ঝিনাইদহ ৬ উপজেলায় জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে জনজীবন ও কৃষি উৎপাদন ক্রমন্বয়ে চঝুঁকির মুখে পড়েছে। সরকারি ডিপো থেকে জেলা পর্যায়ে ফিলিং স্টেশন গুলোতে চাহিদার তুলনায় নগণ্য পরিমাণ জ্বালানি বরাদ্দ দেওয়ায় ঝিনাইদহ জেলা জুড়ে হাহাকার দেখা দিয়েছে। এ হাহাকার কবে নিবারন হবে তা কেউ বলতে পারছে না। সোমবার ও মঙ্গলবার পেট্রোল ও ডিজেল সংগ্রহের জন্য প্রয়োজনীয় গ্রাহকদের দীর্ঘ সারি কোথাও কোথাও দুই কিলোমিটার ছাড়িয়ে গেছে। এ ছাড়া প্রতিদিন সন্ধার পর থেকে তেল পাম্পে মটর সাইকেল দাড়িয়ে থাকছে কয়েক হাজার। ঝিনাইদহ জেলা ফুয়ের পাম্প মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাবে আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইনে বিঘ্ন ঘটায় স্থানীয় পর্যায়ে এই ঘাটতি দেখা দিয়েছে। বর্তমানে ঝিনাইদহ জেলায় সপ্তাহে যেখানে ৫০ থেকে ৫২ হাজার লিটার জ্বালানি তেলের প্রয়োজন, সেখানে ডিপো থেকে বরাদ্দ মিলছে মাত্র ২৫ থেকে ৩০ হাজার লিটার। ঝিনাইদহ ৬ উপজেলায় মোট ৩৬টি নিবন্ধিত পাম্পের মধ্যে প্রতিদিন গড়ে মাত্র ৬ থেকে ৭টি পাম্প চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে, যা সংকট ক্রমান্বয়ে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।ডিপো থেকে চাহিদার মাত্র অর্ধেক তেল পাওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খেতে হচ্ছে পাম্প মালিকদের। অনেক মোটর সাইকেল চালক বারবার লাইনে দাঁড়িয়ে তেল মজুত করছেন, যার ফলে কৃত্রিম সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে।এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন মোটর সাইকেল-নির্ভর বেসরকারি খাতের কয়েক হাজার চাকরিজীবী।বিশেষ করে বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকগন, এনজিও এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় প্রতিনিধিরা প্রতিদিন গড়ে ৩ থেকে ৫ লিটার পেট্রোলের প্রয়োজনে পাম্পে এসে পাচ্ছেন মাত্র ২০০ থেকে ৩০০ টাকার তেল। আবু রায়হান তৌফিক ও বিজয় নামে দুজন ক্রিয় প্রতিনিধিরা বলেন, তাদের প্রতিদিন কয়েক ডজন দোকানে অর্ডার নিতে বিভিন্ন গ্রাম এলাকায় যেতে হয়, কিন্তু পর্যাপ্ত তেল না থাকায় তারা কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারছেন না। এতে তাদের বিপণন কার্যক্রম ও সেলস পারফরম্যান্স ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। সারারাত তেল পাম্পে লাইনে দাঁড়িয়ে সামান্য তেল পাওয়ায় তাদের জীবনযাত্রা দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
বোরো মৌসুমের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ডিজেলের সংকট ঝিনাইদহ জেলার কৃষি অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয়ের সংকেত দিচ্ছে। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) ঝিনাইদহ কার্যালয়ের তথ্যমতে, জেলায় মোট ৫৯ হাজার ৪৯১টি সেচ পাম্পের মাধ্যমে ১ লাখ ৫০ হাজার ২৩৫ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ করা হয়। তন্মধ্যে ৫১ হাজার ৫৪২টি পাম্পই ডিজেল চালিত, যা দিয়ে ১ লাখ ১১ হাজার ৪৩২ হেক্টর জমিতে পানি সেচ দেওয়া হয়। বাকি ৩৭ হাজার ৩০৮ হেক্টর জমিতে ৭ হাজার ৯৪৯টি বিদ্যুৎ চালিত পাম্পের মাধ্যমে সেচ দেওয়া হয়। ধানের বাইল আসার এই মুহূর্তে পর্যাপ্ত সেচ নিশ্চিত করা না গেলে ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। ঝিনাইদহ উপজেলার পোড়াহাটি গ্রামের আছালত আলী ও কালীগঞ্জের মিনাজ উদ্দিনের মতো সাধারণ কৃষকদের অভিযোগ, পাম্পে এলে তাদের মাত্র ২ থেকে ৩ লিটার ডিজেল দেওয়া হচ্ছে, যা দিয়ে সেচ কাজ চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ছে। আবার তাদের চোখের সামনেই নসিমন, করিমন বা বড় যানবাহন গুলো ড্রাম ভরে ডিজেল নিয়ে যাচ্ছে। ফিলিং স্টেশন ছাড়াও ‘ড্রামে ডিজেল বিক্রির অনুমোদিত’ ডিলাররাও ডিপো থেকে সরবরাহ না পাওয়ায় কৃষকদের এই ভোগান্তি আরও বেড়েছে। বিশেষ করে তেল পাম্পের মালিকরা গভীর রাতে ব্যারেল ভর্তি করে মুল্য বেশি নিয়ে গোপনে বিভিন্ন ব্যবসায়িদের নিকট বিক্রি করছে।
ঝিনাইদহ ফুয়েল পাম্প মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ও পাম্প মালিক হাসু মিয়া জানান, ডিপো থেকে চাহিদার মাত্র অর্ধেক তেল পাওয়ায় তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছেন। অভিযোগ করেন, অনেক মোটর সাইকেল চালক বারবার লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিয়ে মজুত করছেন, যার ফলে কৃত্রিম সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মাসউদ বলেছেন, সরকার পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে এবং অনিয়ম রোধে ইতোমধ্যে ১৭টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে। এছাড়া প্রতিটি তেল পাম্পে তদারকির জন্য একজন করে সরকারি কর্মকর্তাকে ‘ট্যাগ অফিসার’ নিয়োগের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যাতে করে জ্বালানি বণ্টন স্বচ্ছতা বজায় থাকে।
ঝিনাইদহ সদর, শৈলকূপা, হরিণাকুন্ডু,কালীগঞ্জ, কোটচাঁদপুর ও মহেশপুর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ৩৬টি ফিলিং স্টেশন থাকলেও প্রতিদিন অধিকাংশ বন্ধ থাকায় সংকটের চিত্র আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।