দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের সীমাবদ্ধতা বাড়তে থাকায় রান্নার কাজে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ব্যবহার দিনদিন বাড়ছে। ‘সিলিন্ডার গ্যাস’ নামে পরিচিত এই জ্বালানি যেমন সহজলভ্য, তেমনি বিপজ্জনকও। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ও পাইপলাইনের লিকেজজনিত অগ্নিকাণ্ডে হতাহতের খবর আসছে। রান্নাঘরে অদৃশ্যভাবে জমে থাকা গ্যাস চুলা জ্বালানোর মুহূর্তেই ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছে, দগ্ধ করছে মানুষকে, ভেঙে দিচ্ছে পরিবার। বিশ্লেষণে দেখা যায়, বর্তমানে সিলিন্ডার বিস্ফোরণের চেয়ে গ্যাস লিকেজজনিত বিস্ফোরণ অনেক বেশি প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে। রাজধানীর অধিকাংশ গ্যাস সরবরাহ লাইন কয়েক দশকের পুরোনো, যেগুলোর সঠিক তদারকি বা সংস্কারের অভাবে এগুলো মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। তিতাস গ্যাসসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের গাফিলতি এবং অবৈধ সংযোগের আধিক্য সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে সারাদেশে গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজ থেকে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড হয়েছে এক হাজার ২০৭টি। এর মধ্যে ২০২০ সালে ১৩৫, ২০২১ সালে ১০৫, ২০২২ সালে ৯৪, ২০২৩ সালে ১২৫ এবং ২০২৪ সালে ৭৪৮টি দুর্ঘটনা ঘটে। ২০২৪ সালে গড়ে প্রতি মাসে ৬২টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। ২০২৫ সালে সারাদেশে সিলিন্ডার ও এর সঙ্গে যুক্ত উপকরণের লিকেজ থেকে এক হাজার ৪১টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ মাসে গড়ে ৮৬টি দুর্ঘটনা। একই সময়ে পাইপলাইনে সরবরাহ করা প্রাকৃতিক গ্যাস লিকেজ থেকে ৫৬২টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এর আগের পাঁচ বছরে (২০২০-২০২৪) এ সংখ্যা ছিল তিন হাজার ৫৪১। এর মধ্যে ২০২০ সালে ৭২২, ২০২১ সালে ৭৮৯, ২০২২ সালে ৭৯৫, ২০২৩ সালে ৭৭০ এবং ২০২৪ সালে ৪৬৫টি অগ্নিকাণ্ড ঘটে। ২০২০ সাল থেকে পাঁচ বছরে সারাদেশে বিভিন্ন কারণে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে এক লাখ ২১ হাজার ৬৮৯টি। এর মধ্যে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে গ্যাস সিলিন্ডার ও পাইপলাইনের গ্যাস থেকে। ২০২৫ সালে মোট ২৭ হাজার ৫৯টি অগ্নিকাণ্ডের মধ্যে সিলিন্ডার ও পাইপলাইনের গ্যাস থেকে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে ৫ দশমিক ৯৩ শতাংশ। জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের জরুরি বিভাগের তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ১ হাজার ৬০০ জন, ফেব্রুয়ারিতে ১ হাজার ৪৫০ জন এবং মার্চের প্রথমার্ধে ৫৪৬ জন দগ্ধ রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে গ্যাস সিলিন্ডার-সম্পর্কিত ঘটনায় আহত হয়েছেন ২২ জন এবং মার্চে এই সংখ্যা আরও বেশি। বেশিরভাগ ঘটনাই গুরুতর। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, অনেক রোগী দুর্ঘটনার সময় ঘর বন্ধ রেখেছিলেন। দরজা-জানালা বন্ধ থাকলে গ্যাস জমে থাকে এবং সামান্য স্ফুলিঙ্গ থেকেও বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। বার্ন ইনস্টিটিউট সূত্রে জানা গেছে, গ্যাসজনিত দগ্ধ রোগীদের মৃত্যুহার বেশি হওয়ার অন্যতম কারণ হলো ইনহেলেশন ইনজুরি- অর্থাৎ বাহ্যিক দগ্ধতার পাশাপাশি শ্বাসনালিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শরীরের বড় অংশ পুড়ে গেলে ঝুঁকি আরও বাড়ে। তিনি জানান, শরীরের ২০ শতাংশের বেশি অংশ পুড়ে গেলে এবং শ্বাসনালি ক্ষতিগ্রস্ত হলে চিকিৎসার সুযোগ সীমিত হয়ে যায়। ৩০ শতাংশের বেশি দগ্ধতা এবং শ্বাসনালি আক্রান্ত হলে মৃত্যুঝুঁকি ৫০ শতাংশেরও বেশি হয়ে যায়। এদিকে, শহরজুড়ে ছড়িয়ে থাকা গ্যাসের পুরোনো জীর্ণ পাইপলাইনগুলোও হয়ে উঠেছে মৃত্যুফাঁদ। পুরোনো পাইপলাইনের লিকেজ থেকে আগুন ধরে মানুষ দগ্ধ হচ্ছে। নাগরিকদের অসচেতনতা, বাজারে নিম্নমানের হোসপাইপ, ত্রুটিপূর্ণ রেগুলেটর, নজেল ও ভালভ ব্যবহারের কারণে সামান্য লিকেজই বদ্ধ ঘরকে বোমায় পরিণত করছে। গ্যাস সিলিন্ডার দুর্ঘটনা প্রতিরোধে করণীয় হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলোকে পুরোনো ও জরাজীর্ণ লাইন দ্রুত সংস্কার করতে হবে এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি এলাকায় নিয়মিত বিরতিতে লিকেজ শনাক্তকরণ অভিযান চালাতে হবে। ভবন নির্মাণে রান্নাঘরে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখতে হবে। রান্নার আগে জানালা খুলে দিতে হবে, গ্যাসের গন্ধ পাওয়া গেলে কোনোভাবেই বৈদ্যুতিক সুইচ বা দেয়াশলাই জ্বালানো যাবে না। বাজারে বিক্রি হওয়া সিলিন্ডার ও আনুষঙ্গিক যন্ত্রাংশের মান নিয়ন্ত্রণে কঠোর মনিটরিং কার্যকর করতে হবে। গণমাধ্যম ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে আরও সক্রিয় হতে হবে। একই কক্ষে রান্না ও বসবাসের কারণে এক ঘটনায় পরিবারের একাধিক সদস্য দগ্ধ হওয়ার ঘটনা বাড়ছে। এতে শুধু প্রাণহানি নয়, পরিবারগুলো অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। চিকিৎসা ব্যয়, কর্মক্ষমতা হারানো এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন—সব মিলিয়ে দুর্ঘটনার প্রভাব ভয়াবহ।