অর্থনীতি, ন্যায়নীতি, কূটনীতি, রাজনীতি ও দুর্নীতির আয়নায় বাংলাদেশ

পাঁচ নীতির প্রজাতন্ত্র

হক মো: ইমদাদুল | প্রকাশ: ৫ জানুয়ারী, ২০২৬, ০১:১৭ এএম
পাঁচ নীতির প্রজাতন্ত্র
হক মো: ইমদাদুল

প্রস্তাবনা: নদী, স্মৃতি ও সময়

এই দেশে নদী শুধু জল বয়ে আনে না-নদী বয়ে আনে সময়।

যমুনা, পদ্মা, মেঘনার ঢেউয়ে ভেসে আসে শতাব্দীর স্মৃতি, ভুল, আশা আর প্রতিজ্ঞা। পলি জমে যেমন চর ওঠে, তেমনি সময়ের পলিতে জমে ওঠে ইতিহাস। কখনো সে ইতিহাস গর্বের, কখনো লজ্জার, কখনো অশ্রুর-কিন্তু সব সময়ই শিক্ষার।

যে দেশে ভাষার জন্য মানুষ বুক পেতে দিয়েছে,

যে দেশে স্বাধীনতার জন্য তরুণেরা হাসতে হাসতে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছে,

সে দেশ কেবল একটি মানচিত্রে আঁকা ভূখণ্ড নয়-

সে দেশ এক চলমান দর্শন, এক প্রশ্নমুখর সভ্যতা।

২০২৫ সালে বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে এক নীরব কিন্তু গভীর সন্ধিক্ষণে।

এখানে অতীতের শিক্ষা, বর্তমানের সংকট ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনা এক বিন্দুতে এসে মিলেছে। প্রশ্ন উঠছে-আমরা কি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করব, নাকি ইতিহাসকে সংশোধন করব?

অধ্যায় এক: অর্থনীতি - ঘামে ভেজা মেরুদণ্ড

অর্থনীতি কোনো সিংহাসনে বসা রাজা নয়।

সে রাজপথের পাশে বসে থাকা চা-ওয়ালার ক্লান্ত চোখে,

ভোরের আলোয় মাঠে নামা কৃষকের ফাটা হাতে,

কারখানার শব্দে চাপা পড়া শ্রমিকের স্বপ্নে,

আর দূরদেশে প্রবাসে থাকা মানুষের নিঃশব্দ ত্যাগে বাস করে।

নারীর অদৃশ্য শ্রম-যার হিসাব কোনো জিডিপিতে ধরা পড়ে না-

এই অর্থনীতির সবচেয়ে নীরব ভিত্তি।

২০২৫ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতি ক্লান্ত, কিন্তু ভাঙা নয়।

মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের টেবিলকে ছোট করেছে।

চাল, ডাল, তেলের দামের ওঠানামা মধ্যবিত্তের মনে স্থায়ী অনিশ্চয়তা এনেছে।

কর্মসংস্থানের প্রশ্ন তরুণদের মনে অস্থির ঢেউ তুলেছে।

তবু অর্থনীতি ভেঙে পড়েনি।

কারণ সে জানে-এই জাতি সংকটে হাল ছাড়ে না, শুধু পথ বদলায়।

অর্থনীতি নীরবে বলে-

“উন্নয়ন যদি ন্যায়ের সঙ্গে না চলে, তবে তা কেবল সংখ্যার উল্লাস হয়, মানুষের মুক্তি নয়।”

অধ্যায় দুই: ন্যায়নীতি - সবচেয়ে নীরব, সবচেয়ে শক্তিশালী

ন্যায়নীতি উচ্চস্বরে কথা বলে না।

সে শ্লোগান দেয় না, মিছিল করে না।

সে থাকে সংবিধানের অক্ষরে, আদালতের ফাইলের ভাঁজে, আর মানুষের গভীরতম বিবেকের কোণে।

২০২৫ সালে ন্যায়নীতি প্রশ্নের মুখে।

বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা মানুষের আস্থাকে ক্ষয় করে।

ক্ষমতা ও প্রভাবের ভারসাম্যহীনতা ন্যায়ের চোখে কাপড় বেঁধে দেয়।

তবু ন্যায়নীতি জানে-

ইতিহাসের শেষ রায় কখনো তাড়াহুড়ো করে লেখা হয় না।

যে সমাজ প্রশ্ন করতে শেখে, যে নাগরিক অন্যায়কে স্বাভাবিক বলে মেনে নেয় না-

সেখানেই ন্যায় ধীরে ধীরে, কিন্তু স্থায়ীভাবে জায়গা করে নেয়।

ন্যায়নীতি অপেক্ষা করতে জানে, কিন্তু হার মানতে জানে না।

অধ্যায় তিন: কূটনীতি - নীরবতার ভাষা

কূটনীতি হলো রাষ্ট্রের সেই ভাষা,

যা উচ্চারণের চেয়ে ইঙ্গিতে বেশি কথা বলে।

সে জানে কখন শব্দ প্রয়োজন, আর কখন নীরবতাই সবচেয়ে শক্তিশালী বার্তা।

২০২৫ সালে বাংলাদেশের কূটনীতি হাঁটছে সূক্ষ্ম এক দড়ির ওপর।

আঞ্চলিক শক্তির টানাপোড়েন, বৈশ্বিক রাজনীতির মেরুকরণ,

বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও মানবিক স্বার্থ-সবকিছুর মাঝখানে তাকে ভারসাম্য রাখতে হয়।

কূটনীতি মনে করিয়ে দেয়-

“ভিতরের স্থিতি ছাড়া বাইরের মর্যাদা টেকসই হয় না।”

রাষ্ট্র যদি ভেতরে দুর্বল হয়,

তার কূটনৈতিক হাসিও একদিন ফ্যাকাশে হয়ে যায়।

অধ্যায় চার: রাজনীতি - ক্ষমতা না দায়িত্ব?

রাজনীতি আলোয় দাঁড়িয়ে থাকে।

তার প্রতিটি সিদ্ধান্ত শিরোনাম হয়, সমালোচনার বিষয় হয়, বিতর্কের জন্ম দেয়।

২০২৫ সালে রাজনীতি বিভক্ত, উত্তপ্ত, সন্দেহপ্রবণ।

কিন্তু ইতিহাস জানে-সব বড় পরিবর্তনের আগে রাজনীতি অস্থিরই হয়।

প্রশ্নটা সহজ, কিন্তু গভীর-

রাজনীতি কি ন্যায়নীতিকে শক্ত করবে,

নাকি সুবিধার জন্য দুর্নীতির সঙ্গে আপস করবে?

কারণ রাজনীতি চাইলে ইতিহাসের স্রোত ঘুরিয়ে দিতে পারে।

আবার চাইলে ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াতেও পারে।

অধ্যায় পাঁচ: দুর্নীতি - অদৃশ্য শত্রু

দুর্নীতি চিৎকার করে না।

সে ফাঁকে ফাঁকে ঢ়ুকে পড়ে।

ফাইলে, অনুমতিতে, নীরব সমঝোতায় সে নিজের ঘর বানায়।

২০২৫ সালে দুর্নীতি এখনো আছে,

কিন্তু আগের মতো নিশ্চিন্ত নয়।

ডিজিটাল নজরদারি, গণমাধ্যমের অনুসন্ধান,

আর সচেতন নাগরিকের প্রশ্ন-

তার চলাচলের জায়গা সংকুচিত করছে।

দুর্নীতি জানে-

যেদিন সমাজ সম্মিলিতভাবে “না”বলবে,

সেদিন তার অস্তিত্ব টিকবে না।

অধ্যায় ছয়: জনগণ - ইতিহাসের প্রকৃত লেখক

এই পাঁচ নীতির ঊর্ধ্বে রয়েছে আরেকটি শক্তি-জনগণ।

তারাই ভোট দেয়, তারাই কর দেয়, তারাই প্রশ্ন তোলে,

তারাই ইতিহাসের ভার কাঁধে বহন করে।

রাষ্ট্র অনেক সময় ভুল করে,

কিন্তু জনগণ জেগে থাকলে সেই ভুল চূড়ান্ত হয় না।

যে জাতি প্রশ্ন করতে শেখে,

সে জাতি কখনো পুরোপুরি পরাজিত হয় না।

অধ্যায় সাত: ইতিহাসের আয়নায় বাংলাদেশ

বাংলাদেশের ইতিহাস কোনো একরৈখিক বিজয়ের গল্প নয়।

এখানে যেমন সাফল্য এসেছে, তেমনি এসেছে বিভ্রান্তি।

কখনো ন্যায়নীতি এগিয়েছে, কখনো পিছিয়েছে।

১৯৫২, ১৯৬৯, ১৯৭১-

এই তারিখগুলো শুধু সংখ্যা নয়।

এগুলো নৈতিক জাগরণের চিহ্ন।

২০২৫ সালও তেমনই এক সময়-

যেখানে প্রশ্ন উঠছে:

আমরা কি ইতিহাসের শিক্ষা কাজে লাগাব, নাকি ভুলগুলো নতুন নামে ফিরিয়ে আনব?

অধ্যায় আট: তরুণ প্রজন্ম - ভবিষ্যতের নীরব প্রস্তুতি

এই গল্পে তরুণেরা সরাসরি মঞ্চে নেই,

কিন্তু পর্দার আড়ালে তারাই সবচেয়ে সক্রিয়।

তাদের হাতে প্রযুক্তি,

চোখে বিশ্ব,

আর মনে অসংখ্য প্রশ্ন।

কেন চাকরি পেতে পরিচয় লাগে?

কেন মেধা সব সময় যথাযথ মূল্য পায় না?

কেন ন্যায় আসতে দেরি হয়?

এই প্রশ্নগুলোই ভবিষ্যতের বীজ।

যে জাতির তরুণ প্রশ্ন করে, সে জাতি ঘুমিয়ে নেই।

অধ্যায় নয়: গণমাধ্যম ও বিবেক

গণমাধ্যম এই পাঁচ নীতির মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক আয়না।

সে চাইলে সত্য দেখাতে পারে,

আবার চাইলে বিকৃত প্রতিচ্ছবিও তুলে ধরতে পারে।

২০২৫ সালে গণমাধ্যম চাপে-

অর্থনৈতিক চাপ, রাজনৈতিক চাপ, ডিজিটাল বিভ্রান্তির চাপ।

তবু দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা এখনো আশা জাগায়।

কারণ সত্য পুরোপুরি চাপা দিলে,

সে অন্য কোনো পথ দিয়ে বেরিয়ে আসে।

অধ্যায় দশ: দুর্নীতির বিরুদ্ধে নীরব বিপ্লব

দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই সবসময় মিছিল দিয়ে শুরু হয় না।

অনেক সময় তা শুরু হয় ঘরের টেবিলে-

যেদিন একজন নাগরিক ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানায়।

২০২৫ সালে এমন ছোট ছোট সিদ্ধান্তই বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

আইনের প্রয়োগ, ডিজিটাল স্বচ্ছতা, নাগরিক সচেতনতা-

সব মিলিয়ে দুর্নীতির শিকড় নড়বড়ে হচ্ছে।

অধ্যায় এগারো: বিশ্ব প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান

বিশ্ব আজ অস্থির।

যুদ্ধ, মেরুকরণ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা-সব মিলিয়ে সময় কঠিন।

এই বিশ্বে বাংলাদেশ চাইলে হতে পারে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কণ্ঠস্বর।

কিন্তু সে মর্যাদা পাওয়া যায় না শুধু প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানে।

পাওয়া যায় নৈতিক দৃঢ়তায়।

ভিতরের ন্যায়নীতি শক্ত না হলে,

বাইরের সম্মান দীর্ঘস্থায়ী হয় না।

অধ্যায় বারো: গ্রাম থেকে নগর - বৈষম্যের মানচিত্র

এই প্রজাতন্ত্র শুধু রাজধানী দিয়ে গঠিত নয়।

গ্রামের কাঁচা রাস্তা, চরাঞ্চলের অনিশ্চয়তা, পাহাড়ের নিঃসঙ্গতা-

সব মিলিয়েই রাষ্ট্র।

২০২৫ সালে উন্নয়নের মানচিত্র অসম।

কোথাও উঁচু ভবন, কোথাও বিশুদ্ধ পানির সংকট।

এই বৈষম্য অর্থনীতিকে দুর্বল করে,

ন্যায়নীতিকে প্রশ্নের মুখে ফেলে।

অধ্যায় তেরো: নারী - অদৃশ্য অর্থনীতি ও নৈতিক শক্তি

এই গল্পে নারীরা কোনো আলাদা অধ্যায় নয়-

তারা পুরো গল্পের অদৃশ্য চালিকা শক্তি।

তাদের শ্রমে অর্থনীতি টিকে থাকে,

তাদের ধৈর্যে পরিবার টিকে থাকে,

তাদের নীরবতায় সমাজ অনেক সময় ভারসাম্য খুঁজে পায়।

কিন্তু ন্যায়নীতি পূর্ণতা পায় না,

যতদিন অর্ধেক জনগোষ্ঠী সমান মর্যাদা না পায়।

অধ্যায় চৌদ্দ: রাষ্ট্র বনাম সমাজ - কে কাকে গড়ে?

রাষ্ট্র আইন তৈরি করে,

কিন্তু সমাজ তৈরি করে মূল্যবোধ।

২০২৫ সালে এই দুইয়ের টানাপোড়েন স্পষ্ট।

আইন আছে, প্রয়োগ দুর্বল।

নীতিমালা আছে, নৈতিকতা প্রশ্নবিদ্ধ।

এই ফাঁকটুকুতেই দুর্নীতি বাসা বাঁধে।

এই ফাঁক বন্ধ করাই ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় কাজ।

উপসংহার: ভবিষ্যৎ এখনো খোলা

বাংলাদেশের গল্প এখানেই শেষ নয়।

কারণ দেশ কোনো উপন্যাস নয়-

দেশ একটি চলমান অঙ্গীকার।

অর্থনীতি টিকে থাকবে ন্যায়ের হাত ধরে।

রাজনীতি মহৎ হবে দায়িত্ব নিলে।

কূটনীতি শক্ত হবে ভেতর মজবুত হলে।

আর দুর্নীতি হার মানবে সচেতন নাগরিকের কাছে।

শেষ পর্যন্ত ইতিহাস একটি কথাই মনে রাখে-

কারা ন্যায়ের পাশে দাঁড়িয়েছিল, আর কারা নীরবে সরে দাঁড়িয়েছিল।

লেখক: সংগ্রাহক ও গবেষকঃ হক মোঃ ইমদাদুল, জাপান