রোহিঙ্গা গণহত্যা: আইসিজেতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলার শুনানি শুরু

এফএনএস অনলাইন: | প্রকাশ: ১২ জানুয়ারী, ২০২৬, ০৪:২৪ পিএম
রোহিঙ্গা গণহত্যা: আইসিজেতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলার শুনানি শুরু
ছবি, সংগৃহিত

জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালত মিয়ানমারের বিরুদ্ধে দায়ের করা একটি ঐতিহাসিক মামলার শুনানি শুরু করেছে। মামলাটিতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে দেশটির রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর (প্রধানত মুসলিম) ওপর গণহত্যা চালানোর অভিযোগ আনা হয়েছে। এই শুনানি টানা ৩ সপ্তাহ চলবে। 

আজ সোমবার সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য জানিয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এক দশকেরও বেশি সময় পর আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) সোমবার (১২ জানুয়ারি) এই প্রথম পূর্ণাঙ্গভাবে কোনো গণহত্যার মামলার শুনানি করতে যাচ্ছে। এই মামলার রায় মিয়ানমারের বাইরে অন্যান্য দেশেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযানের বিষয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার দায়ের করা মামলার ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

২০১৯ সালে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আইসিজেতে এই মামলা দায়ের করে। এর দুই বছর আগে ২০১৭ সালে, মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর এক অভিযানে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা নিজ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে প্রতিবেশী বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। রোহিঙ্গা শরণার্থীরা সে সময় ব্যাপক হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনার বর্ণনা দেন। জাতিসংঘের তৎকালীন একটি তথ্য-অনুসন্ধানী মিশন তাদের প্রতিবেদনে জানায়, ২০১৭ সালের ওই সামরিক অভিযানে ‘গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড’ সংঘটিত হয়েছে।

তবে সেই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যানের পর মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ দাবি করে, সেনাবাহিনীর অভিযানটি ছিল ‘সন্ত্রাসবিরোধী একটি বৈধ পদক্ষেপ’, যা কথিত রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলার জবাবে পরিচালিত হয়েছিল।

জাতিসংঘের মিয়ানমার-বিষয়ক স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থার প্রধান নিকোলাস কুমজিয়ান রয়টার্সকে বলেন, 

এই মামলাটি গণহত্যার সংজ্ঞা, তা কীভাবে প্রমাণ করা যায় এবং এর লঙ্ঘনের প্রতিকার কীভাবে নিশ্চিত করা যায় - এসব বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ নজির স্থাপন করতে পারে।

‘নতুন আশা’

মিয়ানমারের বিরুদ্ধে দায়ের করা গণহত্যা মামলা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে বলে আশা করছেন বাংলাদেশের কক্সবাজারে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীরা।

দুই সন্তানের মা, ৩৭ বছর বয়সি জানিফা বেগম বলেন, ‘আমরা ন্যায়বিচার ও শান্তি চাই। জান্তা সেনারা উচ্ছেদ অভিযান শুরু করলে আমাদের নারীরা তাদের সম্মান হারান। তারা গ্রাম পুড়িয়ে দিয়েছে, পুরুষদের হত্যা করেছে, আর নারীরা ব্যাপক সহিংসতার শিকার হয়েছে।’

অন্যরা বলেছেন, আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) রায় বাস্তবায়নের কোনো সরাসরি ক্ষমতা না থাকলেও তারা আশা করছেন, এই মামলা তাদের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনবে।

সাবেক শিক্ষক ও বর্তমানে শরণার্থী সংগঠন ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গার সদস্য ৩৩ বছর বয়সি মোহাম্মদ সাইয়েদ উল্লাহ বলেন, ‘আমি আশা করি, আইসিজে আমাদের বয়ে নিয়ে চলা গভীর ক্ষতগুলোতে কিছুটা হলেও স্বস্তি এনে দেবে।’

তিনি আরও বলেন, অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। বিচার যত দ্রুত ও ন্যায্য হবে, ফলাফল তত ভালো হবে। এরপরই হয়তো প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। 

মিয়ানমারের উইমেনস পিস নেটওয়ার্কের প্রধান ওয়াই ওয়াই নু-এর মতে, এই বিচারের সূচনা ‘রোহিঙ্গাদের জন্য নতুন আশার বার্তা বহন করছে, যেন আমাদের কয়েক দশকের দুর্ভোগের অবসান হতে পারে’। 

তিনি আরও বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে চলমান নিপীড়নের প্রেক্ষাপটে বিশ্বকে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে এবং মিয়ানমারে দায়মুক্তির অবসান ঘটিয়ে আমাদের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথে দৃঢ় থাকতে হবে।’

আইসিজেতে শুরু হওয়া এই শুনানির মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো রোহিঙ্গা ভুক্তভোগীদের বক্তব্য কোনো আন্তর্জাতিক আদালতে শোনা হবে। তবে সংবেদনশীলতা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার কারণে এসব শুনানি জনসাধারণ ও গণমাধ্যমের জন্য বন্ধ থাকবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে