প্রকৃতির বৈরী আচরণে শঙ্কা

সাতক্ষীরায় হাসছে বোরো ও আমের ফলন

এফএনএস (এস.এম. শহিদুল ইসলাম; সাতক্ষীরা) : | প্রকাশ: ৫ এপ্রিল, ২০২৬, ০২:৪৬ পিএম
সাতক্ষীরায় হাসছে বোরো ও আমের ফলন

আকাশে মেঘ জমলেই সাতক্ষীরার কৃষক কপালে ভাঁজ ফেলছেন। কখনো তপ্ত রোদ, কখনো ঝিরঝিরে বৃষ্টি, আবার কখনো ধেয়ে আসা কালবৈশাখীর সঙ্গে শিলাবৃষ্টি। প্রকৃতির এই বৈরী রূপই এখন উপকূলীয় এই জেলার লাখো কৃষকের দুশ্চিন্তার কারণ। মাঠের বোরো ধানের থোড় ফেটে কেবল শীষ বের হয়েছে, বাতাসের দোলায় দুলছে কৃষকের স্বপ্ন। একই দশা আম্রকাননগুলোতেও; গাছে গাছে ঝুলছে আমের গুটি। তবে প্রকৃতির ছন্দপতন ঘটলে এই স্বপ্ন ম্লান হতে কতক্ষণ!

সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরা জেলায় ৮০ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এই মৌসুমে জেলায় ২ লাখ ৪১ হাজার মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।  সূত্রমতে, গত ২০২৪-২৫ মৌসুমে জেলার সাতটি উপজেলায় ৭৯ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে আশাজাগানিয়া খবর হলো লবণসহিষ্ণু জাতের ধানের বিস্তার। উপকূলীয় এই জেলায় লবণাক্ততার কারণে একসময় চাষাবাদ থমকে থাকলেও ২০ হাজার হেক্টর জমিতে লবণসহিষ্ণু জাতের ধান চাষ হয়, যা আগের বছরের তুলনায় চার হাজার হেক্টর বেশি। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) সাতক্ষীরা আঞ্চলিক কার্যালয়ের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. সাজ্জাদুর রহমানের ভাষ্যমতে, জলবায়ু পরিবর্তনকে মাথায় রেখে ব্রি-৬৭, ৯৭ ও ৯৯-এর মতো ১৪টি লবণসহিষ্ণু জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। এসব জাত ১২ থেকে ১৪ ডিএস পর্যন্ত লবণ সহ্য করতে পারে এবং প্রতি বিঘায় ২৬ থেকে ২৭ মণ ফলন দেওয়া সম্ভব। ব্রি-১১৭ ও ১১৩-এর মতো আরও উন্নত জাতও দ্রুতই কৃষকের হাতে পৌঁছাবে। এদিকে ধানের পাশাপাশি সাতক্ষীরার অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখে আম। এবার জেলায় ৪ হাজার ১০০ হেক্টরের বেশি জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭১ হাজার টন। অনুকূল আবহাওয়ায় এবার মুকুল ভালো হওয়ায় চাষিরা বড় লাভের স্বপ্ন দেখছেন। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. সাইফুল ইসলামের ভাষ্যমতে, "এবার মুকুল ও গুটি বেশ ভালো। আমাদের লক্ষ্য সাতক্ষীরার বিখ্যাত হিমসাগর ও আম্রপালি আবারও বিশ্ববাজারে রপ্তানি করা।" তবে শেষ মুহূর্তে পোকার আক্রমণ ও শিলাবৃষ্টি নিয়ে চাষিদের মাঝে কিছুটা শঙ্কা রয়ে গেছে। সাতক্ষীরার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। সদর উপজেলার কৃষক জাহাঙ্গীর কবীর বলেন, "সরকারের সার ও বিষের ভর্তুকি আমাদের সাহস বাড়িয়েছে। কিন্তু খাল-বিল সংস্কার না হওয়ায় সেচ সুবিধা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। বাজারে ধানের নায্য দাম পাওয়া নিয়েও আমরা চিন্তিত।" জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন ও প্রশিক্ষণ দিয়ে কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তিতে প্ররোচিত করছেন।  কৃষক আলফাজ উদ্দীন, আইয়ুব আলী, আনোয়ার হোসেন, মিজানুর রহমান, শামসুর রহমানসহ অনেকেই বলেন, "সবকিছু ঠিক থাকলে এবং আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার সাতক্ষীরায় বোরো ও আমের বাম্পার ফলন হবে।" প্রকৃতির বৈরিতাকে জয় করে সাতক্ষীরার কৃষকের এই ঘাম ঝরানো পরিশ্রম শেষ পর্যন্ত গোলায় ধান আর ঝুড়িতে আম হয়ে উঠবে-এমনটাই এখন এই জনপদের প্রত্যাশা।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে