বিজয়ের অর্ধশতাব্দী: স্বাধীন রাষ্ট্র, পরাধীন নাগরিক

হক মোঃ ইমদাদুল | প্রকাশ: ৩০ ডিসেম্বর, ২০২৫, ০৩:৪৭ এএম
বিজয়ের অর্ধশতাব্দী: স্বাধীন রাষ্ট্র, পরাধীন নাগরিক
হক মোঃ ইমদাদুল

প্রবাসী নাগরিকের চোখে বাংলাদেশ-স্বাধীনতা আছে, মর্যাদা কোথায়?

দীর্ঘ প্রায় ৪০ বছর পেরিয়ে গেছে। প্রবাস থেকে বসে আমি দেখি বাংলাদেশের বর্তমান চিত্র। চোখের সামনে উঠে আসে এক বাস্তবতা, যা বিদেশিদের সামনে দেখাতে লজ্জা লাগে। আমরা জন্মেছি এমন এক দেশে যেখানে দারিদ্র্য, বৈষম্য ও দুর্নীতির ছাড়া আর কিছু চোখে পড়ে না।

আমাদের সম্মান কোথায়? আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের প্রশ্নের সামনে আমরা কীভাবে দাঁড়াবো?

১৬ ডিসেম্বর-বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গৌরবময় দিন। এই দিনটি কেবল একটি তারিখ নয়; এটি এক জাতির রক্তাক্ত সংগ্রাম, অসীম ত্যাগ এবং অবিচল অঙ্গীকারের প্রতীক। ১৯৭১ সালের এই দিনে বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। বিজয়ের অর্ধশতাব্দী পার হলেও, প্রবাসী চোখে সেই স্বাধীনতার ছাপ আজও অসম্পূর্ণ মনে হয়।

রাষ্ট্র আছে, নাগরিক কোথায়?

রাষ্ট্র আছে, সংবিধান আছে, পতাকা উড়ে-তবু সাধারণ মানুষের জীবনে স্বাধীনতার অনুভূতি কি ততটাই দৃশ্যমান?

“যেখানে নাগরিক নিরাপদ নয়, সেখানে রাষ্ট্রের পতাকা শুধু রঙের খাতা।”

স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হলো তার নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করা। ন্যায়বিচার, আইনের সমতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা-এসব কোনো দান নয়; এগুলো রাষ্ট্রের অঙ্গীকার।

কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। আজকের বাংলাদেশে মানুষ বিচার পেতে ভয় পায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে দ্বিধা করে। রাষ্ট্রীয় সেবা অধিকার নয়-অনুগ্রহ হিসেবে গণ্য হয়।

যখন বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকে,

যখন অপরাধীর পরিচয় বিচারপ্রক্রিয়ার গতি নির্ধারণ করে,

যখন ক্ষমতাবানদের জন্য এক আইন আর সাধারণ মানুষের জন্য আরেক আইন-

তখন স্বাধীনতা ও বাস্তব জীবনের মধ্যে ফাঁক ক্রমেই বাড়ছে।

“আইনের চোখ যদি সব নাগরিকের জন্য সমান না হয়, রাষ্ট্র কেবল নামের মধ্যেই স্বাধীন।”

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং বাস্তবতা

মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল শোষণমুক্ত, বৈষম্যহীন ও মানবিক রাষ্ট্র গড়ার জন্য। কিন্তু আজ সেই রাষ্ট্রে বৈষম্য প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। অর্থনৈতিক ব্যবধান বেড়েছে, সুযোগ বণ্টনে স্বচ্ছতা নেই, যোগ্যতার জায়গায় ঘনিষ্ঠতা ও প্রভাব অগ্রাধিকার পাচ্ছে।

প্রশ্ন আসে-এই রাষ্ট্র কি শহীদদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করছে, নাকি আমরা ধীরে ধীরে সেই স্বপ্ন থেকে সরে যাচ্ছি?

যদি রাষ্ট্র পরিচালনায় নৈতিকতা অনুপস্থিত থাকে,

যদি দুর্নীতি কৌশল হয়ে ওঠে,

তবে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মধ্যে পার্থক্য ক্রমেই অদৃশ্য হয়ে যায়।

“স্বাধীনতা পতাকা নয়; এটি হলো নাগরিকের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।”

কণ্ঠরোধ-রাষ্ট্রকে দুর্বল করে

একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার নাগরিকের কণ্ঠে। কিন্তু আজ মত প্রকাশকে ঝুঁকি হিসেবে দেখা হয়। প্রশ্ন করা অবাধ্যতা এবং সমালোচনা শত্রুতা হিসেবে চিহ্নিত হলে, রাষ্ট্র দুর্বল হয়।

ইতিহাস শেখায়-ভয় দিয়ে শাসন রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করে না। গণতন্ত্র টিকে থাকে প্রশ্ন সহ্য করার ক্ষমতায়, কণ্ঠরোধের সংস্কৃতিতে নয়।

আজকের বাংলাদেশে লক্ষ্য করা যায়:

সাংবাদিকদের উপর হামলা

শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দমন

সরকারি কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতার অভাব

“কণ্ঠরোধে শক্তি নয়; সাহসী নাগরিকের মধ্যেই রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি নিহিত।”

সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা

বাংলাদেশের অনেক মানুষ এখনও মৌলিক চাহিদা থেকে বঞ্চিত। গ্রামীণ অঞ্চলে:

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সুবিধার অভাব

নিরাপদ পানীয় জলের ঘাটতি

দারিদ্র্য ও বৈষম্য

শহরে সমৃদ্ধির ছোঁয়া থাকলেও অভ্যন্তরীণ অসমতা দেশের উন্নয়নকে ব্যাহত করছে।

“একটি জাতি যদি তার মানুষের মর্যাদা ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে না পারে, সাফল্য কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ থাকে।”

আন্তর্জাতিক তুলনা ও শিক্ষা

দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলো দেখলে স্পষ্ট-যেখানে নাগরিকের স্বাধীনতা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত, সেখানে দেশ দ্রুত উন্নয়ন করছে।

সিঙ্গাপুর: সামাজিক নীতি ও স্বচ্ছ প্রশাসনের উদাহরণ

ভিয়েতনাম: নৈতিকতা ও নিয়মে শৃঙ্খলা

মালয়েশিয়া: মানুষের অংশগ্রহণ রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করেছে

বাংলাদেশও পারে। আমাদের প্রয়োজন:

১. রাজনৈতিক সদিচ্ছা

২. সামাজিক সচেতনতা

৩. নাগরিকের সক্রিয় অংশগ্রহণ

“রাষ্ট্র যদি নাগরিককে মর্যাদা দিতে ব্যর্থ হয়, উন্নয়ন কেবল নামের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।”

নাগরিকের শক্তিশালী ভূমিকা

নাগরিকের কণ্ঠ স্বাধীনতার ভিত্তি। যে সমাজে প্রশ্ন করা এবং সমালোচনা গণতান্ত্রিক শক্তি হিসেবে গণ্য হয়, সেই সমাজ প্রকৃতভাবে স্বাধীন।

নাগরিকরা যদি নিজের অধিকার জানে, দুর্নীতি প্রত্যাখ্যান করে, সামাজিক দায়িত্ব পালন করে-রাষ্ট্র শক্তিশালী হয়।

“নাগরিক শক্তিশালী হলে রাষ্ট্র শক্তিশালী হয়; নাগরিক যদি ভয় পায়, স্বাধীনতা কেবল নামমাত্র থাকে।”

দায়িত্ব ও আহ্বান

১৬ ডিসেম্বর কেবল আনুষ্ঠানিক উদযাপনের দিন নয়। এটি আত্মসমালোচনার দিন। রাষ্ট্রের উচিত নিজের দিকে তাকানো-আমরা কি এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে পেরেছি, যেখানে মানুষ ভয় নয়, আস্থা নিয়ে বাঁচে?

করনীয়:

দূর্নীতি নির্মূল

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য নিশ্চিত

মুক্ত মত প্রকাশ রক্ষা

সামাজিক সমতা বজায় রাখা

নীতিবান প্রশাসন

পরবর্তী প্রজন্মের জন্য দায়িত্বশীল নেতৃত্ব

শেষ কথা

এই লেখা কোনো অভিযোগ নয়; এটি প্রবাস থেকে একজন নাগরিকের নির্ভীক পর্যবেক্ষণ ও সতর্কবার্তা। রাষ্ট্র টিকে থাকে কেবল তার সেনাবাহিনী বা প্রশাসনে নয়, টিকে থাকে তার মুক্ত, সচেতন ও মর্যাদাবান নাগরিকের ওপর।


বিজয়ের অর্ধশতাব্দী তখনই পূর্ণতা পাবে,

যখন স্বাধীনতা শুধু ইতিহাসের পাতায় নয়-

মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতায় রূপ নেবে।

নাগরিক যদি ভয়মুক্ত, মর্যাদাবান ও শক্তিশালী হয়,

তখনই এই বিজয় সত্যিকারের অর্থ পাবে।

লেখক: সংগ্রাহক ও গবেষকঃ হক মোঃ ইমদাদুল, জাপান