আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পটুয়াখালী জেলার ৪টি আসনের টক অব দ্য টাউনে অবস্থান করছে পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা-দশমিনা) আসনটি। বর্তমানে জোটবদ্ধ হওয়া ও অভ্যন্তরীন বিরোধের কারণে রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে এই আলোচিত নির্বাচনী এরাকাটি। বিএনপি জোটের মনোনয়ন পেলেও স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের সহযোগিতা না পাওয়ায় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি ও ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুর। তবে ইতোমধ্যেই বিএনপির হাই কমান্ডের নির্দেশে জোটের প্রার্থী নুরকে সমর্থন জানিয়ে ভোট প্রার্থনায় বরিশাল বিভাগীয় নেতৃবৃন্দ প্রচারনা নেমে পড়েছেন পটুয়াখালী ৩ আসনে। দলের চেয়ারম্যান তারেক জিয়ার ওই আসনটিতে আসার গুঞ্জনের খবরে একটু বিপাকেই পড়েছেন কেন্দ্রীয় বিএনপির বহিস্কৃত জনপ্রিয় নেতা হাসান মামুন। এই আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা হাসান মামুন দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে সক্রিয় ছিলেন। তাঁর সাংগঠনিক তৎপরতার কারণে তৃণমূল পর্যায়ে তিনি সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনার শীর্ষে ছিলেন। তবে জাতীয় পর্যায়ে বিএনপির সঙ্গে গণঅধিকার পরিষদের জোট গঠনের সিদ্ধান্ত হলে পটুয়াখালী-৩ আসনটি ছেড়ে দেয় বিএনপি। জোটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আসনটিতে মনোনয়ন পান নুরুল হক নুর (ভিপি নুর)। এ সিদ্ধান্তে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হয়। দলীয় মনোনয়ন না পেলেও হাসান মামুন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করায় তাঁকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হলেও স্থানীয় বিএনপির অধিকাংশ নেতাকর্মী প্রকাশ্যেই তাঁর পক্ষে অবস্থান নেন। ফলে জোটপ্রার্থী নুর স্থানীয় বিএনপির সাংগঠনিক সহযোগিতা কার্যত পাচ্ছেন না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পটুয়াখালী-৩ আসনে বিএনপি ঐতিহাসিকভাবে দুর্বল থাকলেও সামপ্রতিক বছরগুলোতে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটেছে। নব্বইয়ের পর জাতীয় নির্বাচনে দলটির উল্লেখযোগ্য সাফল্য না থাকলেও হাসান মামুনের ধারাবাহিক সাংগঠনিক তৎপরতায় এলাকায় বিএনপির ভিত্তি শক্ত হতে শুরু করে। প্রয়াত বিএনপি নেতা শাহজাহান খানের মৃত্যুর পর স্থানীয় রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব আরও বাড়ে। এতে তৃণমূল পর্যায়ে জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন তিনিই পাবেন এমন প্রত্যাশা দৃঢ় হয়। জাতীয় রাজনীতিতে জোট রাজনীতির অংশ হিসেবে বিএনপির সঙ্গে গণঅধিকার পরিষদ একত্র হয়। গলাচিপা উপজেলার চরবিশ্বাস ইউনিয়নের বাসিন্দা নুরুল হক নুর এই আসনে জোটের মনোনয়ন চাইলে স্থানীয় বিএনপির একাংশ আপত্তি তোলে। তাঁদের অভিযোগ ছিল, এলাকার রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নন এমন একজন প্রার্থী চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তবে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের কারণে শেষ পর্যন্ত আসনটি নুরের জন্য ছেড়ে দেয় বিএনপি। দলীয় প্রতীক ‘ট্রাক’ নিয়ে তিনি নির্বাচনী মাঠে নামেন। অন্যদিকে দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে ২৮ ডিসেম্বর বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য পদ থেকে অব্যাহতি চান হাসান মামুন। পরদিন তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পরও নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াননি তিনি। গলাচিপা ও দশমিনা উপজেলার উপজেলা, পৌর, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের অধিকাংশ বিএনপি নেতাকর্মী তাঁর সঙ্গে মাঠে রয়েছেন। ফলে তাঁর নির্বাচনী প্রচারণা তুলনামূলকভাবে জোরালো বলে জানা গেছে। এই পরিস্থিতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করে নুরুল হক নুর বলেন,“কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে স্থানীয় নেতারা ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতি করছেন। এতে জোট রাজনীতির ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিষয়টি আমি বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বকে জানিয়েছি এবং দ্রুত সমাধান চেয়েছি। এভাবে চললে ভবিষ্যতে জোট রাজনীতিতে জটিলতা আরও বাড়বে।” তবে নুরের এই বক্তব্যকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না স্থানীয় বিএনপি নেতারা। তাঁদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় বিএনপিকে সংগঠিত করেছেন হাসান মামুন। অতীতেও বাইরের প্রার্থী চাপিয়ে দেওয়ার অভিজ্ঞতা নেতিবাচক ফল বয়ে এনেছে। তাই দলীয় সিদ্ধান্ত যাই হোক না কেন, তাঁরা হাসান মামুনের পক্ষেই মাঠে থাকবেন। তাছাড়াও দলের প্রধান সারির নেতারা প্রকাশ্যে না হলেও গোপনে ভোটের মাঠে কাজ করছেন হাসান মামুনের পক্ষে। স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অধ্যাপক শাহ আলম, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মাওলানা আবু বক্কর এবং জোটপ্রার্থী নুরুল হক নুর তিনজনই গলাচিপা উপজেলার বাসিন্দা। এতে গলাচিপা উপজেলায় ভোট বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিপরীতে দশমিনা উপজেলা থেকে একমাত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন হাসান মামুন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এতে সেখানে তিনি তুলনামূলকভাবে বাড়তি সুবিধা পাচ্ছেন। এদিকে গত ১০ জানুয়ারী বিএনপি চেয়ারম্যানের সরাসরি নির্দেশ পেয়ে কেন্দ্রীয় নেত্রী বিলকিস জাহান শিরিন সহ বরিশাল বিভাগ তথা পটুয়াখালী জেলা বিএনপির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ জোট প্রার্থী নুরের পক্ষে ভোট প্রার্থনা প্রচারে জোড়েসোড়ে মাঠে নেমেছেন। এতে করে হাসান মামুনের ব্যক্তি ভোটের ঘর ভেঙ্গে যাওয়ার শংকা করছেন সচেতন ভোটাররা। সব মিলিয়ে তৃণমূল বিএনপির সক্রিয় সমর্থন ও সহযোগিতা ছাড়া পটুয়াখালী-৩ আসনে জোটপ্রার্থী নুরুল হক নুরের জয় অত্যন্ত কঠিন হবে বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ভোটাররা।