সংসদে জুলাই সনদ নিয়ে চলমান বিতর্ক নিয়ে ‘বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী)’-এর সমন্বয়ক কমরেড মাসুদ রানা এক বিবৃতিতে বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান এদেশের ইতিহাসে অবিস্মরণীয় ঘটনা। এই গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসনের কবল থেকে এদেশের মানুষ মুক্ত হয়েছে। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তীতে রাষ্ট্রের সংবিধান ও বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সংস্কারের আলোচনা সামনে আসে। জনআকাঙ্ক্ষার কারণে সরকার এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেয় ও ৬টি সংস্কার কমিশনের রিপোর্টের প্রস্তাবনাগুলো নিয়ে ঐকমত্য সৃষ্টির জন্য গঠিত হয় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক সংস্কার নিয়ে আমরা আওয়ামী লীগের শাসনামল থেকেই সোচ্চার ছিলাম । ফলে গণঅভ্যুত্থানে সর্বশক্তি নিয়ে অংশগ্রহণকারী দল হিসেবে এই ঐকমত্য কমিশনের প্রতিটি বৈঠকেই আমাদের দলের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। প্রতিটি বিষয়েই আমরা মতামত রেখেছি। বর্তমানে আমরা দেখতে পাচ্ছি, সংস্কার বাস্তবায়ন নিয়ে যে টানাহেঁচড়া চলছে এর মধ্যে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তগুলোই বাস্তবায়ন হবে কি না তা নিয়েই আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতি যে হবে, সেটা অজানা ছিল না। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের উদ্যোগে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিনের আলোচনার পর সর্বসম্মত হওয়া বিষয়গুলো নিয়ে জুলাই সনদ প্রণয়ন না করে কমিশন যখন তাদের নির্ধারিত ৮৪টি পয়েন্ট সনদ হিসেবে তুলে ধরলেন এবং সেটাকে যে কোন রকমে পাশ করানোর জন্য ‘নোট অব ডিসেন্ট’ যুক্ত করলেন - অনিশ্চয়তা ও সমঝোতা ভঙ্গের ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া সেদিন থেকেই শুরু হয়েছিল। পরবর্তীতে একের পর এক গোঁজামিল দেয়া হয়েছে। সনদের চূড়ান্ত খসড়ায় প্রস্তাবিত ধারাগুলোর নিচে দলগুলোর ‘নোট অব ডিসেন্ট’ উল্লেখ করা হয়েছে এবং তার সাথে একটা নোট উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে- ‘অবশ্য কোন রাজনৈতিক দল বা জোট তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখপূর্বক যদি জনগণের ম্যান্ডেট লাভ করে তাহলে তারা সেইমতো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে’। আবার সেই সনদেরই শেষ পৃষ্ঠার অঙ্গীকারনামায় বলা হয়েছে-“...নতুন রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসেবে জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫-এর পূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করব।” বাস্তবে সনদের বিষয়সমূহে উল্লেখিত শর্ত আর তার অঙ্গীকারনামার শর্ত - এ দু’টো পরস্পরবিরোধী। অথচ দু'টোই একই দলিলে উল্লেখিত ছিল। এই পরস্পরবিরোধী গোঁজামিলপূর্ণ অবস্থান নিয়েই জুলাই জাতীয় সনদ আজকের সংসদের দুইটি বড় দল স্বাক্ষর করেছিলেন। আমরা সেদিন এই অসঙ্গতিগুলো উল্লেখ করেছিলাম। ২০২৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ নামে একটি বিশেষ সাংবিধানিক আদেশ জারি করলেন। এই ধরনের আদেশ প্রদানের এখতিয়ার রাষ্ট্রপতির নেই। এই আদেশে কমিশন প্রস্তাবিত সকল সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাবনাকে গণভোটের মাধ্যমে বৈধতা দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হলো। চারটি পয়েন্টের (এরমধ্যে সংবিধান সংস্কারের ৪৮টি পয়েন্টের বেশিরভাগই যুক্ত) উপর একসাথে 'হ্যাঁ/না' এর ভিত্তিতে গণভোট নেয়া হলো এবং সকল নোট অব ডিসেন্টকে খারিজ করে দেয়া হলো। আমরা তখন বলেছিলাম যে, আমরা গণভোটের বিরুদ্ধে নই, কিন্তু যে প্রক্রিয়ায় এই গণভোটের আয়োজন করা হচ্ছে তা জনমতের যথাযথ প্রতিফলন ঘটাবে না। অথচ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহম্মদ ইউনুস জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রথম বৈঠকে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, এই কমিশন দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এবং ঐকমত্যের ভিত্তিতেই জুলাই সনদ রচনা করবে । সেই সনদে রাজনৈতিক দলগুলো স্বাক্ষর করবে। দীর্ঘ ৮ মাস বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনার পরে, অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্য-অনৈক্য সকল প্রস্তাবই অগ্রাহ্য করে, ৪৮টি প্রস্তাবের একটি প্যাকেজ হিসেবে তুলে ধরার মধ্য দিয়ে জুলাই সনদকে একটি সরকারি দলিলে পর্যবসিত করা হলো। যদিও এটা ঠিক যে, এই সনদ ও সংস্কার দিয়ে রাষ্টের ফ্যাসিবাদী নিপীড়ন কিংবা ধনী-গরিবের বৈষম্য দূর করা সম্ভব হবে না। তা সত্ত্বেও আমরা রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কার চেয়েছি। কারণ এটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে কিছুটা হলেও সহযোগিতা করবে। এজন্য আমরা সংস্কার প্রস্তাবনার বেশ কিছুতে একমত হয়েছি, অনেকগুলোতে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছি, জোরালো আপত্তি জানিয়েছি, বিকল্প প্রস্তাবনা দিয়েছি। একইসাথে জুলাই সনদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তসমূহ বাস্তবায়নের জোরালো দাবি জানিয়েছি। বর্তমান সময়ে আমরা সংস্কার নিয়ে সংসদে দলগুলোর দড়ি টানাটানি দেখছি। সর্বসম্মত প্রস্তাবগুলোর বাইরেও গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয় আছে যেগুলো নিয়ে নিবিড় আলোচনা হওয়া দরকার। বিশেষ করে মৌলিক অধিকার প্রশ্নে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন কোন সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি, শুধু ‘একে সম্প্রসারণ করা হবে এবং বাস্তবায়নে আইনি ও সাংবিধানিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে’- এ ধরনের একটি সাধারণ বক্তব্য ছাড়া। মৌলিক অধিকারের সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও আইনি বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আইন প্রণয়ন করা দরকার। এছাড়াও সংরক্ষিত নারী আসন, জরুরী অবস্থা- ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ও সংসদে পুনরায় আলোচনা হওয়া উচিত বলে আমরা মনে করি। কিন্তু তা না করে সংসদে সরকার ও বিরোধী দল- উভয়পক্ষই খড়ের কুটো নিয়ে ঝগড়া করছেন। ফলে চলমান বিতর্কের ফাঁদে পড়ে সবগুলো রাজনৈতিক দলগুলোর একমত হওয়া সিদ্ধান্তগুলোও কতটা বাস্তবায়ন হবে- তা নিয়ে আমাদের মনে গভীর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আমরা দেখেছি যে, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে তিনজোটের রূপরেখা কেউই বাস্তবায়ন করেনি। ফলে আমরা কোনো ধরনের কালক্ষেপণ না করে অবিলম্বে জুলাই সনদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তসমূহ বাস্তবায়ন করতে সরকারের কাছে জোর দাবি জানাই। জনগণের প্রতি আমাদের আহ্বান- সরকার যদি এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে পিছিয়ে যেতে চায় ও কালক্ষেপণ করে তাহলে গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে সংস্কারের দাবিতে ধারাবাহিক গণআন্দোলন গড়ে তুলুন।