্লেক্সের মাদরাসা ও এতিমখানার শিক্ষক-শিক্ষার্থী, পার্শ্ববর্তী জামিয়া এমদাদিয়া মাদরাসার শিক্ষার্থী এবং রূপালী ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এই কাজে অংশ নিয়েছেন। পুরো প্রক্রিয়া তদারকি করছেন জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও দানবাক্স খোলা কমিটির আহ্বায়ক মো. এরশাদুল আহামদ জানান, সকাল ৭টার দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে দানবাক্স খোলা হয় এবং এখন ধারাবাহিকভাবে গণনার কাজ চলছে। তিনি বলেন, “প্রতিবারের মতো এবারও স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তার সর্বোচ্চ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।”
এর আগে চলতি বছরের ৩০ আগস্ট চার মাস ১৮ দিন পর দানবাক্স খুলে পাওয়া গিয়েছিল ১২ কোটি ৯ লাখ ৩৭ হাজার ২২০ টাকা। সে সময়ও বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ও স্বর্ণালংকার মিলেছিল, যা দেশজুড়ে আলোচনার সৃষ্টি করে।
দানবাক্স খোলার সময় উপস্থিত ছিলেন কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও পাগলা মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ আসলাম মোল্লা, পুলিশ সুপার ড. এস এম ফরহাদ হোসেন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মিজাবে রহমত এবং অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ নাহিদ হাসান খান। পুরো এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও আনসার সদস্যদের সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আসলাম মোল্লা বলেন, “পাগলা মসজিদ ও ইসলামি কমপ্লেক্সের দৈনন্দিন ব্যয় মেটানোর পর অবশিষ্ট দানের টাকা ব্যাংকে জমা রাখা হয়। বর্তমানে মসজিদের হিসাবে নগদ ১০৪ কোটি টাকার বেশি রয়েছে। আজকের গণনা শেষে এই অর্থও ব্যাংকে জমা দেওয়া হবে।” তিনি আরও জানান, দান করা স্বর্ণালংকার ও বৈদেশিক মুদ্রা ট্রেজারিতে সংরক্ষণ করা হয় এবং সময়মতো নিলামের মাধ্যমে তা বিক্রি করে মূল তহবিলে যুক্ত করা হয়।
পুলিশ সুপার ড. এস এম ফরহাদ হোসেন জানান, দানবাক্স খোলা থেকে শুরু করে টাকা গণনা ও ব্যাংকে জমা দেওয়া পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। “সারা বছরই দানবাক্সের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়,” বলেন তিনি।
দেশের অন্যতম ঐতিহাসিক এই মসজিদে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ দান করতে আসেন। নগদ টাকার পাশাপাশি স্বর্ণালংকার, বৈদেশিক মুদ্রা এমনকি গবাদিপশু ও নানা সামগ্রীও এখানে দান করা হয়। এই বিপুল দানের অর্থ থেকে জেলার বিভিন্ন মসজিদ, মাদরাসা ও এতিমখানায় অনুদান দেওয়া হয়। পাশাপাশি অসহায় ও জটিল রোগে আক্রান্ত মানুষের চিকিৎসাসহায়তাসহ নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডেও এই অর্থ ব্যয় করা হয়।