জাতীয় প্রেসক্লাবের মাওলানা আকরাম খাঁ হলে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির উদ্যোগে বুধবার (২১ জানুয়ারি) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জনগণের শান্তি-স্বস্তি-নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক অধিকারের ইশতেহার উত্থাপন করা হয়। ইশতেহারটি পাঠ করেন গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি সদস্য চলচ্চিত্র নির্মাতা খান, লেখক ও গবেষক মাহতাব উদ্দীন আহমেদ এবং গবেষক ও অ্যাক্টিভিস্ট সুস্মিতা পৃথা। সংবাদ সম্মেলনে সভাপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যায়ের সাবেক অধ্যাপক অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য ডা. হারুন-অর-রশিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়ের শিক্ষক অধ্যাপক সামিনা লুৎফা, নারীনেত্রী সীমা দত্ত প্রমুখ। সভাপ্রধানের বক্তব্যে আনু মুহাম্মদ বলেন, “আমাদের জীবনে শান্তি-স্বস্তি-নিরাপত্তার বড়ই অভাব এখন। আমরা এখানে জাতি-ধর্ম-লিঙ্গ-বিশ্বাস-শ্রেণী-পেশা নির্বিশেষে মানুষের জীবনের শান্তি-স্বস্তি নিরাপত্তার সংকটগুলোকে এখানে চিহ্নিত করতে চেষ্টা করেছি। এজন্যই ইশতেহারটি বিস্তারিত হয়েছে। আমরা আশা করি সামনের নির্বাচনে যারাই নির্বাচিত হবেন তারা এবং রাজনৈতিক দলগুলো ইশতেহারটিকে গুরুত্বের সাথে নেবেন। আমরা চাই সরকারের সকল কাজে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি।” ইশতেহারের ভূমিকায় বলা হয়: “ধরে নেয়া হয় যে রাজনৈতিক দলগুলোই কেবল ইশতেহার দিবে, সর্বত্রই আমরা দেখতে পাই জনগণের যে এজেন্সি, জনগণের যে সার্বভৌমত্ব সেটিকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা। এই চর্চা আমরা জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশনের কাজের মধ্যেও দেখতে পেয়েছি। সরকার মনোযোগ দিয়ে আলাপ শুনল কেবল রাজনৈতিক দলগুলোর, সাধারণ মানুষের মতামত শোনার কোন কার্যকর ব্যবস্থাই ছিল না। অবস্থাটা এমন যেন সাধারণ মানুষের সংস্কার বিষয়ে, দেশ পরিচালনা বিষয়ে কোন বক্তব্য থাকতে পারে না! তাদের কাজ কেবল রাজনৈতিক দলগুলোকে অনুসরণ করা! অথচ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে এদেশের মানুষ কেবল আওয়ামী লীগ সরকারকেই উচ্ছেদ করেনি, তাদের মনোজগতে পুরনো ধাঁচের রাজনীতির উচ্ছেদের আকাঙ্খাও ছিল।” বিস্তারিত ইশতেহারটিকে সংযুক্তিতে দেয়া হল।
২৫ দফার ইশতেহারটিতে প্রতিটি দফার অধীনে নানান উপধারা রয়েছে। সংক্ষেপে ইশতেহারটি নিম্নরূপ:
১. জুলাই গণঅভ্যুত্থানসহ সকল গণঅভ্যুত্থান ও মুক্তিযুদ্ধকে জনগণের দখলে ফেরত আনা:
জুলাইয়ে অভ্যুত্থানকারী শহীদ ও আহত এবং হামলাকারী পক্ষের নিহত ও আহতের তালিকা চূড়ান্ত করা। জুলাই গণঅভ্যুত্থানকারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং একই সাথে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেয়াকে ব্যবহার করে যেকোনরকম তদবির, দুর্নীতি, ক্ষমতা প্রদর্শনকে আইন করে নিষিদ্ধ করতে হবে। ৩ বছরের মধ্যে জুলাই গণহত্যার পূর্ণাঙ্গ বিচারকাজ সমাপ্ত করা। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ঘটা প্রতিটি মব সন্ত্রাস ও হামলার বিচার, ওসমান হাদী, দীপু চন্দ্র দাশ, আয়েশাসহ সকল খুনের বিচার। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান ও ফুলবাড়ীর গণঅভ্যুত্থানের শহীদ ও গুরুতর আহতদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান। ফুলবাড়ী গণঅভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ আমলে করা মিথ্যা হয়রানিমূলক মামলা ৩ মাসের মধ্যে বাতিল করার ব্যবস্থা করতে হবে। মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপত্তা দান, ৭১ সালের চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী/মানবতাবিরোধী অপরাধ করা রাজাকারদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করা। সেই সাথে ৭১ এবং ২৪ এর জন্য যথাক্রমে জামায়াতে ইসলামী ও আওয়ামী লীগকে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করতে হবে। তবে তাদের অপরাধী সদস্যদের বিচার আইন মোতাবেক চলবে।
২. জননিরাপত্তা ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও জবাবদিহি এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান
সংস্কার কমিশনে থাকা সুপারিশের বাস্তবায়ন করতে হবে। ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে সংঘটিত পর পর তিনটি গুম কিংবা বিচারবহির্ভুত হত্যাকাণ্ড ঘটামাত্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীকে বরখাস্ত করার বিধান। কোন এলাকায় এক বছরে ৩টির অধিক কোন খুন/ ধর্ষণ এর ঘটনায় যদি পুলিশ সেই অপরাধীকে ধরতে ব্যর্থ হয় তাহলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই থানার ওসিকে প্রত্যাহার করার বিধান। বিচার বিভাগে বিচারক কর্তৃক রিমান্ডে পাঠানো, জামিনযোগ্য মামলায় জামিন না দেয়া এবং যেকোন মামলার রায় প্রদান বিষয়ক প্রতিটি বিচারকাজের ভিডিও রেকর্ড সংরক্ষণ ও সেটি জনগণের জন্য অনলাইনে উন্মুক্ত করার বিধান রাখা। বাংলা ভাষায় বিচারের রায় ও সহজবোধ্য ভাষায় আইনের ভাষ্য প্রণয়ন করা। নিম্ন আদালতের কোন বিচারকের দেয়া পর পর ৩টি রায় যদি উচ্চ আদালতে সম্পূর্ণ ভ্রান্ত প্রমাণিত হয় তাহলে সেই বিচারককে অপসারণ করার বিধান রাখা। র্যাবকে বিলুপ্ত করা এবং অন্যান্য বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণে আনা এবং অন্তত সকল আলোচিত হত্যাকাণ্ডের বিচার।
৩. নির্বাচনে দাঁড়ানো, প্রচার বৈষম্য দূরীকরণ ও প্রার্থীকে পছন্দ না করার গণতান্ত্রিক অধিকার
শূন্য জামানতের বিধান। স্বতন্ত্র ও দলীয় প্রার্থীর মধ্যেকার বৈষম্য দূর। নির্বাচনে টাকার খেলার উপর নিয়ন্ত্রণ আনতে কোন প্রার্থীই পোস্টার, বিলবোর্ড, নির্বাচনী সভা, শোডাউন ইত্যাদি সহযোগে কোন প্রচার চালাতে পারবে না এমন বিধান করা। তবে প্রার্থীরা অনধিক ১০ জন সাথে নিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে মুখে মুখে কিংবা লিফলেট সহযোগে নির্বাচনী প্রচার চালাতে পারবেন। সকলের জন্য সমান প্রচারের সুযোগ নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে প্রতিটি আসনে চারটি করে নির্বাচনী প্রচারের সমাবেশ পরিচালিত করা, প্রথমটি প্রার্থীদের পরিচিতির জন্য, দ্বিতীয়টি প্রার্থীদের ইশতেহার তুলে ধরার জন্য, তৃতীয়টি প্রার্থীদের মধ্যে বিতর্ক আয়োজনের জন্য এবং চতুর্থটি প্রার্থীদের মধ্যে যুক্তিখন্ডন তুলে ধরার জন্য। এসব অনুষ্ঠানে সকল প্রার্থীর জন্য সমান সময় বরাদ্দ রাখা। সকল প্রার্থীর ইশতেহার ও ভিডিও বক্তৃতা তুলে ধরতে আলাদা করে একটা নির্বাচন টিভি চ্যানেল, ইউটিউব চ্যানেল ও ফেসবুক পেইজ এবং একটা সরকারি ওয়েবসাইট খোলার ব্যবস্থা করা। অপরাধী, বিদেশে বসবাসকারী, ঋণখেলাপী কিংবা দ্বৈত নাগরিকদের নির্বাচনে প্রার্থীতা না পাওয়া নিশ্চিত করা। প্রার্থী ১ জন হোক কি ১০০ জন, সকল আসনে ‘না ভোটের’ ব্যবস্থা যুক্ত করা যাতে পছন্দনীয় কাউকে না পেলে না ভোট দেবার সুযোগ থাকে।
৪. বাজেটের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও ন্যায্যতা:
বাজেটের পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয়ের বিস্তারিত হিসাব না দেয়ার স্বৈরাচারী ও অস্বচ্ছ জবাবদিহিহীন চর্চা নির্বাচিত সরকারের ১ম বাজেট থেকেই বন্ধ করতে হবে। জনগণের সামনে প্রতিটি পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয়ের বিস্তারিত আদ্যোপান্ত হিসেব সরকারকে দাখিল করতে হবে। টেন্ডার পাস হওয়ার পর প্রতিটি উন্নয়ন প্রকল্পের ডিটেইল প্রজেক্ট প্ল্যান বা ডিপিপি সরকারকে উন্মুক্ত করতে হবে। ফিজিবিলিটি স্টাডি ছাড়া উন্নয়ন প্রকল্প নেয়া বন্ধ। শত কোটি টাকার উপরের যেকোন উন্নয়ন প্রকল্পের বেলায় স্থানীয় জনগণ ও স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের মতামত নেয়ার বাধ্যবাধকতা। কী উন্নয়ন হচ্ছে সেটা বিস্তারিত জানার ক্ষেত্রে এলাকাবাসীর অধিকার। জনপ্রশাসন খাত, প্রতিরক্ষা খাত এবং জননিরাপত্তা খাতে অপ্রয়োজনীয় বিশাল ব্যয় বৃদ্ধির চর্চা বন্ধ করতে হবে। বাজেটে সর্বোচ্চ গুরুত্ব সবসময়ই শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, খাদ্য এবং শ্রম খাত পাবে এই বিধান চালু করা। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির কমপক্ষে ৫ শতাংশ করে বরাদ্দ রাখার বাধ্যবাধকতা তৈরি। পরোক্ষ করের পরিমাণ কমিয়ে বাজেটের আয়ের সিংহভাগ প্রত্যক্ষ আয়কর থেকে সংগ্রহ করার বিধান তৈরি। বিভিন্ন খাতের ব্যয়কে সামাজিক নিরাপত্তা খাতের নামে চালানোর তামাশা বন্ধ করে প্রকৃতই সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় বৃদ্ধি করা।
৫. অর্থনীতির নিরাপত্তা:
আর্থিক খাতের অপরাধীদের বিচার ও পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনা। কোনো কোনো শিল্পমালিকদের অযৌক্তিক অপ্রয়োজনীয় সুবিধা দেয়া বন্ধ করতে হবে। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে দলীয় নিয়োগ বন্ধ করা। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফসহ অর্থযোগানদাতা সংস্থার কর্মকাণ্ড নিয়ে স্বাধীন তদন্ত কমিশন। এসব আন্তর্জাতিক সংস্থার জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং এইসব আন্তর্জাতিক সংস্থার উপর নির্ভরশীল অর্থনৈতিক কাঠামো পরিবর্তন করার কাজ শুরু করা। কার্যকর গণশুনানি ছাড়া তেল, গ্যাস, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি বন্ধ করা। ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসীরা যাতে আরও বেশি করে রেমিট্যান্স পাঠাতে পারে সেজন্য প্রয়োজনীয় প্রণোদনা দেয়ার ব্যবস্থা সরকারকে করতে হবে।
৬. সমন্বিত প্যাকেজে কৃষক, পোল্ট্রি খামারি, মৎস্যচাষী ও জেলে এবং ভোক্তাদের শান্তি-স্বস্তি-নিরাপত্তা নিশ্চিতের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনীতির মেরুদণ্ড জোরদারকরণ:
প্রতি ইউনিয়নে ন্যায্য মূল্যে ফসল, ডিম, মাছমুরগী সংগ্রহে সরকারি সুপারসেন্টার। ভোক্তার জন্য প্রত্যেক স্থানীয় কাঁচাবাজারে ন্যায্য মূল্যের সরকারি সুপারস্টোর। লাভজনকভাবে সুপারসেন্টার ও সুপারস্টোর চালিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি। প্রত্যেক জেলায় হিমাগার। প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে কৃষি ও প্রাণীজ সম্পদ উৎপাদনে বিশেষ প্রণোদনা ও ভর্তুকি। সহজ কৃষি ঋণ। কৃষি জমির অকৃষি ব্যবহার বন্ধ। পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যবান্ধব কৃষি, পোল্ট্রি ও মৎস্য চাষের জন্য বিকল্প জাতীয় মহাপরিকল্পনা। নদী/হাওরের মাছে রেশনিং, সকলের অধিকার ঘোষণা। নদী কিংবা হাওড়ে মাছ ধরার জন্য কোন ধরনের ইজারা দেয়া চলবে না। প্রতিটি বাজারে এমন ব্যবস্থা রাখা যাতে কেউ চাইলে ১ টুকরো মাছ কিংবা ১ টুকরো মুরগীর মাংসও কিনতে পারে। স্বাধীন খাদ্য মাননিয়ন্ত্রণ কমিশন গঠন করা।
৭. প্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক ও কর্মজীবীদের শান্তি-স্বস্তি-নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক অধিকার
ন্যূনতম জাতীয় মজুরী ও ন্যূনতম বেকার ভাতা চালু করতে হবে। প্রতি মাসের ৫ তারিখের মধ্যে বেতন পরিশোধের আইনী বাধ্যবাধকতা। বকেয়া বেতন পরিশোধে মালিকদের অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে রিভলভিং ফান্ড গঠন। অবাধ ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার। শিল্প পুলিশ বাতিল করা। কলকারখানা পরিদর্শন অধিপ্তরকে (ডিআইএফই) প্রয়োজনীয় লোকবল ও বাজেট দেয়া। কর্মস্থলে দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে এক জীবন আয়ের সমপরিমাণ অর্থ ক্ষতিপূরণ। নারী ও পুরুষের মজুরী বৈষম্য দূর করতে আইনী ব্যবস্থা। বিভিন্ন সেক্টরভিত্তিক শ্রমিকের মজুরী বৈষম্য কমিয়ে আনা। অনগ্রসর জাতিসমূহের জন্য সরকারি চাকরিতে ৫% কোটা এবং বিভিন্ন লিঙ্গীয় বৈচিত্র্যের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য অন্তত ২ শতাংশ কোটা বহাল রাখা। সরকারি প্রতিষ্ঠানে আউটসোর্সিং এর মাধ্যমে নিয়োগ বন্ধ করা।
৮. অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের ন্যূনতম নিরাপত্তা
অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদেরকেও পর্যায়ক্রমে চুক্তিপত্রের ভিত্তিতে কাজ করার ব্যবস্থা তৈরি। তাদের জন্যও সাপ্তাহিক ছুটি প্রদানের ব্যবস্থা থাকতে হবে। বিভিন্ন অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জন্যও সরকারকে পর্যায়ক্রমে সেক্টর ভিত্তিক নূন্যতম মজুরী ঘোষনা করতে হবে।
৯. ফ্রিল্যান্সারদের ন্যূনতম নিরাপত্তা
অনলাইন প্লাটফর্মে কাজ করছে যারা তাদের গিগ শ্রমিক বা প্লাটফর্ম শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে প্রয়োজনীয় বিধিমালা প্রনয়ণ/হালনাগাদ করা। ফ্রিল্যান্সারদের উপর জোর করে সোর্স ট্যাক্স কাটার বিধান বাতিল করা। গিগ প্লাটফর্মগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনা।
১০. প্রবাসী শ্রমিকের ন্যূনতম শান্তি-স্বস্তি-নিরাপত্তা
মানব পাচার, শ্রমিক নির্যাতন, বিশেষত নারী শ্রমিকেরা যেভাবে নিপীড়ন ও নির্যাতনের শিকার হন তার বিরুদ্ধে শক্ত কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে হবে, এজন্য বিশেষায়িত সেল গঠন করা। প্রবাসী শ্রমিকেরা মারা গেলে তাদের লাশ দেশে আনতে যে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার মুখোমুখি হতে হয় তার পরিবারাকে, সেটার অবসান। এয়ারপোর্টে প্রবাসী শ্রমিকদের ভোগান্তি দূর করা।
১১. দেশীয় শিল্পভিত্তি ও ব্যবসায়ী এবং হকার, টং দোকান, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের নিরাপত্তা
চাঁদাবাজি বন্ধ করা। দেশীয় শিল্পখাতের বিকাশের জন্য কৃষিভিত্তিক শিল্পগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে অবিলম্বে বন্ধ হওয়া রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল, চিনিকলগুলোকে সঠিক পরিকল্পনার আলোকে চালু করার উদ্যোগ নিতে হবে। বিভিন্ন দেশীয় শিল্পে যেগুলোতে বাংলাদেশের তুলনামূলক সুবিধা আছে সেগুলোতে প্রণোদনা দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। পাটকল, চালকল, চিনিকল, ইস্পাত কারখানা, চামড়াজাত শিল্প, আইটি শিল্প, পরিবহন শিল্প এবং ওষুধের কারখানার বিস্তৃত শিল্পভিত্তি গড়ে তোলার ব্যবস্থা করতে হবে। শহরগুলোতে থাকা ভাসমান বা অস্থায়ী হকার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, টং দোকানদারকে চাঁদাবাজী ও নিপীড়নের হাত থেকে বাঁচাতে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও বৈধতা দিতে হবে। তবে প্রতিটি এলাকায় হকারদের রাস্তায় বসার ক্ষেত্রে এলাকাভিত্তিক একটা পরিকল্পনা করে দিতে হবে।
১২. শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের শান্তি-স্বস্তি-নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক অধিকার:
প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি, এমপি, আমলা, সরকারি চাকরিজীবীর সন্তানের জন্য বাধ্যতামূলক সরকারি বিদ্যালয়। জনমুখী শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটা স্বাধীন শিক্ষা কমিশন গঠন করে সর্বজনের মতামতের ভিত্তিতে সকল জাতি, গোষ্ঠী, ধর্ম, বর্ণ, তরিকা, বিশ্বাস, লিঙ্গীয় পরিচয় বিবেচনায় রেখে অন্তর্ভুক্তিমুলক বৈষম্যহীন শিক্ষাব্যবস্থার মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা। মাতৃভাষায় শিক্ষা। প্রতি ৩০০ জন শিক্ষার্থীর জন্য ১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা তৈরি করা। মানসম্পন্ন মেধাবী শিক্ষক পেতে নতুন স্কিমে কঠোর পরীক্ষা নিয়ে আকর্ষণীয় বেতন দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে যাতে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকতা পেশাগতভাবে একটি অন্যতম শীর্ষস্থানীয় চাকুরীতে পরিণত হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে – প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে মিড ডে মিল চালু করা। প্রতিটি ক্যাম্পাসে সন্ত্রাস, দখলদারিত্ব বন্ধ ও শিক্ষার মানোন্নয়ন বিষয়ক ক্যাম্পাস চার্টার ঘোষণা করতে হবে। সকল উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতি বছর শিক্ষার্থী সংসদ নির্বাচন দিতে হবে। উচ্চশিক্ষার ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতির আমূল সংস্কার করে সেখানে যাতে মুখস্তবিদ্যা দিয়ে কোন সুবিধা না করা যায় সেই ব্যবস্থা করা। এক বছরের মধ্যে অবসরপ্রাপ্ত স্কুল ও কলেজ শিক্ষকদের পেনশন ও অন্যান্য বকেয়া পরিশোধ।
১৩. চিকিৎসার নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার স্বাধীনতা:
সরকারি হাসপাতালের মানোন্নয়ন ঘটাতে প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি, মন্ত্রী-এমপি, সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য বাধ্যতামূলকভাবে সরকারি হাসপাতাল ব্যবহার করার বিধান তৈরি। গ্রামাঞ্চলের সকল স্থানীয় বাজার এবং শহরের সকল ওয়ার্ডের স্থানীয় বাজারগুলোতে সুলভে ওষুধ কেনার জন্য সরকারি ওষুধের দোকান। ইউজার্স ফি বাতিল করে সরকারি হাসপাতালগুলোতে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসা ও বাজারে পাওয়া যায় এমন সকল ওষুধ বিনামূল্যে দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারি হাসপাতালের জন্য স্বাধীন তদারকি দল। হাসপাতালে ওষুধ কোম্পানীর প্রতিনিধি নিষিদ্ধ করা। সরকারি হাসপাতালের ১ কিলোমিটারের মধ্যে অন্য কোন প্রাইভেট হাসপাতাল/ডায়াগনস্টিক সেন্টার/ক্লিনিক গড়ে তোলা যাবে না এই নিয়ম করা। পর্যায়ক্রমে প্রতিটি জেলায় ১টি করে ৫০০ শয্যবিশিষ্ট হাসপাতাল, ১টি কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টার এবং ১টি হৃদরোগ চিকিৎসা কেন্দ্র তৈরি করতে হবে। সারাদেশে বিদ্যমান কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোকে জনচিকিৎসায় কার্যকর করতে এগুলোতে পর্যাপ্ত লোকবল, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধ সরবরাহ করতে হবে। প্রতিটি কমিউনিটি ক্লিনিকে সাপে-কাটা রোগীর জন্য পর্যাপ্ত এন্টিভেনোমের মজুদ রাখতে হবে। দেশের প্রতিটি শহরের বড় রাস্তায় প্রতি ১ কিলোমিটার অন্তর অপচয় প্রতিরোধী প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিনামূল্যে নিরাপদ খাবারপানি সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। দেশের প্রতিটি শহরের বড় রাস্তায় প্রতি ১ কিলোমিটার অন্তর বিনামূল্যে পাবলিক টয়লেটের ব্যবস্থা করতে হবে।
১৪. প্রাণ-প্রকৃতি ও পরিবেশের নিরাপত্তা
প্রাণ-প্রকৃতিবিরোধী সকল প্রকল্প বাতিল করতে হবে। এলাকায় এলাকায় নদী-খাল-জলাশয় সুরক্ষা কমিটি গঠন। জলাশয় দূষণ ঠেকাতে ব্যর্থ ওসির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা। সাকার ফিশ নিয়ন্ত্রণ টাস্কফোর্স। স্যাটেলাইট চিত্রের মাধ্যমে বনের তদারকি। বিদেশী আগ্রাসী প্র্রজাতির গাছ লাগানো বন্ধ। শহরের রাস্তায় ফলের গাছ লাগানো। বায়ুদূষণ ঠেকাতে প্রতিটি ইটভাটায় দূষণরোধী প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। সরকারী প্রতিটি নির্মাণকাজে ধূলা নিয়ন্ত্রণের বাধ্যবাধকতা চালু করতে হবে। শহরতলিতে ময়লার ভাগাড়ে ময়লা পোড়ানো অনতিবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। ময়লার ডাম্পিং স্টেশনগুলোকে অনতিবিলম্বে ওয়েস্ট টু পাওয়ার প্রযুক্তিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত করতে হবে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে, গৃহস্থালী বর্জ্য সংগ্রহের সময় সেগুলোকে তিন ক্যাটাগরিতে বর্জ্য জমা ও সংগ্রহের ব্যবস্থা তৈরি করতে হব। মাইকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ। রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং করে ভূগর্ভের পানির স্তর ঠিক করা। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া ঠেকাতে গ্রাম, পাহাড় ও শহর সর্বত্র রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং এর নানান পদ্ধতি ব্যবহার করে বৃষ্টির পানিকে মাটির নিচের অ্যাকুইফারে বা ভূগর্ভস্থ পানির স্তরে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। পাহাড়ে কারা কতখানি জমি অধিগ্রহণ করেছে, পরিবেশ ধ্বংস করেছে তার শ্বেতপত্র প্রকাশ করতে হবে।
১৫. বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের নিরাপত্তা
রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ। রামপাল, রূপপুরসহ প্রাণ-প্রকৃতি এবং জননিরাপত্তাকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলে এমন সকল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে বাতিল করতে হবে। এক্ষেত্রে ইতোমধ্যে চালু হওয়া প্রকল্পের ক্ষেত্রে ফেইজ আউট প্ল্যান করতে হবে। ফুলবাড়ী চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে। এসকল প্রকল্পে দায়মুক্তির যে বিধান রয়েছে সেটাকে বাতিল করতে হবে। আদানিসহ বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তি বাতিল করতে হবে। বিদেশী ঋণনির্ভর, আমদানি নির্ভর, বিদেশী কোম্পানি নির্ভর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মহাপরিকল্পনা বাতিল করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও গ্যাস নির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন। বাপেক্সের মাধ্যমে জরুরি ভিত্তিতে গ্যাস অনুসন্ধান ও আহরণের ব্যবস্থা করতে হবে। সকল প্রকার অনিয়ম ও দুর্নীতির সাথে জড়িত জ্বালানি অপরাধীদেরকে বিচারের আওতায় আনতে হবে। মার্কেটে বিদ্যুৎ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ। জ্বালানী দক্ষ ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ীভাবে সকল সরকারি, আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান এবং কলকারখানাসমূহকে পরিচালনা করার ব্যবস্থা করতে হবে। এক্ষেত্রে সরকার যে জ্বালানি ব্যবস্থাপক ও জ্বালানি নিরীক্ষক তৈরি করার উদ্যোগ নিয়েছে সেটাকে আরও জোরদার করতে হবে।
১৬. নিরাপদ সড়ক:
দেশের সকল মহাসড়কে সড়ক বিভাজক বসানো। প্রতিটি দূরপাল্লার যানবাহনে জিপিএস ট্র্যাকিং সিস্টেম, স্পিড মনিটরিং মেকানিজম বসাতে হবে, যাতে কোন চালকের পক্ষে চাইলেও নির্ধারিত গতিসীমার বেশি গতিতে যানবাহন চালানো, কিংবা উল্টোপথে গাড়ি চালানো সম্ভব না হয়। মোটরসাইকেল ও অটোরিকশার গতি নিয়ন্ত্রণের প্রযুক্তির ব্যবহার। বাস ও ট্রাক ড্রাইভারদের বেতনভুক্ত স্থায়ী কর্মচারী হিসেবে নিয়োগ। সড়কের যানচলাচল তদারকির চেকপোস্ট বসানোর মাধ্যমে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। ভিআইপি রোডের অবসান। ৩ মাসের মধ্যে রাস্তা ফুটপাত ঠিক করা। শহরের যেকোন এলাকায় কোন সরকারি সংস্থা কোন কাজের জন্য রাস্তা খুঁড়লে সেই রাস্তা কাজ শেষ হওয়ার মাত্র ২ দিনের মাথায় আগের রূপে ফিরিয়ে দিতে হবে এমন বিধান করতে হবে।
১৭. বাকস্বাধীনতার নিরাপত্তা
কেবল যেকোন মাধ্যমে মত প্রকাশের জন্য কিংবা স্রেফ কথার জন্য – সেটি উক্তি হোক কিংবা কটুক্তি, কাউকে গ্রেফতার/ কারো উপর হামলা হয়রানি করা চলবে না এই মর্মে ‘কথা সুরক্ষা আইন’ প্রণয়ণ করত হবে সরকারকে। তবে কাউকে হামলার হুমকি, হত্যা করার আহ্বান জানালে আইনী ব্যবস্থা নিতে হবে। সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট, ৭৪ এর বিশেষ ক্ষমতা আইন, শ্রমিক পরিষেবা বিলসহ মতপ্রকাশের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী নিবর্তনমূলক সকল আইন বাতিল করতে হবে। মতপ্রকাশ, সভা-সমাবেশ-মিছিল, বিক্ষোভ-ধর্মঘট, মিডিয়ার স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।
১৮. জনগণের স্বার্বভৌমত্বের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক
ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, পাকিস্তান, তুরস্ক, সৌদিআরব, ইইউ ও জাপানের সাথে সম্পাদিত সকল সামরিক-বেসামরিক চুক্তি প্রকাশ করতে হবে। গোপন চুক্তি করার বিধান বাতিল করতে হবে। জনস্বার্থবিরোধী ও অসম চুক্তিগুলো বাতিল করতে হবে। সীমান্ত হত্যা বন্ধ করতে কার্যকর কূটনৈতিক ও অন্যান্য উদ্যোগ নিতে হবে। ভারত ও চীনের কাছ থেকে আন্তর্জাতিক পানি বন্টনে বাংলাদেশের হিস্যা বুঝে পেতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বিশ্বের সকল স্থানে জলবায়ু সংকট তৈরিতে উন্নত বিশ্বের ভূমিকার বিরুদ্ধে সরব হতে হবে। ফিলিস্তিন, ইয়েমেন, সুদান, ভেনেজুয়েলাসহ বিশ্বের সকল স্থানে আগ্রাসন, যুদ্ধ, নিপীড়ন, গণহত্যা ও দখলদারিত্বের বিরোধিতা করতে হবে।
১৯. ভূমিকম্প, অগ্নি দুর্ঘটনার ক্ষয়ক্ষতি কমানো এবং আবাসনের নিরাপত্তা
বাড়িভাড়া আইনকে নবায়ন করে এর কঠোর বাস্তবায়ন করতে হবে। পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে কোন গৃহহীন মানুষকে রাস্তা, রেলস্টেশন, বাসস্টপেজ, বস্তি বা ফুটপাত থেকে উচ্ছেদ করা যাবে না এই মর্মে আইন প্রণয়ন করতে হবে। ঢাকাসহ দেশের সব শহরের ভবনগুলোর ভূমিকম্প সহনীয়তা পরীক্ষা করে ঝুঁকিপূর্ণ ভবণগুলোকে সম্ভব হলে নিরাপদ করে তোলার ব্যবস্থা করতে হবে নয়তো ভেঙে ফেলার ব্যবস্থা করতে হবে। ঢাকা শহরে সরু গলিতে ৫ তলার অধিক উচ্চ ভবন নির্মাণের অনুমতি বাতিল করতে হবে। আবাসিক ভবনের নিচে কেমিকেলের গুদাম কিংবা সিলিন্ডারের গুদাম স্থাপনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
২০. বিনোদনের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা
মাঠ-পার্ক পর্যটনস্পটসহ সকল জনপরিসরে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মানুষ যাতে দিনে কিংবা রাতে যেকোন সময় যেতে পারেন সেই জন্য এসকল স্থানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে। সকল স্থানে কেউ কোন আইন মোতাবেক অপরাধ না করা পর্যন্ত কাউকেই কোন প্রকার মরাল পুলিশিং এর শিকার যাতে না হতে হয় সেই নিশ্চয়তাও সরকারকে দিতে হবে। প্রতিটি শহরে বেদখল হওয়া সকল জনপরিসরকে সরকারের পুনরুদ্ধার করতে হবে নির্বাচিত হওয়ার ১ বছরের মধ্যে। খেলার মাঠগুলোতে নারীদের খেলাধূলা করার জন্য আলাদা করে সময় নিশ্চিত করতে হবে। যেহেতু বর্তমানে ইন্টারনেট বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম, তাই মোবাইল ডাটার নূণ্যতম মেয়াদ অন্তত ১ বছর করতে হবে।
২১. সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক অধিকার
সারাদেশের সব ধরনের গানের অনুষ্ঠান, নাচের অনুষ্ঠান, কনসার্ট, আর্ট ক্যাম্প, ওরস, কীর্তন, মেলা, মাজার, দরবারশরীফ ও মিলাদ মাহফিলের নিরাপত্তা এবং সেইসাথে সংস্কৃতি কর্মী ও মাজার-দরবারের সদস্যদের নিরাপত্তা সরকারকে দিতে হবে। এসকল কর্মকাণ্ডে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠী কর্তৃক যতগুলো হামলা হয়েছে তার প্রতিটি ক্ষেত্রে হামলাকারী, হামলা হুকুমদাতা ও পরিকল্পনাকারীদের ধরে ধরে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে নির্বাচিত সরকারকে। সকল অঞ্চলের শিল্পকলা একাডেমিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাংষ্কৃতিক তৎপরতার উদ্যোগ বাড়াতে হবে। স্কুলে বাদ্যযন্ত্র, সঙ্গীত ও ছবি আঁকার শিক্ষক ও সরঞ্জাম। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে ইউনিয়ন/ওয়ার্ড পর্যায়ে পাঠাগার স্থাপন।
২২. আদিবাসীদের শান্তি-স্বস্তি-নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক অধিকার
পার্বত্য চট্টগ্রামে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে সেখান থেকে সেনাশাসন প্রত্যাহারের রোডম্যাপ ঘোষণা করতে হবে। সেনাশাসন প্রত্যাহার মানে সেনাবাহিনীর সেনানিবাস প্রত্যাহার নয়। পাহাড়ে সংঘটিত সাম্প্রতিক হামলা অগ্নিসংযোগসহ সকল খুন অপহরণ হয়রানির বিচার হতে হবে। পাহাড় ও সমতলের প্রতিটি জাতিসত্তার সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করতে হবে এবং তাদের ভূমি সমস্যার সমধানের জন্য কাজ শুরু করতে হবে। বিনা বিচারে প্রায় সাড়ে ছয়শো দিন ধরে আটক নিরীহ বম নাগরিকদের অনতিবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে।
২৩. নারীদের শান্তি-স্বস্তি-নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক অধিকার
সম্পত্তিতে সমান অধিকার পাওয়ার সর্বজনীন সুযোগ রাখা। তবে কেউ যদি ধর্মীয় আইনের আওতায় থাকতে চায় তাহলে তার জন্য সেই সুযোগও রাখা। সকল প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক অরাজনৈতিক সংগঠনে হাইকোর্টের নির্দেশনা মোতবেক যৌন নিপীড়ন বিরোধী নীতিমালা কার্যকর করা। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনালে ১৮০ দিনের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির প্রজ্ঞাপন জারি করা, এই ট্রাইবুনালে বিচারকের সংখ্যা বাড়ানো। ভুক্তভোগীবান্ধব সাপোর্ট ও ক্রাইসিস সেন্টার। সকল বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, কলকারখানায় মাতৃত্বকালীন ৬ মাসের ছুটি নিশ্চিত করা। মাসিক চলাকালীন ২ দিনের ঐচ্ছিক ছুটি নিতে পারার সুযোগ। সকল সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, কলকারখানায় কার্যকর ডে কেয়ার সিস্টেম। সন্তানের অভিভাবকত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে মায়েদের জন্য সকল প্রকার আইনী জটিলতা নিরসন। রাজনৈতিক দলগুলোকে ৩৩ শতাংশ নারী প্রার্থীকে পরবর্তী নির্বাচন থেকে মনোনয়ন দিতে হবে।
২৪. বৈচিত্র্যের ঐক্যের শান্তি-স্বস্তি নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক অধিকার
লিঙ্গ বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক ও স্বতন্ত্র আইনগত অধিকারকে স্বীকৃতি দিতে হবে। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক, জাতিগত, পেশাগত, ধর্মীয় বৈচিত্র্যের জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা এবং চলাফেরার স্বাধীনতা সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ যে বহু ভাষার বহু জাতির, বহু ধর্মের দেশ এই মর্মে বৈচিত্র্যের ঐক্য বজায় রাখার জন্য নিয়মিতভাবে প্রচারাভিযান চালাতে হবে।
২৫. পোশাকের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা:
ছিন্নমূল ও হতদরিদ্র মানুষের জন্য অতি সস্তায় টি শার্ট, লুঙ্গি, প্যান্ট, শাড়ী, সালোয়ার কামিজ এবং শীতবস্ত্র কেনার সুযোগ সরকারকে দিতে হবে। এজন্য দেশব্যাপী সুলভ কাপড়ের দোকান প্রতিষ্ঠা করতে হবে। পোশাক নিয়ন্ত্রণে ড্রেসকোডসহ যেসব ঔপনিবেশিক প্রথা প্রচলিত আছে সেগুলো বাতিল করতে হবে। কর্মস্থলসহ যেকোন স্থানেই নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মানুষের পোশাকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। পোশাকের কারণে নারী-পুরুষ কিংবা কাউকেই কোন প্রকার হেনস্তা করা, বুলিং করা কিংবা তার উপর হামলা করাকে আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ বলে ঘোষণা দেয়া।