বাংলাদেশের সমতলের জেলাগুলোর মধ্যে নওগাঁ অন্যতম। ২০২১ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী নওগাঁয় ২৭ লক্ষ ৮৪ হাজার ৪শত ৬১ জনসংখ্যার বাস। এর মধ্যে প্রায় আড়াই লাখ ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী। মুলধারার বাঙ্গালী জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি নওগাঁ জেলায় প্রায় ১৫টি ভিন্ন জাতিসত্তার এসকল ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর বাস। যারা শত শত বছর ধরে বৈচিত্র্যতার ধারক হিসাবে জেলার সুনাম অক্ষুন্ন রেখেছে। এ সকল ক্ষুদ্র নৃ- গোষ্ঠীর অন্যতম প্রধান পেশা হলো কৃষি। কৃষির বাহিরে বিকল্প পেশা তাদের সাংস্কৃতিক মুল্যবোধের সাথে না মানায় তাঁরা কৃষি ও কৃষি সংশ্লিষ্ট কাজকে আঁকড়ে ধরেই জীবিকা অতিবাহিত করে আসছে। যদিও তাদের এই জীবণের পথের বাঁকে বাঁকে রয়েছে নানা আশা- নিরাশার দোলাচল। এক সময়ে উত্তরের জেলাগুলোতে গোয়াল ভরা ধান আর পুকুর ভরা মাছের অভাব ছিলোনা। এ কারণে উত্তরের এই জেলা শস্য ভান্ডার হিসাবে খ্যাতি অর্জন করে। এখানে ভুস্বামী আর কৃষি মজুররা আরাম আয়েশে জীবণযাপন করতো। তাদের এই জীবণ চলার পথে ক্ষনিকের ঝড়-ঝাপটা থাকলেও তা আবার নিমিষেই মিলিয়ে যেত। কিন্তু সাম্প্রতিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নওগাঁয় বসবাসরত দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষের বিশেষ করে কৃষি মজুর নির্ভর ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের জীবিকায়নকে চরমভাবে প্রভাবিত করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাবের বিদ্যমান সংকট তাদের দিন দিন প্রান্তিকতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন একটি বৈশ্বিক ইস্যু হলেও এক সুদুরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে বাংলাদেশের উপর। বিশেষ করে বাংলাদেশের কৃষি প্রধান এলাকাগুলো চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। সময়মতো বৃষ্টি না হওয়ায় দেখা উত্তরাঞ্চলে দেখা দিচ্ছে দীর্ঘায়িত ধরা, অসময়ে বৃষ্টিপাত, অতিবৃষ্টি ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাবে ফসল উৎপাদন চরমভাবে ব্যহত হচ্ছে। জমির মালিকরা ফসলের প্যাটান পরিবর্তন করে খরা সহিঞ্চু ফসল উৎপাদনের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। কৃষি মজুররা কাজ না পাওয়ায় আর্থিক সংকটের মধ্যে পতিত হচ্ছে। অভাবকালীন সময়ে তাঁরা স্থানীয় সুদখোর ও জমির মালিকের নিকট হতে কঠিন শর্তে ঋণ নিয়ে জীবণ ধারণ করতে বাধ্য হচ্ছে। সুদখোর আর ভুস্বামীদের কঠিন বেড়াজাল থেকে মুক্ত হয়ে দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষরা জীবণের চাকা ঘুরাতে পারছে না। অনেকেই জীবণ ও জীবিকার তাগিদে কখনও একা আবার কখনও পরিবার পরিজন নিয়ে মাইগ্রেশন করতে বাধ্য হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার অংশ হিসাবে নওগাঁ জেলার মহাদেবপুর উপজেলার খাজুর ইউনিয়নের বনগ্রাম গ্রামের ২০জন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারী মিলে চালু করেছে 'আপদকালীন খাদ্য ভান্ডার'। তাদের এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য হলো দুর্যোগকালীন সময়ে পরিবারে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় বেঁচে থাকার জন্য যাতে সুদখোর মহাজনদের কাছ থেকে উচ্চসুদে ঋণ গ্রহণ এবং জমির মালিকের কাছে অগ্রিম শ্রম বিক্রয় করতে না হয়। খাদ্য ভান্ডার হতে খাবার বা নগদ অর্থ নিয়ে আপদকালীন সময়ে যাতে খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকতে পারেন। সম্প্রতি বনগ্রাম গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে ১৫-২০ জন ক্ষুদ্র নৃ- গোষ্ঠীর নারী গোল হয়ে বসে খাদ্য ভান্ডারে চাল জমা করছেন। সুমিতা উরাও জানান, আমরা প্রতিদিন রান্নার আগে নির্ধারিত চাল থেকে একমুঠো চাল অন্যত্র সরিয়ে রাখি। এভাবে এক সপ্তাহ একমুঠো করে চাল সরিয়ে রাখলে প্রায় আধা কেজি চাল হয়। আমরা যারা সদস্য আছি তারা প্রতি সপ্তাহে একটি নির্দিষ্ট দিনে প্রত্যেকের চাল এক জায়গায় করি এবং একজনের নিকট জমা রাখি। সপ্তাহে কে কতটুকু চাল জমা দিলো তা খাতায় লিপিবদ্ধ করা হয়। সদস্য সখিনা উরাও জানান, খাদ্য ভান্ডারে চালের পরিমাণ বেড়ে গেলে আমরা প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত আপদকালীন এবং অন্যান্য অভাবের সময় সেগুলো ভান্ডার থেকে ধার নিবো এবং হাতে কাজ আসলে ধার পরিশোধ করবো। চালের পরিমাণ বেশী হলে অতিরিক্ত চাল বিক্রয় করে ব্যাংকে যৌথনামে টাকা জমা রাখার পরিকল্পনা আছে। মিলন লাকড়া বলেন, আমি স্থানীয় সংস্থা বিএসডিও তে প্রজেক্ট এ্যাসিসটেন্ট হিসাবে কাজ করছি। দুর্যোগকালীন সময়ে গ্রামের ঘরে ঘরে খাদ্য সংকট বিরাজ করে। কিভাবে নিজেদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় সে বিষয়ে আমি গ্রামের নারীদের সাথে মতবিনিময় করলে তারা ২০ জন মিলে এক মাস আগে আপদকালীন খাদ্য ভান্ডার গঠন করে। এই খাদ্য ভান্ডারে এখন পর্যন্ত দেড়মন চাল জমা হয়েছে। স্থানীয় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (বিএসডিও) এর উপজেলা সমন্বয়কারী ময়না টপ্য বলেন, দাতা সংস্থা সুইজারল্যান্ড, কানাডা সরকার এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অর্থায়নে বিএসডিও ও ওয়েভ ফাউন্ডেশন অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে নওগাঁ জেলার মহাদেবপুর, সাপাহার ও মান্দা উপজেলার ১৮টি ইউনিয়নে ৩০ মাস মেয়াদী 'জেন্ডার ইকুয়ালিটি ট্যান্সফর্মস ক্লাইমেট অ্যাকশন (গেটকা) প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পের মুল লক্ষ্য হলো জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সচেতনতা বাড়ানো যাতে তারা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের সাথে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন কার্যক্রমে যুব ও নারীদের অন্তভুক্তি বাড়ানো ও এই কাজে নারীর অবদানের স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠা করা। এলাকায় জলবায়ু নায্যতা প্রতিষ্ঠা এবং জলবায়ুর প্রভাব মোকাবিলায় কমিউনিটি ভিত্তিক ছোট ছোট উদ্যোগগুলো মডেল হিসাবে নিয়ে তা সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়া। এরই ধারাবাহিকতায় বনগ্রাম গ্রামের ২০জন নারী আপদকালীন খাদ্য ভান্ডার করে নিজেদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করছে। প্রকল্পের অধীনে এ ধরণের উদ্যোগ গ্রহণে কমিউনিটির মানুষকে সহায়তা প্রদান কার্যক্রম চলমান থাকবে।