সোমবার ঘড়ির কাঁটায় তখন দুপুর ১২টা ছুঁই ছুঁই, কিন্তু সাতক্ষীরা শহরের শিল্পী পাড়ায় বিশ্রামের ফুরসত নেই কারো। চারদিকে আঠা, বাঁশের চটা, কর্কশীট, মাটির সরা, কুলো আর উজ্জ্বল সব রঙের ছড়াছড়ি। দরজায় কড়া নাড়ছে বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। আর এই উৎসবকে রঙিন করে তুলতে দিনরাত এক করে কাজ করছেন স্থানীয় চারুশিল্পী ও মৃৎশিল্পীরা। সাতক্ষীরার বিভিন্ন মোড় ও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রস্তুতি এখন তুঙ্গে। প্রতিবছরের মতো এবারও শোভাযাত্রার মূল আকর্ষণ হিসেবে থাকছে বিশাল আকৃতির বাঘ, হাতি ও লোকজ মোটিফের সব প্রতিকৃতি। শিল্পীরা বাঁশ ও কাঠের কাঠামোর ওপর কাগজের স্তর বসিয়ে ফুটিয়ে তুলছেন গ্রামীণ বাংলার নানা অনুষঙ্গ। শহরের প্রাণকেন্দ্রে মিনিমার্কেটে দেখা গেল শিল্পী রফিকুল ইসলামের সঙ্গে। তুলির শেষ আঁচড় দিতে দিতে তিনি বলেন, "গত এক সপ্তাহ ধরে আমরা ঠিকমতো ঘুমাতে পারিনি। এবার আবহাওয়া ভালো থাকায় কাজ দ্রুত এগোচ্ছে। আমরা চাই আমাদের কাজের মাধ্যমে সাতক্ষীরার ঐতিহ্য সারা দেশের সামনে ফুটে উঠুক।" একই কথা বলেন, লেখক ও সাহিত্যিক মনিরুজ্জামান মুন্না। তিনিও এসেছেন রঙিন কাপড়ে ফেস্টুন তৈরির অর্ডার নিয়ে। তিনি বাংলা বরষণ উৎসবকে প্রাণের উৎসব হিসেবে মন্তব্য করে বলেন, বাঙালির শেকড়পোতা পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে। এখানই রচিত আমাদের হাজার বছরের সম্প্রীতির সেতুবন্ধন। সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ধুলিহর-ব্রহ্মরাজপুর (ডিবি) গার্লস হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক মোঃ এমাদুল ইসলাম এসেছিলেন বৈশাখী শোভাযাত্রার সরঞ্জাম নিতে। তিনি সকলকে আগাম নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, বারো মাসে তেরো পার্বণের সম্প্রীতির অনন্য এই পহেলা বৈশাখ আসে শান্তির বার্তা নিয়ে। পুরাতনকে বিদায় দিয়ে নতুনের ডাকে এ উৎসব হয়ে ওঠে সর্বজনীন। চারুশিল্পী মোহেবুল্লাহ সরদার, শহিদুল ইসলাম, শফিকুল ইসলামসহ অনেকেই বলেন, কেবল বড় প্রতিকৃতি নয়, ব্যস্ততা বেড়েছে মৃৎপল্লিগুলোতেও। সরা চিত্র, মাটির শখের হাঁড়ি আর শিশুদের খেলনা তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগররা। লাল, নীল, হলুদ আর সবুজ রঙের কারুকাজে ফুটে উঠছে মাছ, ফুল ও পাখির ছবি। মেলা ও শোভাযাত্রার জন্য তৈরি হচ্ছে নানা ধরণের মাটির গয়না। স্থানীয় এক নারী উদ্যোক্তা জানান, "এখন তরুণীদের মধ্যে মাটির গয়নার বেশ চাহিদা। তাই আমরা বৈশাখী থিম সামনে রেখে কানের দুল, নেকলেস আর চুড়ি তৈরি করছি। অর্ডার যা এসেছে, তাতে দম ফেলার সময় নেই।" জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সব প্রস্তুতি প্রায় শেষ। নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা থাকবে পুরো শহর। তবে সব ছাপিয়ে এখন সাধারণ মানুষের অপেক্ষা-কখন উদিত হবে বৈশাখের সেই কাঙ্ক্ষিত নতুন সূর্য। শহরজুড়ে এখন কেবলই রঙের খেলা আর সাজ সাজ রব। শিল্পীদের হাতের ছোঁয়ায় সাতক্ষীরা যেন জানান দিচ্ছে- "এসো হে বৈশাখ, এসো এসো।