ব্যয় সংস্থানে অতিমাত্রায় ব্যাংক ঋণনির্ভর হয়ে পড়েছে সরকার। বিগত ২০২৫ সালের জানুয়ারি শেষে দেশের ব্যাংক খাত থেকে ৪ লাখ ৩৪ হাজার ৩৬১ কোটি টাকা সরকারের নেয়া ঋণের স্থিতি ছিল। চলতি বছরের জানুয়ারি শেষে তা ৫ লাখ ৬৩ হাজার ১৯৩ কোটি টাকায় ঠেকেছে। ওই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে সরকারের ঋণ স্থিতি ১ লাখ ২৮ হাজার ৮৩২ কোটি টাকা বেড়েছে। সেক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৯ দশমিক ৬৬ শতাংশ। মূলত দেশের ব্যাংক খাত থেকে সরকারের বাড়তি ঋণ নেয়ার প্রবণতা আরো তীব্র হয়েছে। সাধারণত প্রতি সপ্তাহের রোববার ট্রেজারি বিল ও মঙ্গলবার ট্রেজারি বন্ডের নিলাম অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু অর্থ সংকটে থাকা সরকার ১ এপ্রিল বুধবারও ৯১ দিন মেয়াদি বিলের বিশেষ নিলাম ডেকেছে। ওই দিন বাজার থেকে ঋণ নেয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ হাজার কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বর্তমানে সাড়ে ৪ শতাংশের ঘরে দেশের জিডিপি (মোট দেশজ উৎপাদন) প্রবৃদ্ধির হার। আমদানি প্রবৃদ্ধির হারও ৩ দশমিক ৯১ শতাংশ। আর গত আট মাস ধরে রফতানি প্রবৃদ্ধি টানা নেতিবাচক। ব্যাংক খাতে আমানত প্রবৃদ্ধির হারও ১০ শতাংশে সীমাবদ্ধ। অর্থনীতির মৌলিক সূচকগুলোর নাজুক পরিস্থিতির মধ্যেই তীব্র গতিতে বাড়ছে সরকারের ঋণ। গত বছরের জানুয়ারির তুলনায় চলতি বছরের জানুয়ারিতে এক বছরের ব্যবধানে সরকারের ব্যাংক ঋণ প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। যদিও একই সময়ে ৬ শতাংশের ঘরে দেশের বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি। অর্থাৎ গত এক বছরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির তুলনায় সরকারি ঋণ পাঁচ গুণ বেড়েছে। এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি ১৫ শতাংশে সীমাবদ্ধ ছিল।
সূত্র জানায়, চলতি বছরের ২৯ মার্চ ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে সরকার ঋণ নিয়েছিল ৮ হাজার ২৫০ কোটি টাকা। তার মধ্যে ৯১ দিন মেয়াদি বিলের মাধ্যমে ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকার ঋণ নেয়া হয়েছে, যার সুদহার (কাট অফ ইল্ড) ছিল ৯ দশমিক ৭৮ শতাংশ। একই দিন ১৮২ দিন মেয়াদি বিলের মাধ্যমে ২ হাজার ৫০০ কোটি এবং ৩৬৪ দিন মেয়াদি বিলের মাধ্যমে ২ হাজার ২৫০ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছে সরকার। ওই দুটি বিলের সুদহার ছিল যথাক্রমে ৯ দশমিক ৯৭ ও ১০ শতাংশ। আর ৩১ মার্চ ১৫ ও ২০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের মাধ্যমে ২ হাজার কোটি টাকার ঋণ নেয়া হয়েছে। তার আগে গত ২৪ মার্চ ইসলামী বিনিয়োগ বন্ডের মাধ্যমে সরকার ঋণ নিয়েছে ২ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। বর্তমানে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৭২ হাজার কোটি টাকা ঘাটি তে সরকারের রাজস্ব আদায়। আর বিদেশ থেকেও আসছে না নতুন ঋণ। এমন অবস্থায় সরকার তার ব্যয় সংস্থানে অতিমাত্রায় ব্যাংক ঋণনির্ভর হয়ে পড়ায় সরকারের ঋণের বোঝাও দ্রুত বাড়ছে। রাজস্ব আদায় না বাড়লেও সরকার ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি ঋণ মওকুফসহ নতুন নতুন প্রকল্প নিচ্ছে। ব্যাংক কর্মকর্তারাও নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সরকারকে ঋণ দিতে বেশি উৎসাহী। তাতে দেশের বেসরকারি খাত আরো বেশি ঋণবঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
সূত্র আরো জানায়, বর্তমান নির্বাচিত সরকার কোনো পরিবর্তন আনেনি অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া বাজেটে। ব্যয়ের ক্ষেত্রেও কোনো কাটছাঁট হয়নি। এমন অবস্থায় সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয় আরো বাড়িয়েছে সরকার। আবার নতুন প্রকল্পও নেয়া হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও সারে সরকারের ভর্তুকি বাড়বে। এমনিতেই সরকার লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় করতে পারছে না। উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকেও চলতি বাজেটের জন্য নতুন ঋণ সহায়তা সম্ভব নয়। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের কাছে সহজ বিকল্প হলো ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া। আর সরকার সে সহজ কাজটিই করছে। যদিও কয়েক বছর ধরেই নানা সংকটে ঘুরপাক খাচ্ছে দেশের অর্থনীতি। তার মধ্যে প্রধান সংকট হলো জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে স্থবিরতা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। বিপরীতে একই অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির গড় হার ছিল দুই অংকের ঘরে। সর্বশেষ ফেব্রুয়ারিতেও দেশে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের রফতানি প্রবৃদ্ধির হার নেতিবাচক। অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) রফতানি প্রবৃদ্ধি ছিল ঋণাত্মক ৩ দশমিক ১৫ শতাংশ। একই সময়ে আমদানি খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ শতাংশের নিচে। অর্থনীতিতে ইতিবাচক রয়েছে কেবল রেমিট্যান্স প্রবাহ। এখন পর্যন্ত ওই খাতে প্রায় ১৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। অর্থাৎ সামষ্টিক অর্থনীতির সবক’টি সূচকের মধ্যে সরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধিই সবচেয়ে বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকারি ঋণে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১৪ দশমিক ৯০ শতাংশ। আর গত বছরের জানুয়ারির তুলনায় চলতি বছরের জানুয়ারিতে এক বছরের ব্যবধানে প্রবৃদ্ধির ওই হার প্রায় দ্বিগুণ তথা ২৯ দশমিক ৬৬ শতাংশ। একই সময়ে যেখানে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির হার মাত্র ৬ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ।
এদিকে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট ঘাটতি মেটাতে ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত রয়েছে ২ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকা। তার মধ্যে স্থানীয় উৎস থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি ও বিদেশী উৎস থেকে ৯৬ হাজার কোটি টাকার ঋণ নেয়ার সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে। তাছাড়া চলতি অর্থবছরে দেশী-বিদেশী মিলিয়ে ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার ঋণ পরিশোধের কথা রয়েছে। সরকারের ব্যয়ের তুলনায় রাজস্ব আহরণ কম হওয়ার কারণে বর্তমানে ঋণ করে পরিচালন ব্যয়ের কিছু অংশ মেটাতে হচ্ছে। তাছাড়া ঋণ শোধ করতেও ঋণ নিতে হচ্ছে। সরকারের বছরভিত্তিক ঋণ পরিশোধ পরিকল্পনা অনুসারে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১ লাখ ৭৫ হাজার কোটি, ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি এবং ২০২৮-২৯ অর্থবছরে দেড় লাখ কোটি টাকারও বেশি ঋণ শোধ করতে হবে। তার সঙ্গে পরিশোধ করতে হবে ঋণের সুদও। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৩০ কোটি টাকার সুদ পরিশোধ করেছে সরকার। তবে বর্তমান সরকারকে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জে ফেলে দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আগামী দিনে ঋণের পরিমাণ বাড়লে সুদের পরিমাণও বাড়বে। সব মিলিয়ে ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধের পাশাপাশি পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয় মেটাতে চলতি অর্থবছরে সরকারের নেয়া ঋণের পরিমাণ ৩ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
এদিকে এ প্রসঙ্গে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান জানান, সরকারি খাতে উচ্চ ঋণ প্রবৃদ্ধি হলেও তা উৎপাদনশীলতা তৈরি করছে না। বেসরকারি খাতে ঋণ গেলে তা নতুন পণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে। কিন্তু সরকারি খাতে ঋণ গেলে সেটি কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে না। বর্তমানে সরকার যে ঋণ নিচ্ছে, তা দিয়ে পরিচালন ব্যয় নির্বাহ করছে। এখন ট্রেজারি বিলের সুদহার ১০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। ওই বিলে বিনিয়োগ করে ব্যাংকগুলোরও তেমন কোনো মুনাফা হচ্ছে না। কারণ বেশির ভাগ ব্যাংক ১০ শতাংশের বেশি সুদে আমানত সংগ্রহ করছে।
অন্যদিকে সরকারের ব্যাংক খাত থেকে ঋণ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ জানান, ব্যাংক খাতে প্রবৃদ্ধি হওয়া আমানতের বেশির ভাগ সরকারই নিয়ে যাচ্ছে। সরকার বাজেটে ঘোষিত লক্ষ্যের চেয়েও বেশি ঋণ ব্যাংক খাত থেকে নিচ্ছে। যে কারণে বেসরকারি খাত ঋণবঞ্চিত হচ্ছে। সরকারের চাহিদা বেশি হওয়ার কারণে ট্রেজারি বিল-বন্ডের সুদহার বেশি। তার প্রভাবে বেসরকারি খাতে ঋণের সুদহার বাড়ছে। ১৪-১৫ শতাংশ সুদ দিয়ে কোনো উদ্যোক্তার পক্ষে ব্যবসা করা সম্ভব নয়। বেসরকারি খাতে যে স্থবিরতা চলছে, তা অব্যাহত থাকলে দেশের অর্থনীতি আরো বড় বিপদের মুখে পড়বে।
সার্বিক বিষয়ে নতুন সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, উত্তরাধিকার সূত্রে বর্তমান সরকার যে অর্থনীতি পেয়েছে তার সব সূচকই নিম্নমুখী। সরকারের ঘাড়ে বিপুল ঋণের বোঝা এসে পড়েছে। শুরু থেকে তাই অর্থ সাশ্রয়ের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। কর ফাঁকি ও দুর্নীতি রোধ করে অর্থ সাশ্রয়ের চেষ্টা করা হচ্ছে। যেসব প্রকল্প নেয়া হচ্ছে সেগুলো ব্যয়ের দিক থেকে লাভজনক কিনা, রিটার্ন আসবে কিনা, কর্মসংস্থান তৈরি করবে কিনা সেগুলোও বিবেচনা করা হচ্ছে। স রকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নিজস্ব বাজেটের পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীদের সব কার্যক্রমকে এখন সরকারের ইশতাহারের কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় করে পরিচালনা করতে হচ্ছে।