রাজস্ব সংগ্রহে এনবিআরের চ্যালেঞ্জ বাড়ছে

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ১২ জানুয়ারী, ২০২৬, ০৭:৪৩ পিএম
রাজস্ব সংগ্রহে এনবিআরের চ্যালেঞ্জ বাড়ছে

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ২৪ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়েছে সরকার। একই সঙ্গে বাজেটে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ৭ শতাংশ এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। সম্প্রতি উপদেষ্টা পরিষদের সাপ্তাহিক বৈঠকে সংশোধিত বাজেট অনুমোদন দেওয়া হয়। আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট বাস্তবায়ন শুরু হবে। এতে রাজস্ব সংগ্রহে নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড- এনবিআর। যদিও চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আহরণের গতি বেড়েছে। তবে বাড়তি রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম আলম বলেন, জুলাই-অক্টোবর সময়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি ছিল ২৪ দশমিক ১ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬ দশমিক ৪ শতাংশে। এই প্রেক্ষাপটে চলতি অর্থবছরের মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা থেকে ২৪ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে (এনবিআর) থেকে আহরিত হবে ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা, কর-বহির্ভূত রাজস্ব থেকে আসবে ৬৫ হাজার কোটি টাকা এবং এনবিআর-বহির্ভূত অন্যান্য উৎস থেকে সংগ্রহ করা হবে ২০ হাজার কোটি টাকা। প্রেস সচিব বলেন, গত বছরের শেষের দিকে খাদ্য মূল্যস্ফীতি প্রায় ১৪ শতাংশে পৌঁছেছিল। বর্তমানে তা কমে ৭ শতাংশের কাছাকাছি এসেছে। শীতকালে সবজির উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়ায় মূল্যস্ফীতি আরও কমবে বলে সরকার আশা করছে। চলতি অর্থবছর শেষে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশে নামবে এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশ অর্জিত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। সূত্রমতে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) এনবিআর যে পরিমাণ রাজস্ব আদায় করেছে, তা দেশের ইতিহাসে এই সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। এই তিন মাসে মোট রাজস্ব আদায় হয়েছে ৯০ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৫ হাজার ২৭০ কোটি টাকা বেশি। প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ২০ দশমিক ২১ শতাংশ। এই সাফল্য শুধু সংখ্যার দিক থেকে নয়, বরং রাজস্ব প্রশাসনের দক্ষতা, প্রযুক্তিনির্ভরতা এবং করদাতাদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির একটি প্রতিফলনও বটে। এনবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, রাজস্ব আদায়ের এই ঊর্ধ্বগতি প্রমাণ করে যে, সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সম্ভব। সূত্রমতে, প্রথম প্রান্তিকে সবচেয়ে বেশি রাজস্ব এসেছে মূল্য সংযোজন কর (মূসক) খাত থেকে। এই খাতে আদায় হয়েছে ৩৪ হাজার ৮১৯ কোটি টাকা, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৭ হাজার ৯৮১ কোটি টাকা বেশি। প্রবৃদ্ধির হার ২৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ। এনবিআর সূত্র জানায়, ই-ভ্যাট চালু, ই-ইনভয়েসিং বাধ্যতামূলক করা এবং ব্যবসায়িক লেনদেনে স্বচ্ছতা বৃদ্ধির ফলে মূসক আদায়ে এই অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে। এনবিআরের এক সদস্য বলেন, আমরা ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মূসক খাতে স্বয়ংক্রিয়তা এনেছি। ফলে কর ফাঁকি কমেছে এবং করদাতারাও সহজে পরিশোধ করতে পারছেন। তিনি আরও জানান, আগামী মাসগুলোতে আরও বেশি প্রতিষ্ঠানকে ই-ইনভয়েসিংয়ের আওতায় আনা হবে। অন্যদিকে, আয়কর ও ভ্রমণ কর খাত থেকেও এসেছে উল্লেখযোগ্য রাজস্ব। এই খাতে আদায় হয়েছে ২৮ হাজার ৪৭৮ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮ দশমিক ২৬ শতাংশ বেশি। এনবিআরের এক কর্মকর্তা বলছে, করদাতার সংখ্যা বাড়ছে, রিটার্ন দাখিলের হারও বেড়েছে। আমরা কর ফাঁকি রোধে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদার করেছি। তিনি আরও বলেন, আমরা করদাতাদের সঙ্গে অংশীদারত্বের সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাই। কর পরিপালনকে উৎসাহিত করতে এনবিআর নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এদিকে, আমদানি ও রফতানি খাত থেকেও রাজস্ব আদায় বেড়েছে। এই খাতে আদায় হয়েছে ২৭ হাজার ৫২৮ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ১১ দশমিক ৭৪ শতাংশ বেশি। বিশ্লেষকরা বলছেন, ডলার বাজারে আংশিক স্থিতিশীলতা এবং আমদানি কার্যক্রমে স্বাভাবিকতা ফিরে আসায় শুল্ক আদায়ে এই উন্নতি হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রাজস্ব প্রবৃদ্ধির এই ধারা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে সরকারের বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় বড় ধরনের সহায়তা মিলবে। তবে কর পরিপালনের সংস্কৃতি গড়ে না উঠলে বছরের শেষভাগে এই গতি ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। এনবিআর জানিয়েছে, রাজস্ব প্রশাসনের সংস্কার, কর ফাঁকি প্রতিরোধ, করের আওতা বৃদ্ধি এবং মাঠ পর্যায়ে কঠোর তদারকির ফলে এই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে। সংস্থাটি বলছে, রাজস্ব আদায়ের ইতিবাচক ধারাকে আরও বেগবান করতে কর ফাঁকি প্রতিরোধ, কর পরিপালন নিশ্চিতকরণ এবং বকেয়া রাজস্ব পুনরুদ্ধারে কর্মকর্তারা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। এনবিআরের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৫ লাখ কোটি টাকার বেশি। প্রথম প্রান্তিকের এই সাফল্য সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বৈদেশিক বাণিজ্যে বৈচিত্র্য, বিশ্ববাজারে পণ্যমূল্যের ওঠানামা, এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা- এই তিনটি বিষয় রাজস্ব প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রাজস্ব প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি করদাতাদের আস্থা অর্জন এবং কর ব্যবস্থাকে আরও সহজ ও স্বচ্ছ করা এখন সময়ের দাবি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজস্ব সংগ্রহে এই গতি যদি বজায় থাকে, তবে তা শুধু বাজেট বাস্তবায়ন নয়, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের পথেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এনবিআরের এই সাফল্য তাই শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং একটি সম্ভাবনার দিগন্ত- যেখানে রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা ও নাগরিক দায়িত্ববোধ একসঙ্গে এগিয়ে যেতে পারে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে