রাজারহাটে পোস্টার বিহীন নির্বাচনী প্রচারে নেই ভোটের আমেজ

এফএনএস (প্রহলাদ মণ্ডল সৈকত; রাজারহাট, কুড়িগ্রাম) : | প্রকাশ: ৩০ জানুয়ারী, ২০২৬, ০৬:০২ পিএম
রাজারহাটে পোস্টার বিহীন নির্বাচনী প্রচারে নেই ভোটের আমেজ

বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচনী প্রচারণা মানে চায়ের টেবিল গরম। টি-স্টল ও হোটেলগুলোতে সকাল থেকে গভীর রাত অবদি চলতো ডাল-পরেটা আর কাপে কাপে গরম চা।  মাঠ-ঘাঠে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠতো। দেয়াল, গাছ, বিদ্যুতের খুঁটি কিংবা বাজারজুড়ে পোস্টারে ছেয়ে যাওয়া এক অপূর্ব পরিবেশ। পোস্টার দেখেই সাধারণ ভোটার বুঝে নিতো নির্বাচন আসন্ন। প্রার্থীদের নির্বাচনী মিছিলে মিছিলে মুখরিত হতো এলাকা। কিন্তু আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলায় সেই চিরচেনা দৃশ্যের অবসান ঘটেছে। প্রথমবারের মতো সারাদেশের ন্যায় রাজারহাটেও পোস্টার ছাড়া শুরু হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা। নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, এবার কাগজের পোস্টারের পরিবর্তে সীমিত আকারে পরিবেশবান্ধব উপকরণ দিয়ে তৈরি ব্যানার ও ফেস্টুন ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছেন প্রার্থীরা। এ ছাড়া একটি সংসদীয় এলাকায় সর্বোচ্চ ২০টি নির্দিষ্ট মাপের (১৬ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৯ ফুট প্রস্থ) বিলবোর্ড ব্যবহারের অনুমতি থাকলেও এর দৃশ্যমান ব্যবহার তেমন দেখা যায়নি। বুধবার(২১ জানুয়ারি) দিবাগত রাত ১২টার পর থেকেই প্রার্থীরা প্রচারে নামার অনুমতি পেলেও কুড়িগ্রামের রাজারহাটের আশপাশের এলাকাগুলো ঘুরে কোথাও চোখে পড়েনি পরিচিত কোনো নির্বাচনী রঙ, স্লোগান কিংবা প্রার্থীদের মুখচ্ছবি। ২৬কুড়িগ্রাম-২(রাজারহাট,ফুলবাঢ়ী ও কুড়িগ্রাম সদর) আসনে চিরচেনা নির্বাচনী জৌলুস ও উৎসবমুখর পরিবেশ অনেকটাই অনুপস্থিত। প্রচারণার ১০ম দিনে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও গুরুত্বপূর্ণ বাজার এলাকা ঘুরে দেখা গেছে এক ভিন্ন চিত্র। সরকারের নতুন আচরণবিধি অনুযায়ী পরিবেশ সুরক্ষা ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রচারণাকে গুরুত্ব দিয়ে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে পোস্টার, বিলবোর্ড ও দেয়াল লিখন। পাশাপাশি মাইকিং, লিফলেট বিতরণ ও আকাশপথে প্রচারণার উপরও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। এ আসনে মোট ৭জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। অধিকাংশ প্রার্থীর পক্ষেই ব্যানার বা ফেস্টুন চোখে পড়েনি। তবে বড় দুই দলের প্রার্থী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ(ধানের শীষ), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দশ দলীয় জোটের এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম আহবায়ক ও রংপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ড. আতিকুর রহমান মুজাহিদ( শাপলা কলি), জাতীয় পার্টির আলহাজ্ব পনির উদ্দিন আহমেদ(লাঙ্গল), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাওলানা নুর বখত(হাতপাখা) এর পক্ষে ভোট চেয়ে কিছু ব্যানার ও লিফলেট দেখা গেছে।

এর মধ্যে বিএনপি ও এনসিপির প্রার্থীর ব্যানারের সংখ্যাই বেশি। বিভিন্ন এলাকার বাঁশের খুঁটিতে সাদা-কালো এসব ব্যানার বাঁধা ছিল। এই দুই দল ছাড়া জাতীয় পার্টির প্রার্থীর কয়েকটি নির্বাচনী ক্যাম্প দেখা গেলেও অন্যান্য প্রার্থীর কোনো ক্যাম্পের দেখা পাওয়া যায়নি। নির্বাচনী বিধি অনুযায়ী দুপুর ২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত মাইকিং করার সুযোগ থাকলেও বিএনপি, এনসিপি,জাপা ও ইসলামী আন্দোলন ছাড়া অন্য কারও প্রচারণার মাইক এলাকাবাসী শোনেনি। ব্যবসায়ী আ.মতিন মিয়া বলেন, আগে নির্বাচন মানেই রাস্তা জুড়ে পোস্টার, ব্যানার, মিছিল। এখন কিছুই নেই। কে দাঁড়িয়েছে, কোন দলে কিছুই বুঝি না। মনে হচ্ছে নির্বাচন হচ্ছে নীরবে। তার ভাষায়, আমি জানিই না আমাদের এলাকায় কে প্রার্থী। পোস্টার না থাকলে সাধারণ মানুষের কাছে খবর পৌঁছাবে কীভাবে? এক চা দোকানে বসে কয়েকজন প্রবীণ ভোটার জানান, তাদের অনেকেরই স্মার্টফোন নেই, ইন্টারনেট ব্যবহারের অভ্যাসও নেই। ৬৬ বছর বয়সী বরকত আলী বলেন,আমরা অনলাইনে প্রচারণা দেখব কীভাবে? পোস্টারই ছিল সবচেয়ে সহজ উপায়। এখন তো নির্বাচন হচ্ছে, সেটাই ঠিকমতো বোঝা যাচ্ছে না। অন্যদিকে ভিন্ন মত দিয়ে অবসর প্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সেকেন্দার আলী বাদশা ব্যাপারী বলেন, ‘পোস্টার না থাকায় শুরুতে প্রার্থী চিনতে সমস্যা হচ্ছে ঠিকই, তবে পরিবেশ রক্ষা ও নির্বাচনের অতিরিক্ত ব্যয় কমানোর জন্য এটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ। এই পরিবর্তনকে আমরা স্বাগত জানাই। পরিবেশবান্ধব ও সুশৃঙ্খল নির্বাচনের এই নতুন সংস্কৃতি ভোটারদের মধ্যে শেষ পর্যন্ত কতটা সাড়া ফেলতে পারে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।