বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার অনেকাংশ নির্ভর করে বোরো ধানের ওপর। এ মৌসুমে সেচই হলো উৎপাদনের প্রাণশক্তি। কিন্তু জ্বালানি সংকট দেখা দিলে সেচ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়, জমি শুকিয়ে যায় এবং কৃষকের বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়ে। সামপ্রতিক সময়ে ডিজেল ও বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহের কারণে অনেক এলাকায় সেচ পাম্প বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে কৃষকরা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন- ফসল নষ্ট হলে শুধু তাদের ক্ষতি নয়, জাতীয় খাদ্য উৎপাদনও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে বিকল্প উৎস থেকে বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হচ্ছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। সরকার কৃচ্ছ্রসাধনের নীতি নিয়েছে- অফিস ও ব্যাংকের সময় কমানো, দোকানপাট সন্ধ্যা সাতটার মধ্যে বন্ধ করা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ব্যয় ৩০ শতাংশ কমানো ইত্যাদি। কিন্তু মাঠপর্যায়ে কৃষকেরা সেচের জন্য প্রয়োজনীয় ডিজেল পাচ্ছেন না, আর পেলেও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। কৃষকের বিনিয়োগ যদি উৎপাদনের চেয়ে বেশি হয়ে যায়, তবে তারা চাষাবাদে উৎসাহ হারাবেন। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে চাল, ডাল, সবজি- সব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে। খাদ্য সংকট তৈরি হলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠবে। তাই বোরো মৌসুমে সেচ ব্যবস্থাকে স্বাভাবিক রাখতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। সরকারের করণীয় হলো সেচ মৌসুমে কৃষিকাজকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিদ্যুৎ ও ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করা। জ্বালানি বিতরণে কোনো ধরনের অনিয়ম বা সিন্ডিকেট যেন না থাকে, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে প্রণোদনা বা স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানি করে এবং ভর্তুকি দিয়ে কৃষকদের জন্য ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি খাতকে জাতীয় অর্থনীতির ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে কৃষকের পাশে দাঁড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। বোরো মৌসুমে সেচ ব্যবস্থা সচল রাখা মানে দেশের খাদ্য উৎপাদনকে টিকিয়ে রাখা। কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে- এই সত্যটি ভুলে গেলে তা হবে আত্মঘাতী।